ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ঘোষিত তারিখ টিকছে না। চলতি বছর এই নির্বাচন আয়োজন নিয়েও শঙ্কা দেখা দিয়েছে। গতকাল স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে অংশ নেওয়া কয়েকজন জানিয়েছেন, চলতি বছর নয়, আগামী জানুয়ারি থেকে ইউপি নির্বাচন শুরু করলে ভালো হয়। ভোট করার জন্য প্রস্তুত হতে কতদিন লাগবে, তা জানাতে এক মাস সময় চাওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচন ও আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে নির্বাচন ভবনে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিনের সভাপতিত্বে দুপুর আড়াইটার পরে শুরু হয়ে সভা চলে বিকেল ৪টা পর্যন্ত। এতে সিইসি ছাড়াও চার নির্বাচন কমিশনার উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া মন্ত্রিপরিষদ সচিব, জনপ্রশাসন সচিব, শিক্ষা সচিব, আইজিপিসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
ইসি গত রোববার ও সোমবার অনানুষ্ঠানিক বৈঠক করে সাত ধাপে ভোটগ্রহণের সম্ভাব্য তারিখ নির্ধারণ করে। ইসির ঘোষণা অনুযায়ী, সম্ভাব্য তারিখগুলো হচ্ছে প্রথম ধাপ ১২ নভেম্বর, দ্বিতীয় ধাপ ১৩ ডিসেম্বর, তৃতীয় ধাপ ৩০ ডিসেম্বর, চতুর্থ ধাপ আগামী বছরের ১৭ জানুয়ারি, পঞ্চম ধাপ ৪ ফেব্রুয়ারি, ষষ্ঠ ধাপ ২২ এপ্রিল এবং সপ্তম ও শেষ ধাপের ভোট ২৭ মে। এর মধ্যে দ্বিতীয় ও তৃতীয় ধাপে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক ইউপির নির্বাচন ধরা হয়েছে। তবে সেদিন ইসির পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় ইউপি নির্বাচনের সময়সীমা চূড়ান্ত করা হবে।
বৈঠক সূত্র জানিয়েছে, নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে সচিবদের কাছে জানতে চাওয়া হয়, ভোট করার সুবিধাজনক সময় কখন? এর প্রতিক্রিয়া মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, নভেম্বর বা ডিসেম্বরে ভোট করার মতো প্রস্তুতি তাদের নেই। ভোট করার জন্য প্রস্তুত হতে কতদিন লাগবে তা জানাতে এক মাস সময় লাগতে পারে। সম্ভাব্য তারিখ ঘোষণার আগে সবার সঙ্গে আলোচনা করে নিলে ভালো হতো বলেও জানিয়েছেন তিনি।
তখন সিইসি বলেন, এটা একেবারে প্রাথমিক সিদ্ধান্ত। তবে আপনারা সময় চিন্তার ক্ষেত্রে প্রতিটি ধাপের ক্ষেত্রে অন্তত ১৫ দিন গ্যাপ রাখার বিষয়টি চিন্তা করবেন।
জনপ্রশাসন সচিব অর্থ বরাদ্দ সংক্রান্ত বিষয় উল্লেখ করে বলেছেন, বৈঠকে অর্থ সচিব আসেনি। সেখানে সবকিছু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কীভাবে হবে?
