বিগত চার দলীয় জোট সরকারের সময়ে শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ছিলেন ড. এহছানুল হক মিলন। দায়িত্ব নিয়েই শিক্ষাখাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছিলেন তিনি। বিশেষ করে পাবলিক পরীক্ষায় নকল বন্ধে তার উদ্যোগ ও কঠোর অবস্থান শিক্ষার্থীদের পাঠ্য বইমুখী করে তুলেছিল।
সেসময় নিজে আকস্মিক বিভিন্ন পরীক্ষা কেন্দ্র পরিদর্শন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন ছিল দুর্নীতিগ্রস্থদের কাছে আতঙ্কের। ২০০১ থেকে ২০০৬ সালে তার নেতৃত্বেই শিক্ষাখাতে এসেছিল গুনগত পরিবর্তন, মেধার যথাযথ মূল্যায়ন। পরবর্তীতে ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর একে একে নুরুল ইসলাম নাহিদ, ডা. দীপু মনি ও মুহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়ে শিক্ষার্থীদের নিয়ে রীতিমত ছেলে খেলা করেছেন।
নুরুল ইসলাম নাহিদের সময় পাসের হার বাড়িয়ে দেয়ার জন্য পরীক্ষায় অংশ নিলেই পাস করিয়ে দেয়া, কোন শিক্ষকের কাছে ফেল করলে শিক্ষককে শাস্তির মুখোমুখী করা হয়েছে। আর দীপু মনি ও নওফেলের সময় তো নতুন কারিকুলামের নামে পরীক্ষা পদ্ধতি বাতিল করে শিক্ষার্থীদের পড়াশুনাবিমুখই করা হয়েছে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে না পারা, মান নিয়ে নানা সময়েই সমালোচনা হয়েছে। এক সময় বৈশ্বিক মহামারি করোনার কারণে পরীক্ষা ছাড়াই অটো পাসের প্রচলন করে শিক্ষার সর্বনাশ করা হলো। অটো পাসের ধারাবাহিকতায় দু’চারটি সাবজেটের পরীক্ষার মাধ্যমে পাবলিক পরীক্ষার নামে ছেলেখেলা করায় শিক্ষা সেক্টর কার্যত আইসিইউতে চলে যায়।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সাময়িক কিছু বিষয়ে সংস্কার করলেও পুরো শিক্ষাখাতকে তুলে দেয়া হয়েছে জামায়াতের হাতে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, অধিদপ্তর, বোর্ডসহ শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ সব প্রতিষ্ঠানকে করে তোলা হয়েছে জামায়াতীকরণ। বেছে বেছে জামায়াত-শিবিরের লোকজনদের নিয়োগ দেয়ায় এর অনেকগুলো জামায়াতের কার্যালয়েও পরিণত হয়েছে। ফলে শিক্ষার মান তলানীতে এবং শিক্ষা ব্যবস্থা খাদের কিনারে। বিজ্ঞজনেরা বলেন ‘শিক্ষাই জাতির মেরুদ-’। অথচ সে মেরুদ- (শিক্ষাখাত) বেঁকে গেছে। শিক্ষার মান উন্নয়নের মাধ্যমে জাতির মেরুদন্ড সোজা করতে শিক্ষা সেক্টরে প্রয়োজন দক্ষ নেতৃত্ব।
দীর্ঘ দুই দশক পর নির্বাচনের মাধ্যমে ভূমিধ্বস বিজয় নিয়ে ফের সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বিএনপি। নির্বাচনের আগে শিক্ষাখাত, শিক্ষার্থীদের নিয়ে একগুচ্ছ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেছেন দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। যিনি নিশ্চিতভাবেই আগামী সরকারের প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন। তাই তার সেই অঙ্গীকার- শিক্ষাখাতে বিশেষ গুরুত্ব প্রদান, শিক্ষার গুণগত পরিবর্তন, শিক্ষার্থীদের দক্ষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়েও দক্ষ ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিকে চাইছেন খাত সংশ্লিষ্টরা। শিক্ষা মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর ও প্রতিষ্ঠানের একাধিক কর্তা ব্যক্তি, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা জানান, শিক্ষাখাতে গুণগত পরিবর্তনের জন্য তারা অভিজ্ঞ ব্যক্তিকেই আগামী দিনে শিক্ষা মন্ত্রী হিসেবে দেখতে চান। তারা বলেন, শিক্ষার যে দুরাবস্থা, মানের