আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে দলের প্রার্থী বাছাইয়ে উদ্যোগ গ্রহণ করেছে বিএনপি। দলটির নির্ভরযোগ্য সূত্রমতে, সিটি করপোরেশনের মেয়র, পৌর মেয়র, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান, ইউপি সদস্য বা কাউন্সিলর প্রতিটি স্তরে একক প্রার্থী নিশ্চিত করতে জেলা পর্যায়ে কাজ শুরু করেছে দলটি। জেলা ও উপজেলায় বিশেষ বাছাই কমিটির মাধ্যমে প্রার্থীদের ওপর জরিপ চালানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে জেলা ও সংসদীয় আসনভিত্তিক ‘বিশেষ বাছাই কমিটি’ গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। কয়েকটি জেলায় এই কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
বিএনপির একাধিক নীতিনির্ধারক নেতা বলেছেন, অতীতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে একাধিক প্রার্থীর কারণে ভোট বিভক্ত হওয়া এবং সাংগঠনিক বিরোধের অভিজ্ঞতা থেকে এবার আগেভাগেই একক প্রার্থী নির্ধারণে গুরুত্ব দিয়েছে হাইকমান্ড। নির্বাচনে একক প্রার্থী নিশ্চিত করা গেলে দলের ভেতরের প্রতিযোগিতা ও গ্রুপিং নিয়ন্ত্রণে থাকবে, ভোট বিভাজনের আশঙ্কা কমবে এবং নির্বাচনি মাঠে জয়ের সর্বোচ্চ সম্ভাবনা থাকবে। সে লক্ষ্যেই তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত সমন্বিত প্রক্রিয়ায় প্রার্থী বাছাইয়ের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। এতে তৃণমূল পর্যায়ে দলের সাংগঠনিক ভিত্তি আরও শক্তিশালী হবে।
সূত্র জানিয়েছে, সম্ভাব্য প্রার্থীদের জনপ্রিয়তা, সাংগঠনিক গ্রহণযোগ্যতা, ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে ভূমিকা এবং স্থানীয় পর্যায়ে জনসম্পৃক্ততাকে প্রার্থী বাছাইয়ে মানদণ্ড হিসেবে নির্ধারণ করেছে হাইকমান্ড। স্থানীয় নেতাকর্মীদের মতামতের পাশাপাশি বিভিন্ন জরিপের মাধ্যমে জনমত যাচাই করা হবে। জরিপে এগিয়ে থাকা এবং স্থানীয়ভাবে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকেই দলের সমর্থন দেওয়ার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে হাইকমান্ড। একক প্রার্থী বাছাইয়ের লক্ষ্য গত ৪ জুলাই থেকে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, রংপুরসহ বিভিন্ন জেলার নেতাদের সঙ্গে প্রতি শুক্র ও শনিবার ধারাবাহিকভাবে বৈঠক করছেন। এসব বৈঠকে স্থানীয় নির্বাচনে অভ্যন্তরীণ কোন্দল দূর করে একক প্রার্থী বাছাইয়ে জেলার নেতাদের নির্দেশ দেন তারেক রহমান।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও স্থায়ী কমিটির সদস্য রুহুল কবির রিজভী কালবেলাকে বলেন, প্রতিটি এলাকায় জনমত যাচাইয়ে জরিপ চালাবেন স্থানীয় নেতারা। এলাকায় জনপ্রিয়, গ্রহণযোগ্যতা, আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা এবং বিজয়ের সম্ভাবনা বেশি—প্রার্থী বাছাইয়ে এসব বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হবে। ইউনিয়ন চেয়ারম্যান বা পৌর মেয়র প্রার্থী বাছাইয়ে মতামত দেবেন সংশ্লিষ্ট উপজেলা ও জেলা বিএনপির নেতারা। আর উপজেলা চেয়ারম্যান প্রার্থীদের বাছাই করবেন সংশ্লিষ্ট জেলার নেতারা। সেখানে কোনো বিষয়ে সমাধান না হলে কেন্দ্রীয়ভাবে তা নিষ্পত্তি করা হবে। তিনি বলেন, দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে কেউ প্রার্থী হলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে হাইকমান্ড ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করবে বলেও জানান।