ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ের মধ্য দিয়ে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রবেশ করেছে দেশ। নির্বাচনোত্তর পরিস্থিতিতে সরকার গঠনের প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আশাবাদ ও প্রত্যাশার সঞ্চার হয়েছে। তবে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির বাইরেও নগরবাসীর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ঢাকার দীর্ঘস্থায়ী যানজট সমস্যার সমাধানের বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ। নতুন সরকারের প্রতি রাজধানীবাসীর দাবি যানজট মুক্ত সুন্দর ঢাকা। বিজয়ের পর বিএনপির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার পাশাপাশি নগর ব্যবস্থাপনায় কার্যকর সংস্কার আনা। ঢাকার যানজট নিরসন শুধু অবকাঠামো নির্মাণের বিষয় নয় এটি সুশাসন, পরিকল্পনা, আইন প্রয়োগ ও নাগরিক সচেতনতার সমন্বিত কার্যক্রম।
ঢাকার দীর্ঘদিনের নাগরিক দুর্ভোগের অন্যতম কারণ যানজট। প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা সড়কে আটকে থেকে কর্মজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে রোগী সকলেই চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। শুধু সময় অপচয় নয় উৎপাদনশীলতা হ্রাস, জ্বালানি অপচয়, পরিবেশ দূষণ এবং মানসিক চাপ সব মিলিয়ে ঢাকার যানজট দেশের সামগ্রিক উন্নয়নকেই ব্যাহত করছে। তাই নির্বাচনে বিজয়ী দলের কাছে এখন নগরবাসীর প্রধান দাবি ঢাকার যানজট নিরসনে কার্যকর, সময়োপযোগী ও সমন্বিত পদক্ষেপ। রাজধানী ঢাকায় যানবাহনের সংখ্যা গত দুই দশকে বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ব্যক্তিগত গাড়ি, মোটরসাইকেল, বাস, ট্রাক, রিকশা, অটোরিকশা সব মিলিয়ে সড়ক নেটওয়ার্কের ওপর চাপ অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে।
এমন প্রেক্ষাপটে জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ী বিএনপিকে রাজধানীর যানজট নিরসনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রত্যাশা নগরবাসীর। প্রায় আড়াই কোটির বেশি মানুষের বসবাস এই মহানগরীতে। পরিকল্পনাহীন নগরায়ন, অপর্যাপ্ত গণপরিবহন, ব্যক্তিগত গাড়ির আধিক্য, সড়ক অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা মিলিয়ে যানজট এক জটিল সঙ্কটে রূপ নিয়েছে। এই সমস্যার সমাধানের উদ্যোগ নেয়ার কথা বলছেন নগরবাসী।
ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা বলছেন, রাজধানী পরিচালনায় ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফুটপাথ দখলমুক্ত করা, অবৈধ পার্কিং নিয়ন্ত্রণ, বাসস্ট্যান্ড ও টার্মিনাল ব্যবস্থাপনা উন্নত করা এসব দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের। একই রুটে একাধিক কোম্পানির বাস চলাচল করায় বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় রুট রেশনালাইজেশন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট রুটে নির্দিষ্ট সংখ্যক বাস চলবে এবং কোম্পানিগুলো সমন্বিত ব্যবস্থাপনায় আসবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকায় সমন্বিত গণপরিবহন ব্যবস্থার অভাবই যানজটের অন্যতম কারণ। বাস রুট রেশনালাইজেশন উদ্যোগ বারবার আলোচনায় এলেও তা পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। একই রুটে অসংখ্য কোম্পানির বাস চলাচল, যাত্রী তোলার প্রতিযোগিতা, নির্দিষ্ট স্টপেজ না মানা সব মিলিয়ে বিশৃঙ্খলা স্থায়ী রূপ নিয়েছে। ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারের প্রবণতা বেড়েছে। কিন্তু সেই তুলনায় পার্কিং অবকাঠামো তৈরি হয়নি। ফলে ফুটপাথ ও সড়কের একাংশ দখল হয়ে যায় পার্কিংয়ের জন্য। এতে কার্যকর সড়ক প্রস্থ কমে গিয়ে যানজট আরো বাড়ে।
মগবাজারের বাসিন্দা মাহমুদুল হাসান ইনকিলাবকে বলেন, রাজধানী ঢাকার যানজট নিরসনের প্রতিশ্রুতি দীর্ঘদিন ধরে আগের সরকার দিলেও বাস্তবে তেমন পরিবর্তন দেখা যায়নি। আমরা যারা ঢাকায় বসবাস করি তারা চাই দৃশ্যমান অগ্রগতি। নতুন সরকার যদি যানজট নিরসনে পরিকল্পনাগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে পারে তবে রাজধানীবাসী দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পাবে।
মতিঝিলের একটি ব্যাংকের কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন বলেন, কর্মজীবী মানুষের জন্য যানজট একটি চরম ভোগান্তির ব্যাপার। প্রতিদিন দুই থেকে তিন ঘণ্টা যানজটে বসে থাকতে হয়। নতুন সরকার যেন দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেয়। স্কুলের সময় রাস্তায় বের হওয়া মানেই দুঃস্বপ্ন। আমরা চাই বাস ব্যবস্থায় শৃঙ্খলায় আসুক।
সেভ দ্যা রোডের মহাসচিব শান্তা ফারজানা ইনকিলাবকে বলেন, নতুন সরকারের প্রতি আমাদের প্রত্যাশা সমন্বিত নগর পরিবহন ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করবে। বাস রুট রেশনালাইজেশন সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন করবেন এবং গণপরিবহন খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনবে। আমরা শুধু সরকার পরিবর্তন চাইনি চাই জীবনের মানের পরিবর্তন। যানজট আমাদের জীবনের মূল্যবান সময় কেড়ে নিচ্ছে। রাজধানীর উত্তর-দক্ষিণ করিডোরে চালু হওয়া ঢাকা মেট্রোরেল (এমআরটি লাইন-৬) আংশিকভাবে যানজট কমাতে সহায়ক হয়েছে। তবে পুরো নেটওয়ার্ক চালু না হওয়া পর্যন্ত এর পূর্ণ সুফল পাওয়া যাবে না। এছাড়া ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে বিমানবন্দর থেকে শহরের বিভিন্ন অংশে দ্রুত যাতায়াতের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। স্মার্ট ট্রাফিক সিগন্যাল, ডিজিটাল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও ই-টিকিটিং ব্যবস্থার ওপর জোর দেয়া প্রয়োজন বলে মনে করি।