পরিবর্তে শুধু সংখ্যাকেই এতোদিন বিবেচনা করা হয়েছে এবং পুরো খাতকে দলীয়করণ করা হয়েছে সেখান থেকে বের করে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার জন্য প্রয়োজন সাবেক শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ড. এহছানুল হক মিলনের মতো অভিজ্ঞ, সাহসী ও কঠোর ব্যক্তিকে। যিনি বিগত দিনে অত্যন্ত সততা, নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে মন্ত্রণালয় চালিয়েছেন। আগামী দিনেও তার মতো একজন ব্যক্তিকে এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেয়া হলে শিক্ষাখাতটি আবারো ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। সেটি হলে আগামী দিনের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যেসব অঙ্গীকার করেছেন তা বাস্তবায়নও সহজ হবে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচনা : গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চাঁদপুর-১ আসন থেকে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন সাবেক শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ড. এহছানুল হক মিলন। এর পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিগত বিএনপি সরকারের সময়ে শিক্ষাখাতে তার উদ্যোগ, বৈপ্লবিক পরবর্তনগুলো নিয়ে চলছে নানা আলোচনা। শিক্ষাখাতে বিদ্যমান জঞ্জাল, অনিময়, দুর্নীতি, দলীয়করণ দূরীকরণে ড. মিলনকেই প্রয়োজন বলেই উল্লেখ করছেন অনেকে। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যকই শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবক। সাইফুল ইসলাম নামে ঠাকুরগাঁওয়ের একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক বলেন, গত ১৭ বছর ধরে শিক্ষাখাতকে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে মূলত একটি জাতিকেই শেষ করে দেয়া হয়েছে। যেখানে শিক্ষার্থীদের নিয়ে নানা সময়ে নানা রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হয়েছে, তাদের পড়াশুনা থেকে দূরে ঠেলে দেয়া হয়েছে। আর মন্ত্রণালয়কে দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত করা হয়েছে, আবার সাম্প্রতিক সময়ে তো দলীয়করণে জামায়াতীকরণ করা হয়েছে। এখন বিএনপি সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ হবে এসব থেকে মন্ত্রণালয়কে মুক্ত করা। শিক্ষাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা। যার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা কেবল দেশে নয়, দেশের বাইরের শিক্ষার্থীদের সঙ্গেও সমানতালে প্রতিযোগিতা করতে পারে। এর জন্য প্রয়োজন ড. এহছানুল হক মিলনের মতো অভিজ্ঞ, দক্ষ ও কঠোর একজন মন্ত্রী।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের এক শিক্ষক বলেন, বিগত দিনে শিক্ষার মান কি ছিল তা তো ভর্তি পরীক্ষাগুলোর ফলাফল দেখলেই বোঝা যায়। শিক্ষাকে আবারো মানসম্পন্ন জায়গায় নিতে হলে তিনিও ড. মিলনের মতো মানুষকেই মন্ত্রী হিসেবে পছন্দের শীর্ষে রেখেছেন।
রাজধানীর আইডিয়াল স্কুলের নুরুল ইসলাম নামে একজন অভিভাবক বলেন, শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য কেউ কখনো আন্দোলন করে না, সবাই আন্দোলন করে সংখ্যা বৃদ্ধির জন্য। বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান শিক্ষা নিয়ে তার একগুচ্ছ পরিকল্পনা তুলে ধরেছেন। আমরা মনে করি শিক্ষাকে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার খাত বিবেচনা করে এটিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া।