Image description
ঝড়বৃষ্টির সঙ্গে কারিগরি ত্রুটি

দেশের প্রধান কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে উৎপাদন কমে যাওয়ায় জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে। আদানি পাওয়ারের গোড্ডা কেন্দ্রের একটি ইউনিটে কারিগরি ত্রুটি, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং কয়েকটি কেন্দ্রে উৎপাদন সক্ষমতার তুলনায় কম বিদ্যুৎ উৎপাদনের কারণে বিদ্যুৎ ঘাটতি আরও বেড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে সারা দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায়। রোববার প্রায় ৩ হাজার মেগাওয়াট লোডশেডিং করতে হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দেশের আটটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মোট উৎপাদন সক্ষমতা ৬ হাজার ৯৩১ মেগাওয়াট। এর মধ্যে একমাত্র ৫২৪ মেগাওয়াট ক্ষমতার বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র ছাড়া বাকি কেন্দ্রগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় কয়লার প্রায় পুরোটাই আমদানিনির্ভর। ইন্দোনেশিয়া, ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে কয়লা আমদানি করা হলেও সবচেয়ে বেশি কয়লা আসে ইন্দোনেশিয়া থেকে।

পাওয়ার গ্রিডের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার চট্টগ্রামের এসএস পাওয়ার প্ল্যান্ট থেকে ১ হাজার ১১২ মেগাওয়াট, মাতারবাড়ী তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে ১ হাজার ১৩০ মেগাওয়াট, রামপালের মৈত্রী সুপার থার্মাল পাওয়ার প্ল্যান্ট থেকে ৮৯৫ মেগাওয়াট, পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ৫৭০ মেগাওয়াট, বরিশাল ইলেকট্রিক থেকে ১৫০ মেগাওয়াট, পটুয়াখালীর কেন্দ্র থেকে ৮০০ মেগাওয়াট এবং বড়পুকুরিয়া থেকে ১৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়েছে।

সপ্তাহখানেক আগেও চিত্র ছিল ভিন্ন। গত ৭ সেপ্টেম্বর এসএস পাওয়ার থেকে ১ হাজার ২২৪ মেগাওয়াট এবং মাতারবাড়ী থেকে ১ হাজার ১৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হলেও রামপালের মৈত্রী সুপার থার্মাল কেন্দ্রের উৎপাদন নেমে এসেছিল মাত্র ৪৫৮ মেগাওয়াটে। একই দিনে পায়রা থেকে ৫৭০ মেগাওয়াট, বরিশাল থেকে ১৫০ মেগাওয়াট, পটুয়াখালী থেকে ১ হাজার মেগাওয়াট এবং বড়পুকুরিয়া থেকে ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়।

এদিকে কয়লা স্বল্পতার কারণে প্রায় এক মাস ধরে সীমিত উৎপাদন করছিল ভারতের ঝাড়খন্ডে অবস্থিত আদানি পাওয়ারের গোড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্র। এর মধ্যে গত বুধবার রাত ১২টার দিকে কারিগরি ত্রুটির কারণে কেন্দ্রটির একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে যায়। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন আরও কমে গিয়ে দেশের লোডশেডিং পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। সূত্র জানায়, ঝড় ও রেলপথে কয়লা পরিবহন জটিলতার কারণে গত ৭ আগস্ট থেকে কেন্দ্রটির উৎপাদন কমে যায়। পরে কয়লা সরবরাহ স্বাভাবিক হতে শুরু করলে বুধবার রাতে উৎপাদন ১ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যায়। কিন্তু একই রাতে একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর উৎপাদন ৭৫০ মেগাওয়াটের নিচে নেমে আসে।

পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয় রোববার। দুপুর ১২টার দিকে কেন্দ্রটির দ্বিতীয় ইউনিট থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ ফের শুরু হয়। সন্ধ্যা ৬টার দিকে কেন্দ্রটির উৎপাদন বেড়ে ১ হাজার ৪৫০ মেগাওয়াট অতিক্রম করে। ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার এ কেন্দ্রটি অতীতে বাংলাদেশের গ্রিডে দেড় হাজার মেগাওয়াটেরও বেশি বিদ্যুৎ সরবরাহ করেছে।

অন্যদিকে আদানির দ্বিতীয় ইউনিট চালুর আগেই নতুন সংকট তৈরি হয় রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রে। রোববার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে কারিগরি কারণে কেন্দ্রটির একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে যায়। ফলে উৎপাদন প্রায় অর্ধেকে নেমে আসে।

ভারত ও বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে নির্মিত ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রটিতে বর্তমানে পর্যাপ্ত কয়লার মজুত রয়েছে। গতকাল সকাল পর্যন্ত কেন্দ্রটি থেকে ১ হাজার ১০০ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছিল। কিন্তু একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর উৎপাদন কমে ৬৫৭ মেগাওয়াটে নেমে আসে। রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের মানবসম্পদ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক আনোয়ারুল আজিম জানিয়েছেন, বন্ধ ইউনিটটি ফের চালু করতে প্রায় চার দিন সময় লাগতে পারে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, জাতীয় গ্রিডে সবচেয়ে বেশি নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের সক্ষমতা রয়েছে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর। কিন্তু এক মাস ধরে বিভিন্ন কেন্দ্রে কয়লাসংকট, যান্ত্রিক ত্রুটি ও উৎপাদন বিঘ্নের কারণে কাঙ্ক্ষিত বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবধান বাড়ছে।

রোববার সন্ধ্যায় দেশে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল ১৮ হাজার ১৭৮ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে উৎপাদন করা হয়েছে ১৫ হাজার ২৫৫ মেগাওয়াট। ফলে ঘাটতি দাঁড়ায় ২ হাজার ৯২৩ মেগাওয়াট। তাই লোডশেডিং করতে হয়েছে। বিদ্যুৎ খাত সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন দ্রুত স্বাভাবিক না হলে চলমান লোডশেডিং পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে।

সার্বিক বিষয়ে পিডিবির সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম কালবেলাকে বলেন, সম্প্রতি বৃষ্টিপাতের কারণে কয়লা ভিজে যাওয়ায় কিছু কেন্দ্রের উৎপাদন কমে যায়। তবে এখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসছে, বর্তমানে ৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কয়লা থেকে উৎপাদন করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, অন্যান্য দেশে বৃষ্টি বা এ ধরনের দুর্যোগ থেকে কয়লাকে সুরক্ষিত রাখতে আধুনিক কয়লা মজুত ব্যবস্থাপনা রয়েছে। আমাদের দেশেও এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এরই মধ্যে ফিজিবিলিটি টেস্ট করা হয়েছে।