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জেলা পর্যায়ের বাছাই কমিটিগুলো দলের সম্ভাব্য প্রার্থীদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করবে এবং দলের সম্ভাব্য প্রার্থী ও বিকল্প প্রার্থীর একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা তৈরি করবে। সংশ্লিষ্ট এলাকার সাংগঠনিক অবস্থা, নেতাকর্মীদের মতামত, জনসমর্থন এবং অতীত নির্বাচনের ফল বিশ্লেষণ করে জেলা ও বিভাগীয় নেতাদের কাছে সুপারিশ পাঠাবে। কোনো কারণে তারা যদি প্রার্থী চূড়ান্ত করতে না পারেন, তখন কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে চূড়ান্ত প্রার্থী ঠিক করা হবে।
এরই অংশ হিসেবে ভোলা-২ আসনের বোরহানউদ্দিন ও দৌলতখান উপজেলার স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলের প্রার্থী বাছাইয়ে ৭ সদস্যের দুটি আহ্বায়ক কমিটি গঠন করেছেন ওই আসনের সংসদ সদস্য মো. হাফিজ ইব্রাহিম। দলীয় প্যাডে দেওয়া কমিটিতে বলা হয়, বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সিদ্ধান্তক্রমে আসন্ন স্থানীয় পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে পৌর মেয়র/ইউপি চেয়ারম্যান, ওয়ার্ড কাউন্সিলর/ইউপি সদস্য, সংরক্ষিত নারী আসনের ওয়ার্ড কাউন্সিলর/ইউপি সদস্য প্রার্থী বাছাইয়ের লক্ষ্যে এই কমিটি গঠন হয়েছে।
আব্দুল মান্নান মিয়াকে আহ্বায়ক করে দৌলতখান উপজেলা এবং উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক মাফরুজা সুলতানাকে আহ্বায়ক করে বোরহানউদ্দিন উপজেলার ৭ সদস্য বাছাই কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির কার্যপরিধি সম্পর্কে বলা হয়, তৃণমূলের মতামত গ্রহণ এবং জরিপ মূল্যায়ন করে কাঙ্ক্ষিত পদের জন্য একক চূড়ান্ত প্রার্থী ও বিকল্প প্রার্থী সর্বসম্মতিক্রমে বাছাই করে অনুমোদনের জন্য প্রেরণ করা। দলীয় স্বার্থে এবং সার্বিক ঐক্য রক্ষার্থে কমিটির সব সদস্যকে তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব পালনের নির্দেশনা প্রদান করা হলো। ঠিক একই ভাবে আরও বেশি কয়েকটি জেলায়ও বিশেষ বাছাই কমিটি গঠন করে প্রার্থীদের ওপর জরিপ চালাচ্ছেন জেলা ও উপজেলার দায়িত্বশীল নেতারা।
ভোলা জেলা বিএনপির সদস্য সচিব রাইসুল আলম কালবেলাকে বলেন, প্রার্থী বাছাইয়ে জেলার নেতাদের নিয়ে আমরা শিগগির বসব। প্রার্থী বাছাইয়ে এলাকা জনপ্রিয় ও দলের ত্যাগী নেতা—আমরা মূলত এই দুটা দিককে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে। দলের ত্যাগী ও জনপ্রিয় নেতাকে মূল্যায়ন করার চেষ্টা করা হবে। তিনি বলেন, ভোলা-২ আসনে স্থানীয়ভাবে কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ ধরনের কমিটি গঠনের ব্যাপারে কেন্দ্র থেকে আমরা এখনো নির্দেশনা পায়নি। কেন্দ্রের সিদ্ধান্ত পেলে তখন সেই মোতাবেক সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
চাঁদপুর জেলার সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকা সংক্ষিপ্ত করার লক্ষ্য আগেভাগে মাঠে নেমে জনপ্রিয়তা যাচাই করছেন জেলার দায়িত্বশীল নেতারা। গঠন করা হয়েছে বিশেষ কমিটিও।
