Image description

নির্বাচনের পরে সহিংসতা, প্রতিপক্ষের ওপর হামলা এবং সংঘর্ষে লিপ্ত কেউ বিএনপির নেতাকর্মী হলেও ছাড় দেওয়া হবে না। বহিষ্কার তো করা হবেই, তাদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে গ্রেফতারের নির্দেশনা দেবে বিএনপি। সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের চেয়ারম্যান তারেক রহমান এমনই বার্তা দিয়েছেন বলে বিভিন্ন সূত্র যুগান্তরকে নিশ্চিত করেছে। সূত্রগুলো জানায়, ইতোমধ্যে ওই নির্দেশনা কার্যকর হয়েছে লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর, বাগেরহাটসহ কয়েকটি এলাকায়। সহিংসতাসহ নানা অপকর্মে জড়িতের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে কয়েকজনকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে।

সূত্র জানায়, নির্বাচনে জয়লাভের পর যেসব সংসদ-সদস্য তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গেছেন, তাদের প্রত্যেককে তিনি কঠোর হওয়ার বার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে হলে সহিংসতাসহ অপ্রীতিকর ঘটনা বন্ধ করতে হবে। যেকোনো মূল্যে নেতাকর্মীদের সংযত হওয়ার আহ্বানও জানিয়েছেন তিনি। এসব ঘটনায় জড়িত হলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না বলেও হুঁশিয়ার করেছেন। এর পরপরই বিভিন্ন এলাকায় সংশ্লিষ্ট সংসদ-সদস্যরা কঠোর অবস্থান নেন।

বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান শনিবার সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, যে কোনো মূল্যে আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখতে হবে। কোনো ধরনের সহিংসতা, প্রতিশোধ বা উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড বরদাশত করা হবে না। তিনি এও বলেছেন, দলমত ধর্ম-বর্ণ বা ভিন্নমত যাই হোক-কোনো অজুহাতেই দুর্বলের ওপর সবলের আক্রমণ মেনে নেওয়া হবে না। ন্যায়পরায়ণতাই হবে আদর্শ। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা না গেলে সব প্রচেষ্টা বৃথা যেতে বাধ্য। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সরকারি দল বা বিরোধী দল, অন্যমত বা ভিন্নমত-প্রতিটি বাংলাদেশি নাগরিকের জন্যই আইন সমান। সরকারি বা বিরোধী দল-সবার জন্য আইন সমানভাবে প্রযোজ্য হবে উল্লেখ করে বিএনপির হাইকমান্ড বলেন, নির্বাচনোত্তর পরিস্থিতিতে কেউ যেন সুযোগ নিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে না পারে, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।

১২ ফেব্রুয়ারি দেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। পরে ময়মনসিংহ, মুন্সীগঞ্জ, ঝিনাইদহ, বাগেরহাট, লক্ষ্মীপুর, পটুয়াখালী, চুয়াডাঙ্গা, পিরোজপুর, ফরিদপুর, পঞ্চগড়, চাঁদপুর, নারায়ণগঞ্জ, ঝালকাঠি ও পাবনাসহ বেশ কয়েকটি জেলায় নির্বাচনি সহিংসতার খবর পাওয়া যায়। বিএনপি সূত্র দাবি করেছে, দলের সম্মান ক্ষুণ্ন করতেই ‘নব্য বিএনপি’র লোকজন বিভিন্ন এলাকায় সহিংসতা চালাচ্ছে। ব্যক্তিগত বিরোধও রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। আবার সুযোগ নিচ্ছে তৃতীয় পক্ষও।

নির্বাচন পর্যবেক্ষণ সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) তথ্যমতে, নির্বাচন-পরবর্তী দুই দিনে ৩০ জেলায় দুই শতাধিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এতে মুন্সীগঞ্জ ও বাগেরহাটে দুই যুবক নিহত হয়েছে, আর ময়মনসিংহে নিহত হয় এক শিশু। এসব ঘটনায় আহত হয় তিন শতাধিক। ৩৫০টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, অফিস, ঘরবাড়িতে হামলা ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। এ ছাড়া নোয়াখালীতে একটি ধর্ষণের অভিযোগও ওঠে।

দলটির একাধিক শীর্ষ নেতা বলছেন, বিএনপি সন্ত্রাস, চাঁদাবাজিসহ সহিংস ঘটনায় কোনোভাবেই সম্পৃক্ত হবে না। কারণ, এ ধরনের একটি ধারণা (বিএনপি সন্ত্রাস কিংবা চাঁদাবাজি করে) নির্বাচনের আগে জামায়াতে ইসলামী বিএনপির বিরুদ্ধে তৈরি করেছিল। যে কারণে ভোটের রাজনীতিতে কিছুটা প্রভাব পড়েছে। ফলে বিএনপি ক্ষমতায় আসার আগেই এ বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।

