Image description
প্রভাব পড়তে পারে ভোটের সমীকরণে

আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে আলাদাভাবে নির্বাচনি প্রস্তুতি নিচ্ছে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। জাতীয় রাজনীতিতে ১১ দলীয় ঐক্য অটুট থাকলেও দল দুটি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জোটগতভাবে নয়, দলীয় একক প্রার্থী নিয়ে ভোটে অংশগ্রহণের কৌশল নিয়েছে। ফলে সিটি করপোরেশন, উপজেলা, পৌরসভা ও ইউপি নির্বাচনে দুই দলের প্রার্থীদের সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। জোট সূত্র জানায়, স্থানীয় নির্বাচনে পৃথকভাবে অংশ নিলেও ১১ দলীয় ঐক্য থাকছে। রাজনৈতিক কর্মসূচির ক্ষেত্রে দলগুলোর মধ্যে সমন্বয় অব্যাহত থাকবে।

জামায়াত স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে গুরুত্ব দিয়ে নিজেদের প্রার্থী বাছাই ও সাংগঠনিক প্রস্তুতি এগিয়ে নিচ্ছে। দলটি এরই মধ্যে ঢাকাসহ ১৩টি সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে। এ ছাড়া সারা দেশের উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদসহ (ইউপি) স্থানীয় নির্বাচনে ৮০ শতাংশের মতো একক প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে। এরই মধ্যে জেলা ও মহানগরের অভ্যন্তরীণ বৈঠকে প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করে তারা ভোটের মাঠে প্রচারণা চালাচ্ছে।

অন্যদিকে, এনসিপি ঢাকার দুই সিটি, রাজশাহী, বরিশাল ও কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে একক প্রার্থী ঘোষণা করেছে। এ ছাড়া ৬৪টি উপজেলা পরিষদ ও ৩৬টি পৌরসভা নির্বাচনের জন্য দলটি প্রাথমিকভাবে প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে। ফলে একই নির্বাচনি এলাকায় জামায়াত ও এনসিপির প্রার্থীরা মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন। এর মধ্য দিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নিজেদের জনপ্রিয়তার যাচাইয়ের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে দলের সাংগঠনিক সক্ষমতা যাচাই করতে চাইছে দল দুটি।

জামায়াতের নীতিনির্ধারকরা বলছেন, অতীতের স্থানীয় সরকার নির্বাচন কখনো জোটগতভাবে হয়নি। সব দলই আলাদাভাবে অংশ নিয়েছে। কারণ স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এত এলাকা সমঝোতা করার কঠিন কাজ। তবে উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ পর্যায়ে স্থানীয় নেতারা পরিস্থিতি বিবেচনায় সমঝোতার ভিত্তিতে প্রার্থী দিলে সে বিষয়ে কেন্দ্রের আপত্তি থাকবে না।

জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার কালবেলাকে বলেন, সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ১১ দলীয় ঐক্য গড়ে উঠেছিল। কিন্তু আমাদের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে একটা সমঝোতা হয়েছে, জাতীয় নির্বাচনে জোট হলেও স্থানীয় নির্বাচনে প্রত্যেক দল নিজস্ব প্রার্থী দিয়ে নির্বাচন করবে। এখানে স্থানীয় নির্বাচনে জোটগত কোনো প্রার্থী হবে না। তিনি জানান, ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা ও সিটি করপোরেশনে প্রার্থী মনোনয়নের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।

জামায়াত ও এনসিপির সূত্র জানায়, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জোটবদ্ধ প্রার্থী না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সব এলাকায় জোটের পক্ষ থেকে একক প্রার্থী ঠিক করা বাস্তবে কঠিন। কারণ স্থানীয় নির্বাচনে দলীয় প্রতীক থাকছে না। প্রত্যেক প্রার্থীই স্বতন্ত্র প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। তবে প্রার্থীদের নিজস্ব রাজনীতির ব্যাকগ্রাউন্ড থাকবে। আলাদাভাবে নির্বাচন করলে ভোটের প্রভাব পড়তে পারে। এক দল আরেক দলের ভোট কাটতে পারে, সে বিষয়টিও মাথায় আছে। একই এলাকায় জোটের প্রার্থী দিলে ভোট বিভক্ত হয়ে যাবে। এতে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিএনপি সুবিধা পাবে বলেও মনে করেন অনেকে।

জামায়াত ও এনসিপির একাধিক নেতা বলছেন, কোথাও কোথাও স্থানীয়ভাবে সমঝোতা হতে পারে। এতে কেন্দ্রের আপত্তি থাকবে না। বিশেষ করে যে এলাকায় জোটের যে দলের প্রার্থীর জয়ের সম্ভাবনা বেশি থাকবে তাকে সমর্থন দিয়ে অন্য প্রার্থী সরে দাঁড়াতে পারে। শেষ পর্যন্ত জোটগতভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচন হবে কি না, তা নির্বাচনের তপশিল ঘোষণার পর পরিষ্কার হবে।

