২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার এক অভূতপূর্ব অভ্যুত্থানের মাধ্যমে পতন ঘটেছিল দীর্ঘ দেড় দশকের স্বৈরাচারী শাসনের। সেই ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার।
দীর্ঘ ১৮ মাস পর, ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে কাল মঙ্গলবার নতুন সরকারের শপথের মাধ্যমে শেষ হচ্ছে ড. মুহাম্মদ ইউনূস অধ্যায়। নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বিএনপি। ইতিমধ্যে নতুন সরকারের মন্ত্রিসভার রূপরেখা প্রায় চূড়ান্ত করে ফেলেছে দলটি। কিন্তু নানাবিধ চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে নতুন সরকারকে।
বিশেষ করে দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। নির্বাচনে বিএনপির নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর গত শনিবার প্রথমবারের মতো ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে সংবাদ সম্মেলন করেছেন দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সেখানেও দেশে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনাকে অন্যতম চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। নির্বাচনের দুই দিন আগে এক অনুষ্ঠানে অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ সতর্ক করে বলেছেন, নতুন যে সরকার দেশ পরিচালনার দায়িত্বে আসবে, অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখতে তাদেরকে নানামুখী চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে। আগামীকাল ১৭ ফেব্রুয়ারি নতুন সরকার শপথ। দেশের অর্থনীতিকে টেনে নিতে যা দরকার তার কিছুই রেখে যাচ্ছে না অন্তর্বর্তী সরকার। আগামী দিনে দেশের অর্থনীতিকে পুরোপুরি বিপাকে রেখে যাচ্ছে সরকার। চলমান অর্থ সঙ্কটের পাশাপাশি আগামী সরকারের কাছে সরকার নানা বকেয়া রেখে যাচ্ছে।
সরকার গঠনের পরের দিন থেকেই দেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা রোজা পালন করবেন। রোজায় সবারই প্রত্যাশা দ্রব্যমূল্যের দাম নিয়ন্ত্রণ থাকবে। যদিও ইতোমধ্যে সকল পণ্যের দাম বেড়েছে। এখনও বাজার সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণে আওয়ামীপন্থী এবং সর্বশেষ দেড় বছরে কিছু জামায়াত নেতাদের হাতে। এই সিন্ডিকেটকে অপসরাণ করে বাজারকে স্থিতিশীল করাও নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে রমজানে সবার প্রত্যাশা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ। ইতোমধ্যে গরমের মৌসুম শুরু হয়েছে। পাশাপাশি বোরো মৌসুম শুরু হয়েছে। এই সময়ে সেচের মাধ্যমে ইরি ধান চাষ করা হয়। যেখানে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত করাও সরকারের চ্যালেঞ্জ। এছাড়া রয়েছে আদানি-সামিট-এস আলমের সঙ্গে সরকারের হাজার হাজার কোটি টাকার বকেয়া বিদ্যুৎ বিলের দায়। এই তিন কোম্পানিরই ১৪ হাজার কোটি টাকার বেশি বকেয়া রয়েছে। রমজান শেষ হতে না হতেই শুরু হচ্ছে হজ্জ ও কোরবানীর ঈদ। ইতোমধ্যে অন্তবর্তী সরকারের শেষ সময়ে গত বছরে যারা হজ্জ করেছেন তাদের একটি টাকা ফেরত দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছেন। যা হাজীদের দ্রুতই ফেরত দিতে হবে। পাশাপাশি নতুন হজ্জ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা। অবশ্য রমজান শেষেই নতুন বাজেট প্রণয়ণে হাত দিতে হচ্ছে সরকারকে। তাই সরকারকে নানামুখী চ্যালেঞ্জ নিয়েই দায়িত্ব শুরু করতে হচ্ছে। এই দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করার উপরই নতুন সরকারের উপর মানুষের আস্থা নির্ভর করছে।
এছাড়াও অন্তর্বর্তী সরকার শেষ সময়ে দেদারছে নিয়োগ প্রদান করছে- তাদের বেতনের চাপ। এছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে এসে নতুন ৮৫৬টি উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যাপারে গ্রিন সিগন্যাল দেওয়া হয়েছে। এসব প্রকল্প চলতি অর্থবছরে মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো অনুমোদন প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ১২ লাখ ১৯ হাজার ৮৭২ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। নির্বাচিত সরকারের ওপর প্রকল্পগুলো অনুমোদনের চাপ সৃষ্টি করবে। শুধু প্রকল্প ব্যয়ই নয়; অর্থ সঙ্কটে সরকার এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকে (এডিবি) কর্মরতদের বেতন গত ৪ মাস ধরে বন্ধ রয়েছে। অন্যান্য দাতা সংস্থায় কর্মরতদের বেতনও কয়েক মাস ধরে বন্ধ।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি রিজওয়ান রহমান বলেন, স্বৈরাচার আওয়ামী সরকারের পতনের পর অর্থনীতির যে দুর্দশা দেখা দিয়েছিল, তা সামাল দিতে পারেনি সরকার। যে কারনে অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে পারেনি।