‘এরশাদ ব্র্যান্ড’-এর ওপর নির্ভরশীল থাকা জাতীয় পার্টি রংপুর বিভাগে এবার মোটেও ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। লাগাতার ঘরোয়া বিবাদ আর দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের লেজুড়বৃত্তি দলীয় নেতাকর্মীদের নিষ্ক্রিয় বানিয়ে দিয়েছে। পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের সঙ্গে দলটির কোনো সেতুবন্ধ না থাকায় নির্বাচনে তার প্রভাবও পড়েছে। এসব কারণে ভোট ব্যাংককেও কাজে লাগাতে পারেনি দলটি।
বিশ্লেষকদের মতে, গত সাড়ে ১৭ বছর আওয়ামী লীগের লেজুড়বৃত্তি, দুঃশাসন ও বিতর্কিত নির্বাচনকে বৈধতা দিতে ভূমিকা রেখে দলটি জনগণ থেকে একপ্রকার বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে নেতৃত্ব নিয়ে মতবিরোধ, বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্তি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে অসংগতি—এসব কারণে তৃণমূল পর্যায়ে কর্মীদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়। অনেক অভিজ্ঞ নেতা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছেন, যার প্রভাব পড়েছে তৃণমূল রাজনীতিতে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, জাতীয় পার্টি ঐতিহাসিকভাবে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সদ্ভাব রেখে চলেছে।
দলের ঘরোয়া সূত্রও জানিয়েছে, রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, নীলফামারীসহ রংপুর বিভাগের জেলাগুলোয় জাতীয় পার্টির প্রতি সাধারণ মানুষের সহানুভূতি ছিল। লাঙল প্রতীক ও এরশাদের প্রতি দুর্বলতা বিবেচনায় বৃহত্তর রংপুর অঞ্চলে জি এম কাদেরের জাপা কিছুটা অবস্থান ধরে রাখতে পারবে—এমনটাই ধারণা করা হয়েছিল। রাজনৈতিক চালে জি এম কাদেরকে অনেকটা কোণঠাসা করে রাখার চেষ্টা চলেছে প্রতিনিয়তই। সে কারণেও ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না দলটি।
সরেজমিনে দেখা গেছে, রংপুর বিভাগে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুব ভোটার ও নতুন ভোটারের সংখ্যা বেড়েছে। তাঁরা তথ্য-প্রযুক্তি এবং সামাজিক মাধ্যমে সক্রিয়, যা তাঁদের রাজনৈতিক ধারণা ও সিদ্ধান্ত দ্রুত পাল্টায়। জাপা এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে ব্যর্থ হয়েছে। রংপুর-৩ আসনের ভোটার এ কে এম সুমন বলেন, ‘আমি চাই দেশের জন্য শক্তিশালী নেতৃত্ব। কিন্তু দুঃখের বিষয়, জাতীয় পার্টি এখন সেই জায়গায় নেই।’ আরেক ভোটার আলী হোসেন বলেন, ‘জাতীয় পার্টি এখন দলীয় ঐক্যই বজায় রাখতে পারছে না। এ ছাড়া জাপার প্রচার বা জনসংযোগও সীমিত।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ফখরুল আনাম বেঞ্জু মনে করেন, জাতীয় পার্টি তৃণমূল ভিত্তি তৈরি করতে পারলে হয়তো এই পরিস্থিতি এড়ানো যেত। কিন্তু কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ওপর নির্ভরশীলতা, ব্যক্তিনির্ভর রাজনীতি এবং জনমত যাচাইয়ের অভাব তাদের জন্য বড় বাধা তৈরি করেছে। বর্তমান নির্বাচনে দলটির সাংগঠনিক দুর্বলতা স্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছে।
দলের কো-চেয়ারম্যান মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা বলেন, ‘নির্বাচন অনেকটা মেটিক্যুলাস হয়েছে। আমরা নির্বাচন করতে পারব কি না তার নিশ্চয়তা ছিল না। ভোটের কিছুদিন আগে আমাদের নির্বাচনের অনুমতি দেওয়া হলো। সে কারণে কাজ করতে পারিনি। আমরা হারিয়ে যাইনি। জাতীয় পার্টি ঘুরে দাঁড়াবেই।’