অসৎ সঙ্গ, ছেলে বন্ধু বা স্বামীর প্ররোচনা, পারিবারিক অশান্তি, হতাশা এবং পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রভাবে দেশে নারীদের একটি অংশ মাদকে জড়িয়ে পড়ছেন। বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টদের মতে, মাদকে জড়িয়ে পড়ছেন শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে চিকিৎসক, গৃহিণী ও বিভিন্ন পেশার নারীরাও। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, সামাজিক সংকোচ ও চিকিৎসার সীমিত সুযোগের কারণে তাদের বড় একটি অংশ যথাযথ চিকিৎসার আওতায় আসছেন না।
সরেজমিন রাজধানীর হাজারীবাগ বেড়িবাঁধ, মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প, মিরপুর-১০, মগবাজার, কড়াইল বস্তি ও বাড্ডা এলাকায় নারী মাদক বিক্রেতা ও বাহকের উপস্থিতি দেখা গেছে। মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পের মাদক কারবারি সুলতানা রিজিয়া বলেন, কয়েক বছর আগেও এলাকায় নারী মাদক বিক্রেতা খুব একটা দেখা যেত না। এখন বিভিন্ন সময় নারীদের মাধ্যমে মাদক সরবরাহ ও কেনাবেচার খবর পাওয়া যায়। কারণ ক্রেতারা নারী বিক্রেতাকে বেশি বিশ্বাস করে এবং নিরাপদ মনে করে। আর নারীদের জন্য এখানে মাদক পরিবহন সহজ।
রাজধানীর আফতাবনগর এলাকায় সখিনা বেগম (ছদ্মনাম) নামে এক নারী বলেন, আগে মালিবাগের একটি পোশাক কারখানায় কাজ করলেও প্রায় দুই বছর ধরে তিনি মাদক বিক্রির সঙ্গে যুক্ত। তার দাবি, আফতাবনগরে ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি ও ইমপেরিয়াল কলেজের আশপাশে তিনি ইয়াবাসহ নানা ধরনের মাদক বিক্রি করেন। দিনের তুলনায় সন্ধ্যার পর ক্রেতাদের আনাগোনা বাড়ে। তার কাছে আসা ক্রেতাদের মধ্যে নারী-পুরুষ উভয়ই থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া তরুণ-তরুণীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য বলে জানান তিনি। সখিনা আরও বলেন, নারীদের মাঝে ইয়াবার চাহিদা বেশি। পরিচিত ক্রেতাদের অনেকে নিয়মিত মাদক নেন। মাদক সেবনের জন্য নির্দিষ্ট কক্ষের ব্যবস্থাও করে দেওয়া হয়, যার জন্য ঘণ্টাভিত্তিক টাকা নেওয়া হয়। অধিক মুনাফার আশাতেই এ ব্যবসায় জড়িয়েছেন বলেও জানান তিনি। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে পাঁচ লাখের বেশি নারী কোনো না কোনোভাবে মাদকচক্রের সঙ্গে জড়িত। সাম্প্রতিক এক গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এদের একটি অংশ মাদক বেচাকেনা কিংবা সেবনের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা বলছেন, নারীদের সামাজিক ও পারিবারিক অবস্থান কাজে লাগিয়ে তাদেরকে মাদক পরিবহনে ব্যবহার করছে সংঘবদ্ধ চক্র। বিশেষ করে বড় চালানকে ছোট ছোট অংশে ভাগ করে নারীদের মাধ্যমে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পাঠানো হয়। নারীকে তল্লাশি করতে নারী পুলিশ সদস্যের প্রয়োজন হওয়ায় অনেক সময় এ সুযোগ কাজে লাগানোর চেষ্টা করে মাদক কারবারিরা। বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদকচক্রে নারীদের সম্পৃক্ততা প্রতিরোধে গোয়েন্দা নজরদারি জোরদারের পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ, তরুণদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য ও কাউন্সেলিং সেবা বৃদ্ধি এবং নিয়মিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা জরুরি। তাহলেই মাদকের বিস্তার রোধে কার্যকর অগ্রগতি অর্জন করা সম্ভব হবে। ডিএমপির অতিরিক্ত উপকমিশনার নিয়াজ মেহেদী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, আমরা নারীদের সম্মানের চোখে দেখি। আমরা মনে করি, তারা এসব অপরাধে জড়াবে না। আর এ সুযোগটাই নেয় কিছু অসাধু মানুষ। মাদক ব্যবসায়ীরা বড় বড় চালান ছোট ছোট অংশে নারীদের মাধ্যমে পরিবহন ও পাচার করে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে শিশুদেরও ব্যবহার করা হয়। তিনি আরও বলেন, নারীকে তল্লাশির ক্ষেত্রে নারী পুলিশ সদস্যের প্রয়োজন হয়। এ সুযোগও মাদক কারবারিরা কাজে লাগানোর চেষ্টা করে। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় এ ধরনের কর্মকাণ্ডের ওপর নজর রাখছে।