Image description
প্রত্যাশার পেশাদার প্রশাসন কতদূর

‘আপনি হয়তো জানেন না। এতদিন ভয়ে বলিনি, আমার দাদার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন বিএনপির ওই নেতা...।’ রোববার সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে আলাপচারিতার একপর্যায়ে প্রতিবেদকের সঙ্গে এভাবে কথা বলছিলেন একজন যুগ্মসচিব। আরেকজন উপসচিব জানান, ‘তার ভাইয়ের স্কুলজীবনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু বিএনপির...প্রভাবশালী নেতা। তিনি বিপুল ভোটে এমপিও হয়েছেন। আশা করছি, ভালো মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাবেন।’ এছাড়া কয়েকদিন আগে একজন উপসচিবের বিষয়ে যুগান্তরের কাছে বিস্তর তথ্য আসে। যেখানে বলা হয়, তিনি আওয়ামী লীগ আমলে বিশেষ সুবিধা নিয়েছেন এবং প্রতিটি কর্মস্থলে ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ ছিল। একটি বিশেষ জেলায় বাড়ি হওয়ায় তিনিই এখন বিএনপিপন্থি জুনিয়র গ্রুপের প্রভাবশালী আমলা বনে গেছেন। প্রায় দুই মাস অফিস না করে পলিটিক্যাল কাজে সময় দিচ্ছেন।

এরপর সবশেষ গত দুদিন ধরে অসংখ্য ফোনকল আসে প্রশাসন ক্যাডারের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে। প্রায় সবকটি ফোনকল ও মেসেজের সারমর্ম-‘কিছুই তো হলো না...। রেড জোনসহ গুরুত্বপূর্ণ সব পদ সুবিধাবাদী চাটুকাররা বাগিয়ে নিচ্ছে। কিছু একটা লেখেন। ১৭ বছর আমরা কত কষ্টই না করলাম। দফায় দফায় পদোন্নতিবঞ্চিত হলাম...’। ইত্যাদি।

দীর্ঘ ২৭ বছর ‘সচিবালয় বিটে’ রিপোর্টিং করার কারণে স্বাভাবিকভাবে অবসরে যাওয়া এবং কর্মরতদের অনেকে ব্যক্তিগত সম্পর্কের সুবাদে নানা অভিযোগ, অনুযোগ ও অভিমানের কথা খোলাখুলি বলেন। এছাড়া প্রশাসনের সদর-অন্দরের অনেক কিছুই তো চোখের সামনে দৃশ্যমান। অনেকের ক্ষোভ ও যৌক্তিক প্রত্যাশার অনুরোধে যখন এই মন্তব্য প্রতিবেদন লেখার জন্য মনস্থির করলাম, তখন বিষয়টি নিয়ে সাবেক একজন সচিবের মতামত নিতে ফোনে কল করলাম। যিনি আমার দীর্ঘদিনের পরিচিত এবং আমার মতো অনেকের কাছে খুবই ব্যক্তিত্বসম্পন্ন আমলা। তিনি আমাকে শুরুতে বললেন, ‘আমার বক্তব্য তো আপনি প্রকাশ করতে পারবেন না। আমি যা বলব, তার সব লিখতেও পারবেন না। বুঝেছি, বক্তব্য নিতে চান পত্রিকার ক্রেডিবিলিটির জন্য।’ এরপর কোনো বিরতি ছাড়াই আরেকটি মন্তব্য করে বললেন, ‘আগে আপনাদের সাংবাদিকদের পেশাদার হতে হবে। আজকাল সাংবাদিকদের অনেকে বেশি দলবাজ। এজন্য প্রশাসনের দলবাজি ঠিক হচ্ছে না।’ এরপর তিনি অনুযোগ-অভিমান একপাশে রেখে ছোট ভাই সম্বোধন করে বললেন, ‘পেশাদার প্রশাসন গড়ে তুলতে হলে সবার আগে প্রয়োজন পলিটিক্যাল উইল বা রাজনৈতিক সদিচ্ছা। যদি কোনোদিন কোনো সরকারপ্রধান বা রাষ্ট্রনায়ক এ ব্যাপারে সুদৃঢ় ইচ্ছা পোষণ করেন, তাহলে এ কাজটি করা খুব কঠিন কিছু নয়। একেবারে সহজ। নিয়োগ, পদায়ন ও পদোন্নতি-এ তিনটি ব্যাপারে যদি সত্যিকারার্থে ক্ষমতাসীন দল ‘আমার লোক’ সন্ধান না করে এবং মেধা, দক্ষতা ও সততার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়; তাহলে প্রশাসন ঠিক করতে লাগবে সর্বোচ্চ তিন মাস। এখন তো বিএনপি ক্ষমতায় আসবে। তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হবেন। তিনি চাইলে এটি করতে পারবেন। তিনি ব্যর্থ হবেন কিংবা পারবেন না, তা আমি এখন বলছি না। এটি দেখার বিষয়। তবে শুরুটা দেখলেই বোঝা যাবে। তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শপথ নেওয়ার পর তার আশপাশে কারা নিয়োগ পান, সেটি মূল্যায়ন করলে অনেক কিছু আগেই আন্দাজ করা যাবে।’

বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শপথ নেবেন মঙ্গলবার। এজন্য নির্বাচনের পর রোববার সচিবালয়ে ছিল অন্যরকম এক পরিবেশ। যারা আমার মতো নিজ চোখে দেখেছেন, তারা বাস্তবতা ঠিকই আঁচ করতে পেরেছেন। বেশির ভাগ কর্মকর্তা-কর্মচারীর ভাবখানা এমন-তিনি যেন অনেক আগে থেকে বিএনপি করে আসছেন। এই দল তার বাপ-দাদারা করেছেন। এ দলটির সঙ্গে রয়েছে তার পারিবারিক ও আত্মিক সম্পর্ক। আবার কারও কারও আচরণ ছিল একেবারে দলীয় নেতাকর্মীর মতো।

এখানে দুটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি স্পষ্ট হবে। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর ৬ আগস্ট সকালে সচিবালয়ে একশ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারী ছিলেন নিজ নিজ দপ্তরে ভীতসন্ত্রস্ত, আরেক গ্রুপ অফিস ফেলে দিনভর ব্যস্ত ছিল জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ মিছিলে। সোজা ভাষায় বললে ‘মব’ সৃষ্টিতে।

এদিকে গণ-অভ্যুত্থানের ১৮ মাস পর বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব নেওয়ার ৪৮ ঘণ্টা আগে রোববারও সচিবালয়ের দৃশ্য ছিল অনেকটা ওই রকম। চিহ্নিত আওয়ামীপন্থি এবং মধ্যম সারির পেশাদার আমলারা ছিলেন নিজ নিজ কর্মস্থলে, বিপরীতে বিএনপিপন্থি দাবিদার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনেকে দপ্তর ফেলে সারা দিন ছিলেন বাইরে। কেউ কেউ দল বেঁধে মহড়া দেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে। এর মধ্যে দলবাজিতে পারদর্শী অতিউৎসাহী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি গ্রুপ খুবই ব্যস্ত ছিল বুধবার কীভাবে নবাগত মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের কতটা রাজসিকভাবে অভ্যর্থনা জানানো যায়, তার আয়োজন নিয়ে। আবার এর বাইরে একশ্রেণির সুবিধাবাদী আমলারা পরিবার ও বংশের মধ্যে বিএনপি কানেকশন খুঁজে বের করতে মরিয়া। যদি পাওয়া যায় পুরোনো কোনো ছবি, কিংবা নিদেনপক্ষে শ্বশুরবাড়ির আত্মীয় হলেও চলবে। অর্থাৎ রাতারাতি সবাই এখন বিএনপি!! এই হলো প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু সচিবালয়ের বাস্তব অবস্থা।