একজন সচিব বলেছেন, বন্যার প্রভাব এখনো কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। পাশাপাশি ভোটগ্রহণে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের প্রয়োজন। আবার নভেম্বর-ডিসেম্বরে বার্ষিক পরীক্ষা, বৃত্তি পরীক্ষাসহ বিভিন্ন পর্যায়ের পরীক্ষা রয়েছে। তাতে শিক্ষকরা ব্যস্ত থাকবেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভোটকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার হলে পরীক্ষায় ব্যাঘাত হতে পারে। এসময় ভোট করা সম্ভব নয়।
প্রাথমিক ও গণ শিক্ষাসচিব বলেছেন, নভেম্বরে ইন্টারন্যাশনাল অবজারভার টিম আসবে। তারা ডিসেম্বরের পুরো মাস শিক্ষার মান নিয়ে কাজ করবেন। সকল শিক্ষক এতে ব্যস্ত থাকবেন।
আইজিপি বিভিন্ন দিবসের কথা বলেছেন। তিনি জানিয়েছেন, নভেম্বর-ডিসেম্বর পুলিশ ব্যস্ত থাকবে। জানুয়ারি থেকে নির্বাচন করলে পুলিশের জন্য ভালো হবে।
এ ছাড়া পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আইনশৃঙ্খলার বাহিনীর নির্বাচনি প্রশিক্ষণ শেষ করতে ডিসেম্বর নাগাদ সময় লাগবে। উল্লেখ্য, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালনের লক্ষ্যে বুধবার থেকে সারা দেশে নির্বাচনি প্রশিক্ষণ শুরু করেছে পুলিশ।
কমিশনের ইমেজের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে সভায় একজন নির্বাচন কমিশনার বলেন, সম্ভাব্য তারিখ ঘোষণা করা হয়েছে।
বৈঠক শেষে আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, স্পেসগুলো খুব টাইট। টাইট স্পেসের মধ্যে কীভাবে আমরা সব অ্যাকোমোডেট করব, এটা নিয়ে আরও একটু সাইডলাইন ওয়ার্ক করা দরকার আছে। পুরো নভেম্বর এবং ডিসেম্বরজুড়ে হচ্ছে পরীক্ষা। খুবই গ্যাপ কম পাওয়া গেছে। জানুয়ারিতে কিছুটা সময় পাওয়া যাচ্ছে। এরপর রোজা ও এসএসসি পরীক্ষা। এসএসসি শেষে ৬ জুন থেকে এইচএসসি শুরু হওয়ার মধ্যেও কিছুটা সময় পাওয়া যাচ্ছে।
ঘোষিত ইউপি নির্বাচনের সম্ভাব্য সময়সূচি থেকে ইসি সরে এসেছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে এ নির্বাচন কমিশনার বলেন, ‘মোটেও না। আগামী বছর ৬ জুনের আগে নির্বাচন সম্পন্ন করতে বৈঠকে সবাই সম্মত হয়েছে।
তিনি বলেন, আমি তিনটা শব্দ বলেছিলাম, এটা একটা টেন্টেটিভ শিডিউল এবং বলেছিলাম, এটা প্রাক-প্রস্তুতিমূলক সভার আলোকে প্রস্তুতকৃত। আমরা বলেছিলাম যে ১৭ তারিখের (গতকাল) মিটিংয়ের পরে আমরা এটাকে চূড়ান্ত করব।
সানাউল্লাহ বলেন, আপনারা যদি এটা খেয়াল করে থাকেন, আমরা সামান্যতম কোনোখান থেকে সরে আসি নাই। সেটাই বলছি। আজকে আর আমরা যে উপাত্ত পেয়েছি, এটার পরে চূড়ান্ত করব।
অন্যান্য স্থানীয় সরকার নির্বাচন প্রসঙ্গে ইসি সানাউল্লাহ বলেন, অন্যান্য নির্বাচনের ব্যাপারেও আমরা আইন অনুযায়ী যখন যেটা করার প্রয়োজন, তখন সেটা করব। তিনি আরও বলেন, আমাদের প্রাথমিক যে পরিকল্পনাটা ছিল, সে পরিকল্পনার উপরে তারা সবাই মতামত দিয়েছেন। আমরা এটা নিয়ে কমিশনেও বসব।
ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচন প্রসঙ্গে নির্বাচন কমিশনার বলেন, এখানে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতোই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে। সেখানে সেনাবাহিনী থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট সব বাহিনী থাকবে।
এদিকে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে স্থাপিত ভোটকেন্দ্রগুলোর সিসি ক্যামেরার তথ্য চেয়েছে ইসি। আগামী ২৪ সেপ্টেম্বরের মধ্যে এ তথ্য ইসি সচিবালয়ে পাঠাতে গতকাল মাঠপর্যায়ে নির্দেশনা দিয়েছে কমিশন।