এ বিষয়ে এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন কালবেলাকে বলেন, আমরা স্থানীয় সরকার নির্বাচন এককভাবে করার প্রস্তুতি শুরু করেছি। দেশের অনেক এলাকার প্রার্থী চূড়ান্ত করা হয়েছে। বাকি এলাকায়ও প্রার্থী বাছাইয়ের কাজ চলমান রয়েছে। আমাদের সম্ভাব্য প্রার্থীদের ভোটারদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হচ্ছে। নির্বাচনের সময় যদি জোটগত পরিস্থিতি তৈরি হয়, তখন সে অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

ঢাকার দুই সিটিতে হতে পারে বড় পরীক্ষা জানা গেছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জামায়াত ও এনসিপি দুদলের রাজনৈতিক শক্তি পরীক্ষার পাশাপাশি জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের পরীক্ষাও হতে পারে। পুরোনো সংগঠন নাকি নতুন রাজনৈতিক পরিচিতি—কোনটি ভোটারদের বেশি টানে, তা বোঝা যাবে নির্বাচনে। বিশেষ করে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দুই দলের আলাদা অবস্থানের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হতে পারে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচন। ঢাকা উত্তরে দলের মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এবং ঢাকা দক্ষিণে মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে প্রার্থী ঘোষণা করেছে এনসিপি। অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে ডাকসুর ভিপি আবু সাদিক কায়েম এবং উত্তর সিটিতে জামায়াতের ঢাকা মহানগর আমির সেলিম উদ্দিনকে প্রার্থী ঘোষণা করেছে জামায়াত। পৃথক অবস্থান দল দুটি শেষ পর্যন্ত ধরে রাখলে ঢাকার দুই সিটিতে জামায়াত ও এনসিপির সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা যেতে পারে।

এনসিপির নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানায়, জাতীয় নির্বাচনের মতোই স্থানীয় সরকার নির্বাচনও জোটগতভাবে করতে আগ্রহী এনসিপি। কিন্তু এতে জামায়াতের আগ্রহ কম। এজন্য এনসিপিও কৌশলের অংশ হিসেবে ঢাকা সিটিতে প্রার্থীর এলাকা রদবদল ও ভোটার এলাকাও পরিবর্তন করেছে। আগের সিদ্ধান্ত ছিল ঢাকা দক্ষিণে আসিফ মাহমুদ ও উত্তরের নাসিরুদ্দীন পাটওয়ারী। অন্য দলের সম্ভাব্য প্রার্থীদের জনপ্রিয়তা, সাংগঠনিক সক্ষমতা এবং স্থানীয় পর্যায়ে গ্রহণযোগ্যতার বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়েই এই প্রার্থী পরিবর্তন করা হয়েছে। এখন সাদিক কায়েম ও নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী একে অন্যের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

প্রতিদ্বন্দ্বিতা হলেও সংঘাত নয় জামায়াত, এনসিপিসহ জোটের শরিক দলগুলোর মধ্যে স্থানীয় নির্বাচনে পৃথকভাবে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও তা যেন বড় রাজনৈতিক সংঘাতে রূপ না নেয়, সে বিষয়েও কেন্দ্রের পাশাপাশি জেলা পর্যায়েও সমন্বয়ের চিন্তা করছেন ১১ দলীয় ঐক্যর দায়িত্বশীল নেতারা। সূত্র জানায়, স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থী আলাদা হলেও ঐক্য অটুট থাকবে। সরকার বা নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে স্থানীয় ভোটে কোনো ধরনের কারচুপি বা প্রভাব বিস্তার চেষ্টা করলে তা ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিবাদ করবে ঐক্য।

দল দুটির একাধিক নেতা বলছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে তারা জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো করে দেখছে না। কারণ স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থীর ব্যক্তিগত পরিচিতি ও স্থানীয় সম্পর্ক ভোটের ফলাফলে বড় ভূমিকা রাখে। তাই স্থানীয় নির্বাচনে সব জায়গায় একটি দলের প্রার্থীকে সমর্থন করা বাস্তবসম্মত নাও হতে পারে। এ ছাড়া তৃণমূল পর্যায়ে দলের রাজনৈতিক ভিত্তি বিস্তারের সুযোগ হিসেবে দেখছে অনেকে।

এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু কালবেলাকে বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে যেহেতু নির্দলীয় ফরম্যাটে হচ্ছে। সেহেতু এই নির্বাচনে জাতীয় পর্যায়ে জোট হওয়ার সম্ভাবনা কম। তবে স্থানীয়ভাবে কোনো কোনো জেলা বা উপজেলায় সমঝোতা হতে পারে।