আন্দোলন-সংগ্রামে নির্যাতিত ও ত্যাগী নেতাদের যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রশাসনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের মধ্য দিয়ে এক বিশেষ মূল্যায়ন প্রক্রিয়া শুরু করেছে বিএনপি। সূত্র জানিয়েছে, হাইকমান্ডের এ উদ্যোগ এরই মধ্যে বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড, রাজনৈতিক ত্যাগ, জনসম্পৃক্ততা ও নেতৃত্বের সক্ষমতাকে গুরুত্ব দিয়ে সম্ভাব্য ব্যক্তিদের একটি তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। অনেক নেতার সঙ্গে এরই মধ্যে কথা বলেছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এর অংশ হিসেবে গত বৃহস্পতিবার রাতে ১২ জনকে সরকারি বিভিন্ন সংস্থায় চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল কালবেলাকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছিলেন, মিছিলের শেষ প্রান্তে থাকা দলের নিবেদিত ও সক্রিয় থাকা লোকদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হবে। তারই ধারাবাহিকতায় রাজপথের সক্রিয় ও পরীক্ষিত নেতাকর্মীদের সরকারি বিভিন্ন জায়গা পদায়নের মধ্য দিয়ে মূল্যায়নের কার্যক্রম শুরু করেছেন তিনি। ভবিষ্যতে সরকারি বিভিন্ন উইংয়ে এ কার্যক্রম আরও বাড়বে। এ ছাড়া দল ও সংগঠনে অনেককে পদপদবি দিয়েও মূল্যায়ন করা হবে। দল ও সরকার উভয় জায়গাতেই নেতাকর্মীদের দক্ষ ও যোগ্যতা অনুযায়ী মূল্যায়ন করার পরিকল্পনা রয়েছে।
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স কালবেলাকে বলেন, সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাদের দায়িত্ব দেওয়া হবে, সেটি প্রধানমন্ত্রীর অভিপ্রায়। সবার মূল্যায়ন একইভাবে করা সম্ভব নয়। কারণ প্রত্যেকের যোগ্যতা, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা আলাদা। তিনি বলেন, যাদের প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা রয়েছে, তাদের সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে।আবার অনেককে রাজনৈতিকভাবে দলীয় পদপদবির মাধ্যমে মূল্যায়ন করা হতে পারে। নেতাকর্মীদের আরও কিছুদিন অপেক্ষা করার আহ্বান জানান তিনি।
এমরান সালেহ প্রিন্স আরও বলেন, আমার কাছে মূল্যায়ন মানে হলো জনগণের জন্য কতটা কাজ করতে পারলাম, দেশের প্রতি কতটা দায়িত্ব পালন করলাম এবং দলের জন্য কতটা অবদান রাখতে পারলাম। দল জনগণের সঙ্গে কাজ করার ক্ষেত্র তৈরি করে দিতে পারে; কিন্তু কাজের কাজের মূল্যায়ন করবে জনগণই।
বিএনপির একাধিক সূত্র জানায়, সরকারি বিভিন্ন সংস্থায় দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশাগত দক্ষতা, প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং গ্রহণযোগ্যতার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা ও দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক অবদানও মূল্যায়নের অন্যতম মানদণ্ড হিসেবে রাখা হয়েছে। সূত্রগুলোর ভাষমতে, এরই মধ্যে মহিলা দলের নেত্রীদের সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য করা হয়েছে। সংগঠনের আরও যারা যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বিবেচনার দাবি রাখেন, তাদেরও আগামীদিনে পর্যায়ক্রমে মূল্যায়ন করা হতে পারে। একইভাবে যুবদলের কয়েকজন নেতা সরকারি বিভিন্ন দায়িত্বে মূল্যায়ন করা হয়েছে। এখনো যারা কোনো দায়িত্ব পাননি, তাদের বিএনপির হাইকমান্ড বিবেচনায় রেখেছেন।
মূল্যায়নের অংশ হিসেবে গত বৃহস্পতিবার রাতে সরকারি ১২টি সংস্থায় চেয়ারম্যান, মহাপরিচালকসহ বিভিন্ন পদে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়েছে সরকার। সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার একান্ত সচিব মো. সামসুল আলমকে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব; বিএনপির আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক মোহাম্মদ রাশেদুল হককে বাংলাদেশ ওভারসিজ অ্যামপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেডের (বোয়েসেল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক; বিএনপির বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক মোহাম্মদ মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলকে বাংলাদেশ বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশনের চেয়ারম্যান; বিএনপির বন ও পরিবেশবিষয়ক সহসম্পাদক কাজী রওনাকুল ইসলামকে (টিপু) বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক; বিএনপির সহসাংগঠনিক সম্পাদক (ঢাকা বিভাগ) বেনজীর আহমেদ টিটোকে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প করপোরেশনের চেয়ারম্যান; বিএনপির ধর্মবিষয়ক সহসম্পাদক এটিএম আবদুল বারী ড্যানীকে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশনের (বিআইডব্লিউটিসি) চেয়ারম্যান; যুবদলের সাবেক সিনিয়র সভাপতি মো. মামুন হাসানকে বাংলাদেশ জুট মিল করপোরেশনের (বিজেএমসি) চেয়ারম্যান, যুবদলের সাবেক সহসভাপতি মো. জাকির হোসেন সিদ্দিকীকে বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের চেয়ারম্যান; জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় কার্যকরী সভাপতি মো. সালাহ উদ্দিন সরকারকে বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক; বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য মো. শামসুজ্জামান সুরুজকে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের চেয়ারম্যান; বিএনপির সহসাংগঠনিক সম্পাদক (রংপুর বিভাগ) আব্দুল খালেককে বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল করপোরেশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান ও যুবদলের সাবেক সহসভাপতি মো. কামরুজ্জামান কামরুজ্জামান দুলালকে বাংলাদেশ সমাজ কল্যাণ পরিষদের নির্বাহী সচিব পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, এদের প্রত্যেকে সংগঠনের অন্য যে কোনো পেশা, ব্যবসা কিংবা সরকারি, আধাসরকারি বা বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠান বা সংগঠনের সঙ্গে বিদ্যমান কর্মসম্পর্ক ত্যাগ করতে হবে। যোগদানের তারিখ থেকে পরবর্তী এক বছরের জন্য তাদের এ চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ কার্যকর হবে।
মোহাম্মদ রাশেদুল হক এক প্রতিক্রিয়ায় কালবেলাকে বলেন, আমরা দলের একজন কর্মী। দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য যখন যেখানে যে দায়িত্ব দেবেন, সেটা যথাযথভাবে পালনই আমাদের কর্তব্য। ইনশাআল্লাহ তিনি যে আস্থা ও বিশ্বাস রেখে আমার ওপর দায়িত্ব দিয়েছেন, আমি সেটা পালনে সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।