শনিবার সন্ধ্যায় বিএনপির চেয়ারম্যানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা নবনির্বাচিত সংসদ-সদস্যদের কয়েকজন যুগান্তরকে জানান, জনগণের জানমালের নিরাপত্তা ইস্যুতে তারেক রহমান কঠোর। যে কোনো মূল্যে সহিংসতা প্রতিরোধ করার নির্দেশনা দিয়েছেন। দলের নেতাকর্মীরা এসবে জড়িত হলে তাদেরও তাৎক্ষণিকভাবে সাংগঠনিক ব্যবস্থাসহ আইনের আওতায় নিয়ে আসার জন্য বার্তা দিয়েছেন। এই ইস্যুতে তিনি আইনশৃঙ্খনা বাহিনীকে আরও কঠোর হওয়ার বার্তা দেবেন। অপরাধী যেই হোক-কাউকে যেন ছাড় দেওয়া না হয়।

ওই নির্দেশনা পেয়ে ইতোমধ্যে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন লক্ষ্মীপুর-৪ আসনের নবনির্বাচিত সংসদ-সদস্য এবিএম আশরাফ উদ্দিন নিজান। নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা, চাঁদাবাজি ও অস্ত্র মহড়ায় লিপ্ত হওয়ার অভিযোগে বিএনপির ২৬ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে পৃথক দুটি মামলা হয়েছে। রামগতিতে এই মামলায় দুজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

এজাহার সূত্রে জানা যায়, ১৩ ও ১৪ ফেব্রুয়ারি উপজেলার চর পোড়াগাছা, রামদয়াল বাজার এবং আলেকজান্ডার ইউনিয়নের বালুরচর সুজন গ্রামে বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা সংঘবদ্ধভাবে চড়াও হয়। তারা দেশীয় অস্ত্র নিয়ে এলাকায় মহড়া দেয় এবং বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও ইটভাটা মালিকদের কাছে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করে। চাঁদা না পেয়ে তারা ইটভাটার শ্রমিকদের মারধর করে কাজ বন্ধ করে দেয় এবং মালিককে হত্যার হুমকি দেয়। এছাড়া রামদয়াল বাজারে ব্যবসায়ী মনিরের দোকানে ভাঙচুর চালিয়ে প্রায় ৫০ হাজার টাকার ক্ষতি করে। একই দিনে চর আলগী ইউনিয়ন ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. রাব্বি, সাংগঠনিক সম্পাদক মো. রায়হান, ওয়ার্ড সভাপতি মো. আশিকের নেতৃত্বে ২০-২৫ জনের সংঘবদ্ধ একটি গ্রুপ দেশীয় অস্ত্র নিয়ে প্রকাশ্যে মহড়া দেয়। ওই বাজারের ব্যবসায়ী মনিরের দোকানে ভাঙচুর চালায়।

চাঁদপুর পৌরসভার ১৩ নম্বর ওয়ার্ডে নির্বাচনের দিন এবং শুক্রবার দেশীয় অস্ত্র নিয়ে দুপক্ষের মধ্যে উত্তেজনা ও বিশৃঙ্খলার ঘটনা ঘটে। নির্বাচন-পরবর্তী দুদিনে ফরিদগঞ্জের কয়েকটি স্থানে বাড়িঘর ও স্থানীয় বিএনপি কার্যালয়ে হামলা ভাঙচুর, করা হয়। এতে শিশুসহ অন্তত পাঁচজন আহত হন। এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এলাকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে নিজ দলের কয়েকজন কর্মীকে পুলিশে দিয়েছেন নবনির্বাচিত সংসদ-সদস্য।

নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতায় ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটে বিএনপি কর্মীর এক শিশু সন্তান নিহত হয়। নিহত শিশু ইমন (১২) স্বদেশি ইউনিয়নের বাউশা গ্রামের দুলাল মিয়ার ছেলে। দুলাল গণমাধ্যমকে জানান, একই এলাকার স্বতন্ত্র প্রার্থী ঘোড়া প্রতীকের কর্মী আতাহার ধানের শীষের নির্বাচন করতে নিষেধ করেছিলেন। এর পরও নির্বাচন করায় শুক্রবার বিকালে ছেলেকে সুপারি চুরির অপবাদ দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করে। অপর দিকে স্বতন্ত্র প্রার্থী সালমান ওমর রুবেলের সমর্থকরা ভুবনকুড়া ইউনিয়নের বাঘাইতলা বাজারে বিএনপির দলীয় কার্যালয়ে হামলা ও ভাঙচুর করে।

মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার আধারা ইউনিয়নের চর আব্দুল্লাহ গ্রামে বিএনপি সমর্থক ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে হামলা ও পালটাহামলায় মো. জসিম নায়েব (৩৫) নামের একজন নিহত ও অন্তত দুজন আহত হয়েছেন। শুক্রবার বিকালের সংঘর্ষে গুরুতর আহত জসিমকে রাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

বাগেরহাটের বিভিন্ন স্থানে নির্বাচন-পরবর্তী হামলা-পালটাহামলা, ভাঙচুর ও সংঘর্ষে একজনের মৃত্যু ও অন্তত ৩৫ জন আহত হয়েছেন। ভোট গণনা শেষে বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন এলাকায় পালটাপালটি হামলায় ওই হতাহতের ঘটনা ঘটে। হামলা-পালটাহামলায় বাগেরহাট সদর, মোরেলগঞ্জ ও শরণখোলায় অন্তত ২০টি বসতবাড়ি ভাঙচুর ও তছনছ করা হয়েছে। এ নিয়ে বিভিন্ন এলাকায় বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীদের মাঝে উত্তেজনা বিরাজ করছে।

ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে কুপিয়ে-পিটিয়ে জখম করা হয়েছে চারজনকে। পাবনার আটঘরিয়া উপজেলার শ্রীকান্তপুরে ধানের শীষ প্রতীকের নির্বাচন করায় জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা আওয়ামী লীগ কর্মীর বাড়িতে ও স্থানীয় বিএনপি কার্যালয়ে হামলা এবং ভাঙচুর করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। উপজেলার দেবোত্তর ইউনিয়নের শ্রীকান্তপুর গ্রামে নির্বাচনের রাতেই এই হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে বলে হামলার শিকার আওয়ামী লীগকর্মী ও স্থানীয়রা দাবি করেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে লক্ষ্মীপুর-৪ আসনের নবনির্বাচিত সংসদ-সদস্য এবিএম আশরাফ উদ্দিন নিজান বলেন, বিএনপি একটি সুশৃঙ্খল রাজনৈতিক দল। আমাদের নেতা তারেক রহমানের স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে যে, কোনো নেতাকর্মী অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত হতে পারবে না। নির্বাচনের বিজয়কে পুঁজি করে যারা চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বা সাধারণ মানুষের ওপর নির্যাতন চালাবে, তাদের দলে কোনো জায়গা নেই। অপরাধীর পরিচয় সে যে-ই হোক, আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে। আমি নিজেই ভুক্তভোগীদের পক্ষে মামলা করার নির্দেশ দিয়েছি। রামগতি কমলনগরের সর্বস্তরের মানুষের শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে বিএনপি বা সহযোগী সংগঠনের যে কেউ অপরাধ করবে, আমরা কাউকে ছাড় দেব না। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করলে দল থেকে বহিষ্কারসহ যে কোনো শাস্তির আওতায় আনা হবে।

চাঁদপুর-৩ আসনের সদ্য নির্বাচিত সংসদ-সদস্য শেখ ফরিদ আহমেদ মানিক যুগান্তরকে বলেন, চাঁদপুরে যারা এ ঘটনা তৈরি করেছে, তাদের ১০-১২ জনকে ইতোমধ্যে পুলিশে দিয়েছি। নির্বাচিত হওয়ার প্রথম দিনে অন্যায়ের বিরুদ্ধে যে কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আগামী ৫ বছর জনগণ ও দেশের স্বার্থে এমন কঠোর অবস্থানেই থাকব। তিনি বলেন, ‘জনমনে আতঙ্ক, ভয়ভীতি প্রদর্শন, কিশোর গ্যাং, চাঁদাবাজি ও মাদক-এগুলো এখন থেকে চাঁদপুরে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এর সঙ্গে জড়িত যদি আমার দলের কেউও থাকে, তাকেও যেন আটক করে কঠোর ব্যবস্থা নেয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। জনগণের প্রত্যাশা পূরণে যা যা করা প্রয়োজন, সরকারের সহযোগিতা নিয়ে চাঁদপুরবাসীর জন্য তাই করব। যারা অপরাধ করবে তাদের সঙ্গে আমার সম্পর্ক থাকবে না। তারেক রহমান যেমন দল চায়, আমি অনুসারী হিসাবে একইরকম দল চাই।’