Image description

নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করার কথা, কিন্তু সময় শেষ হলে দেখা যায় কাজ বাকি। এরপর বাড়ে প্রকল্পের মেয়াদ। কোথাও একবার, কোথাও দুবার, আবার কোনো প্রকল্পে তিন দফায়ও সময় বাড়ানো হয়েছে। এর সঙ্গে কোনো কোনো ক্ষেত্রে বেড়েছে প্রকল্পের ব্যয়ও। ফলে প্রশ্ন উঠেছে- উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের সময় যে সময় ও অর্থের হিসাব করা হয়, বাস্তবায়নের পর্যায়ে তা বারবার কেন বদলে যাচ্ছে? রাজশাহী বিভাগের কৃষি উন্নয়নে আধুনিক প্রযুক্তি সম্প্রসারণের জন্য নেওয়া প্রকল্পটির মূল অনুমোদিত ব্যয় ছিল ১৪৭ কোটি টাকা।

মূল মেয়াদ ছিল পাঁচ বছর, ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ হয়নি। প্রথম দফায় এক বছর বাড়িয়ে মেয়াদ করা হয় ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। এরপর দ্বিতীয় সংশোধনীতে মেয়াদ বাড়ানো হয়ে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত। শুধু সময়ই বাড়েনি। প্রথম সংশোধনীতে প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ১৬৮ কোটি ২০ লাখ টাকা।

দ্বিতীয় সংশোধনীতে আরও ৩৫ কোটি ৭৯ লাখ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়। এতে ব্যয় দাঁড়ানোর কথা ২০৩ কোটি ৯৯ লাখ টাকা। অর্থাৎ মূল অনুমোদিত ব্যয়ের তুলনায় সম্ভাব্য বৃদ্ধি প্রায় ৫৭ কোটি টাকা, বা প্রায় ৩৯ শতাংশ। এ বিষয়ে কৃষি উন্নয়নে আধুনিক প্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রকল্পের পরিচালক হাসানুজ্জামান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানান, প্রকল্পের টাকা এখনো আছে। সেটি খরচ করতে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভৌত অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পেও দীর্ঘসূত্রতা দেখা দিয়েছে।

২০১৭ সালে প্রকল্পটির জন্য ৩৬৩ কোটি ৮৭ লাখ টাকা অনুমোদন দেওয়া হয়। মূল মেয়াদ ছিল জানুয়ারি ২০১৭ থেকে জুন ২০২২। কিন্তু কাজ নির্ধারিত সময়ে শেষ হয়নি। পরবর্তীতে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ও রেট শিডিউল পরিবর্তনের কারণে প্রথম সংশোধনে প্রকল্প ব্যয় বাড়িয়ে ৫১০ কোটি ৯৯ লাখ টাকা করা হয়। অর্থাৎ ব্যয় বাড়ে প্রায় ১৪৭ কোটি ১২ লাখ টাকা। ২০২৫ সালের নভেম্বরের প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রকল্পটির মেয়াদ তৃতীয়বারের মতো বাড়িয়ে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত নেওয়া হয়। আট বছরেও প্রকল্পের আওতায় কয়েকটি বড় ভবনের কাজ শেষ হয়নি। ফলে ২০২৮ সাল পর্যন্ত প্রকল্পগুলোর মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভৌত অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক এস এম ওবাইদুল ইসলাম জানান, করোনা, রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে ঠিকাদার ঠিকমতো কাজ করতে পারেনি। সবকিছু বিবেচনা করে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। 