এ বিষয়ে চাঁদপুর জেলার বিএনপির সভাপতি ও সংসদ সদস্য শেখ ফরিদ আহমেদ মানিক কালবেলাকে বলেন, প্রার্থী বাছাইয়ে কিছু কমিটি গঠন করে দিয়েছি। এখন তো অনেকে বিদেশ বা ঢাকায় থেকেও নির্বাচন করতে চায়। কোনো এলাকায় কার অবস্থান কেমন, জনপ্রিয় কে এগিয়ে আছেন, তা মাঠ পর্যায়ে অভ্যন্তরীণ জরিপের মাধ্যমে তুলে আনার চেষ্টা চলছে। কেন্দ্র থেকে চূড়ান্ত নির্দেশনা পেলে দলের সম্ভাব্য ও বিকল্প প্রার্থীর নামের চূড়ান্ত তালিকা সরবরাহ করা হবে।
জেলার পর্যায়ের একাধিক নেতার সঙ্গে আলাপকালে জানা গেছে, বিএনপির হাইকমান্ড থেকে এখনো চূড়ান্ত নির্দেশনা না পেলেও তারা প্রার্থী বাছাইয়ে কাজ আগেই এগিয়ে রাখছেন। জেলা ও উপজেলার নেতাদের মাধ্যমে মাঠ পর্যায়ে জরিপ চালানো হচ্ছে। দলের সম্ভাব্য ও বিকল্প প্রার্থী রেখেই কেন্দ্রের কাছে তালিকা পাঠানোর চিন্তা রয়েছে তাদের। দলের সম্ভাব্য প্রার্থীরাও এরই মধ্যে দলীয় কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ, জনসংযোগ বৃদ্ধি এবং স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়েছেন। বিশেষ করে এলাকার দলীয় সংসদ সদস্যের সমর্থন পেতেও তারা চালাচ্ছেন লবিং-তদবির। তবে ব্যক্তিগত প্রচারণার চেয়ে বিগত সময়ের আন্দোলন সংগ্রামে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড এবং এলাকার জনপ্রিয়তাকে তারা বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।
শেরপুর জেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক মোহাম্মদ হযরত আলী কালবেলাকে বলেন, জেলা বিএনপির কমিটি না থাকার পরও আমরা দলের সম্ভাব্য প্রার্থী বাছাইয়ের কাজ এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছি। নতুন কমিটি গঠন হলে কাজে আরও অগ্রগতি পেত। তিনি বলেন, প্রতিটি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবে প্রাথমিকভাবে তিনজন বাছাই করার চিন্তা রয়েছে। ঠিক একইভাবে অন্য স্তরের প্রার্থী বাছাই করা হবে। তবে কেন্দ্র থেকে মৌখিক কিছু নির্দেশনা পেয়েছেন বলেও জানান তিনি।
নওগাঁ জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল ইসলাম ধলু কালবেলাকে বলেন, স্থানীয়ভাবে কোথাও কোথাও কমিটি হতে পারে। তবে কেন্দ্র থেকে এ ধরনের নির্দেশনা পাইনি। তিনি জানান, সংসদীয় এলাকার সংসদ সদস্য, উপজেলার ও জেলা শীর্ষ নেতারা সমন্বিতভাবে প্রার্থী বাছাই করা হবে। বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানও বৈঠকে সবাই মিলে প্রার্থী বাছাইয়ের নির্দেশনা দিয়েছেন। সেই অনুসারে আগামী সপ্তাহে জেলার শীর্ষ নেতাসহ সবাই মিলে বসার কথা রয়েছে। এরপর হয়তো প্রার্থী বাছাইয়ে কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হলেও হতে পারে। শিগগির কাজ শুরু করা হবে।
বিএনপির নির্ভরযোগ্য সূত্র বলেছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে শুধু সিটি করপোরেশনের মেয়র প্রার্থীদের আনুষ্ঠানিকভাবে পরিচয় করিয়ে দেবেন বিএনপি চেয়ারম্যান। দলের সিটি করপোরেশনের প্রশাসকরাই দলের প্রার্থী হিসেবে এগিয়ে আছেন। এ ছাড়া ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা ও উপজেলা পর্যায়ে দলীয় প্রার্থী বাছাইয়ে সংশ্লিষ্ট সংসদীয় আসনের জনপ্রতিনিধি ও জেলা-উপজেলার নেতাদের মতামত গুরুত্ব দেওয়া হবে। ইউপি চেয়ারম্যান প্রার্থী বাছাইয়ে উপজেলা এবং পৌর মেয়র ও উপজেলা চেয়ারম্যান বাছাইয়ে জেলার নেতাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি দলের কেউ যেন ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী না হয় সেজন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।