এর মধ্যে পর্দার আড়ালে প্রশাসনের আরেকটি চিত্র হলো-বিএনপিপন্থি হিসাবে পরিচিত আমলাদের মধ্যে যারা নির্বাচনের আগেও ঐক্যবদ্ধ ছিলেন, তারা এখন রাতারাতি কয়েক গ্রুপে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। কারণ কী? উত্তরটা খুবই সহজ। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে রেড জোনে কারা যাবেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সহ প্রশাসনের অতিগুরুত্বপূর্ণ কি-পয়েন্টগুলোয় কারা নিয়োগ পাবেন। বাস্তবতা হলো-এসব ‘হাইপাওয়ার’ পদের সংখ্যা সীমিত, কিন্তু প্রত্যাশী কর্মকর্তার সংখ্যা অনেক। আবার মন্ত্রিপরিষদ সচিব কে হবেন, জনপ্রশাসনে কাকে বসানো যায়। স্বরাষ্ট্র, অর্থ, স্থানীয় সরকার, সড়ক বিভাগ, স্বাস্থ্য, গণপূর্ত, ভূমি, খাদ্য এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়-বিভাগে কারা সচিব হবেন-তা নিয়েও ভেতরে ভেতরে আগাম দেনদরবারও কম হচ্ছে না। এক গ্রুপ বলছে, মন্ত্রিপরিষদ সচিব পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিতে হলে ৮৪ ব্যাচ থেকেই করতে হবে। কারণ, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ১৯৮২ ব্যাচ এককভাবে আধিপত্য বিস্তার করেছে। ফলে তাদের আর কোনো জায়গা হবে না। আবার মন্ত্রিপরিষদ সচিবের জন্য দলের একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা থেকে ৮৫ ব্যাচকে বেছে নেওয়া হচ্ছে-শনিবার রাতে এমন গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি ভিন্নদিকে মোড় নেয়। রেগুলার ব্যাচের কর্মরতরা জোরালোভাবে বাদ সাধেন। তাদের সাফ কথা-প্রশাসনে আর কোনো চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ চলবে না। এই রাহুগ্রাস থেকে প্রশাসনকে মুক্ত করতেই হবে।

এদিকে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের পিএস (একান্ত সচিব) হওয়ার জন্য দৌড়ঝাঁপও কম হচ্ছে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সম্ভাব্য মন্ত্রিসভার সদস্যদের একটি তালিকা দেখে একশ্রেণির সুবিধাবাদী আমলাদের যেন ঘুম নেই। অনেকে ওইসব সংসদ-সদস্যের সঙ্গে দেখা করার জন্য তাদের বাসাবাড়িতেও ছুটছেন। যদিও নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যদের কারা পিএস হবেন, এ বিষয়ে অনেক যাচাই-বাছাই করে একটি তালিকা আরও এক মাস আগে প্রস্তুত করে রাখা হয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ওই তালিকা ঠিক থাকবে কি না, সেটি এখন দেখার বিষয়।

নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার প্রাক্কালে প্রশাসনের এই যখন অবস্থা, তখন বিষয়টিকে কীভাবে দেখছে বিসিএস প্রশাসন ক্যাডার অ্যাসোসিয়েশন। রোববার সন্ধ্যায় অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব ও পরিকল্পনা কমিশনের অতিরিক্ত সচিব মো. বাবুল মিঞার কাছে প্রশ্ন ছিল-প্রত্যাশার পেশাদার প্রশাসন কীভাবে হবে, কবে নাগাদ হতে পারে...। তিনি অবশ্য উত্তর দিলেন নাতিদীর্ঘ। যার সারমর্ম হলো-এবার তারা সত্যিই জাগবেন, জাগার মতো। নতুন সরকারের যিনি প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন, তিনিও এ ব্যাপারে সম্মতি দিয়েছেন। ওনার সংবাদ সম্মেলনে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে। ফলে পেশাদার প্রশাসন গড়ে তুলতে আর কোনো সমস্যা হবে না। তিনি জানান, আমরা নতুন কমিটি দায়িত্ব নিয়েছি মাত্র ১৫-১৬ দিন। এর মধ্যে দুই দফা মিটিংও করেছি। শনিবার ছিল দ্বিতীয় মিটিং। সেখানে এ বিষয়ে বিশদ আলোচনা শেষে গুরুত্বপূর্ণ কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, সিদ্ধান্ত মোতাবেক প্রথমত, প্রশাসনে আর কোনো চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ থাকবে না। দ্বিতীয়ত, যারা বিগত ১৭ বছরে, এমনকি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও প্রশাসনকে নানাভাবে দলীয়করণ ও স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে সৎ, যোগ্য ও মেধাবীদের বঞ্চিত করেছেন, তাদের চিহ্নিত করা এবং চিরতরে প্রশাসনে দলবাজির পথ বন্ধ করে দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া। এজন্য তৃতীয়ত, একটি মেধাভিত্তিক প্রশাসন গড়ে তুলে নতুন সরকারকে পেশাদারির সঙ্গে সহযোগিতা করার উদ্যোগ নেওয়া। এ উদ্দেশ্যে নিয়োগ, বদলি, পদায়ন ও পদোন্নতির বিষয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিমূলক ক্যারিয়ার প্ল্যানিং নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে। তিনি জানান, এজন্য অ্যাসোসিয়েশনের সভা থেকে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের মহাপরিচালক ব্যারিস্টার মো. গোলাম সরওয়ার ভূঁইয়াকে প্রধান করে ১১ সদস্যের একটি স্টাডি গ্রুপ কমিটি করে দেওয়া হয়েছে।

বিষয়টি নিয়ে গোলাম সরওয়ার ভূঁইয়ার দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, ‘ইতোমধ্যে প্রাথমিক কাজ শুরু করেছি। পেশাদার প্রশাসন গড়ার জন্য ক্যারিয়ার প্ল্যানিংয়ের প্রথম ধাপের রিপোর্ট এক মাসের মধ্যে দিতে পারব বলে আশা করছি।’

শেষ কথা, দুই যুগের বেশি সময় সচিবালয় প্রশাসনে এরকম নানা উদ্যোগ সময়ে সময়ে নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে যখনই নতুন কোনো সরকার দায়িত্ব নেয়, তখন প্রতিশ্রুতি আর পরিকল্পনার ছড়াছড়ি অবস্থা দেখা যায়। চারদলীয় জোট সরকারের সময় ২০০৪ সালে সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. সাদত হুসাইনও আমলাদের ক্যারিয়ার প্ল্যানিং নিয়ে জোরালো উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এমনকি এ উদ্দেশ্যে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ক্যারিয়ার প্ল্যানিং অ্যান্ড ট্রেনিং (সিপিটি) উইং খোলা হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এর বাস্তবায়ন রূপরেখা আর আলোর মুখ দেখেনি।

তবে এবার আমরা আর হতাশ হতে চাই না। সত্যিই দৃঢ়ভাবে আশায় বুক বাঁধতে চায় এই ভেবে যে, বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শপথ নেওয়ার পর শুধু প্রশাসন নয়, সর্বত্র নতুন বাংলাদেশ গড়ার পদধ্বনি শুনতে পাব। কারণ, সবার আগে বাংলাদেশ ও দেশপ্রেম। কাউকে না কাউকে অতীতের সব গ্লানি মুছে প্রতিশোধ-প্রতিহিংসা থেকে সরে এসে নতুন দিনের জন্য ভালো কাজ শুরু করতেই হবে।

লেখক: যুগ্মসম্পাদক, দৈনিক যুগান্তর