রাজশাহী শিশু হাসপাতালের কাজের সময় বাড়ানো হয়েছে তিনবার। আর ব্যয় বেড়েছে আড়াই গুণ। এর নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল ২০১৫ সালের মে মাসে। প্রায় ১৩ কোটি টাকা ব্যয়ে কাজটি শেষ করার কথা ছিল ২০১৮ সালের জুনে। কাজ শেষ না হওয়ায় প্রথমে মেয়াদ বাড়িয়ে করা হয় ২০১৯ সালের ডিসেম্বর। তাতেও কাজ শেষ হয়নি। দ্বিতীয় দফায় সময় বাড়ানো হয় ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত। এরপর তৃতীয় দফায় মেয়াদ বাড়িয়ে নেওয়া হয় ২০২১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। সময়ের সঙ্গে ব্যয়ও বেড়েছে। গণপূর্তের নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদুল ইসলাম জানান, ভবনের নকশায় পরিবর্তন আনা হয়েছে। এ কারণে ব্যয় বেড়েছে। রাজশাহী ওয়াসা ভবন নির্মাণ প্রকল্পের মূল ব্যয় ছিল ৬৫ কোটি ৯৯ লাখ টাকা। ২০১৯ সালে প্রকল্পটি অনুমোদনের সময় এই ব্যয়ের কথা জানানো হয়েছিল।

পরবর্তীতে এটি ‘প্রথম সংশোধিত’ প্রকল্প হিসেবে এডিপিতে আসে। পরিকল্পনা কমিশনের ২০২৪-২৫ সালের সংশোধিত এডিপিতে প্রকল্পটির অনুমোদিত ব্যয় ৬৯ কোটি ৮৪ লাখ টাকা এবং বাস্তবায়নকাল ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত দেখানো হয়। এরপর ২০২৫-২৬ সালের এডিপিতে প্রকল্পটি ‘দ্বিতীয় সংশোধিত’ হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছে। তিনবার সময় বাড়িয়েও শেষ হয়নি নওহাটার রাস্তা। রাজশাহীর নওহাটা পৌরসভার ১০টি রাস্তা নির্মাণ ও সংস্কারের জন্য প্রায় ২০ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। ২০২৩ সালের ১১ ডিসেম্বর কার্যাদেশ দেওয়ার সময় এক বছরের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ হয়নি।

এরপর দ্বিতীয় দফায় মেয়াদ বাড়ানো হয় আরও এক বছর। সর্বশেষ তৃতীয় দফায় এক মাস সময় দেওয়া হয়। নওহাটা পৌরসভার প্রকৌশলী আতাউর রহমান জানান, এ মাসের মধ্যে রাস্তাগুলোর কাজ শেষ হবে। সেজন্য ঠিকাদারকে তাগাদা দেওয়া হচ্ছে। ২০২২ সালে শুরু হয় রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (আরএমইউ) প্রকল্প। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৬ সালের মধ্যেই চালু হওয়ার কথা ছিল ১ হাজার ২০০ শয্যার একটি আধুনিক হাসপাতাল।

তবে প্রকল্প শুরুর প্রায় চার বছর পরও হাসপাতাল বা একাডেমিক ভবনের মতো প্রধান স্থাপনাগুলোর নির্মাণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি নেই। সম্প্রতি বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) প্রকাশিত এক মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কয়েক শ কোটি টাকা ব্যয় এবং দীর্ঘ সময় পার হলেও প্রকল্পটি এখনো মূলত প্রস্তুতিমূলক কাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ আছে। রামেবির উপাচার্য অধ্যাপক ডা. জাওয়াদুল হক বলেন, ‘জমি অধিগ্রহণের জটিলতা, সীমানা বিরোধ, বন বিভাগের অনুমোদনে বিলম্ব, বর্ষাকালে জলাবদ্ধতা, নকশা পরিবর্তন, নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি এবং বালু সংকটের কারণে কাজ শুরু করতে কিছুটা দেরি হয়েছে। তবে এখন পুরোদমে কাজ চলছে।’

সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সভাপতি আহমেদ শফি উদ্দিন বলেন, সময় পেরিয়ে গেলে যদি কাজ অসম্পূর্ণ থাকে, তাহলে শুধু প্রকল্পের মেয়াদই বাড়ে না, বাড়ে মানুষের অপেক্ষা, দুর্ভোগ এবং রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যবহারের প্রশ্নও। ঠিকাদারদের সুবিধা না দিয়ে, কেন এমনটা হচ্ছে, সেটি খুঁজে বের করে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করতে সরকারের কঠোর অবস্থান নেওয়া জরুরি।