যাত্রীর অভাব নেই। আসন সংখ্যার চেয়ে বেশি যাত্রী নিয়ে ছুটছে সবগুলো ট্রেন। আছে টিকিটের হাহাকারও। তবুও লোকসান। গত দুই অর্থবছরে রেল গড়ে প্রায় পৌনে তিন হাজার কোটি টাকা করে লোকসান দিয়েছে। চুরি-দুর্নীতি নিয়ে পত্র-পত্রিকায় লেখালেখিও কম হচ্ছে না। শেষ পর্যন্ত যেই লাউ সেই কদু। দুর্বল ব্যবস্থাপনার কাছে হার মেনে অবশেষে ট্রেন ইজারাতেই সমাধান দেখছে কর্তৃপক্ষ। রেলওয়ের দাবি, বেসরকারি ব্যবস্থাপনাতেই ট্রেনে লাভ বেশি। ‘লাভের আশায়’ নতুন করে আরও ১৭টি যাত্রীবাহী ট্রেন বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে ১৩ জোড়া ট্রেন ইজারায় চলছে, নতুন করে আরও ১৭ জোড়া ওই তালিকায় যুক্ত হচ্ছে। অর্থাৎ ৩০ জোড়া ট্রেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করবে। রেল বলছে, ইজারায় ৬০টি ট্রেন পরিচালনায় বছরে রেল আয় করবে প্রায় শতকোটি টাকা।
কথা হয় রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) মো. নাজমুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি যুগান্তরকে বলেন, রেলপথ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় ট্রেন ইজারা দেওয়া হচ্ছে। কম দূরত্বে চলা ট্রেনগুলো সরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালনা করতে গেলে সরকারের ব্যাপক লোকসান হয়। লোকবল স্বল্পতার কারণে ট্রেনগুলো পরিচালনা করাও সম্ভব হচ্ছে না। অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহণ ও রাজস্ব আয় বৃদ্ধির লক্ষ্যে ট্রেন ইজারা দেওয়া হচ্ছে। বর্তমান জনবল ও ব্যবস্থাপনাগত সীমাবদ্ধতার কারণে আপাতত ইজারা পদ্ধতিকেই তুলনামূলক কার্যকর সমাধান হিসাবে দেখা হচ্ছে।
নতুন করে পশ্চিমাঞ্চলে ১১ জোড়া এবং পূর্বাঞ্চলে ৬ জোড়া যাত্রীবাহী ট্রেন বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালনার জন্য অনুমোদন দিয়েছে রেল। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে ট্রেনগুলো ইজারা দেওয়া হবে। এ সংক্রান্ত প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে রেলওয়ে সদর দপ্তরে। তবে এ উদ্যোগে আয় বৃদ্ধির সম্ভাবনা থাকলেও ভাড়া বৃদ্ধি এবং নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টির শঙ্কা রয়েছে। তবে রেলওয়ে বলছে, কম ভাড়া, উচ্চ পরিচালন ব্যয় ও ব্যাপক টিকিট ফাঁকির কারণে দীর্ঘদিন ধরেই সরকারি ব্যবস্থাপনায় চলা লোকাল, মেইল ও কমিউটার ট্রেনগুলো ব্যাপক লোকসান গুনছে। স্থানীয় রুটে অধিকাংশ যাত্রী টিকিট ছাড়াই ভ্রমণ করে। সব লজিস্টিকস থাকার পরও রেলওয়ে কেন যাত্রীদের টিকিট নিশ্চিত করতে পারছে না সেই প্রশ্ন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, কেউ কেউ কাউন্টার থেকে টিকিট সংগ্রহ না করে ট্রেনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীদের অর্থ দিয়ে যাতায়াত করে। লোকাল, মেইল ট্রেনগুলোতে এ ধরনের যাত্রী সংখ্যা ৯০ ভাগের বেশি।
সূত্র বলছে, ইজারায় ট্রেন পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রতিটি ট্রেনের জন্য ৪০ দিন আগে নির্ধারিত অর্থ (প্রতিদিনের জন্য) রেলে জমা দিতে হয়। তাছাড়া প্রতিটি ট্রেনের জন্য ৪০ দিনের সমপরিমাণ অর্থ জামানত হিসাবে জমা রাখতে হয়। জামানতের সঙ্গে ট্রেন পরিচালনার আগেই টাকা জমা দেওয়ার পরও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো ট্রেন পরিচালনা করে লাভ করছে। জানা যায়, রেলওয়ের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলে ১৩ জোড়া ট্রেন পরিচালনায় বার্ষিক আয় ছিল ২১ কোটি ১৬ লাখ ৯০ হাজার ৭০৪ টাকা। বেসরকারি পরিচালনায় বার্ষিক আয় হয় ৫৮ কোটি ২৭ লাখ ১৩ হাজার ২৬ টাকা। বাংলাদেশ রেলওয়ে পোষ্য সোসাইটির সভাপতি মনিরুজ্জামান মনির বলেন, ইজারাদাররা লাভবান হতে পারলে কেন রেল পারবে না। তিনি বলেন, একই রেললাইন, একই কোচ, একই যাত্রী এবং একই সরকারি ভাড়ায় যদি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান লাভ করতে পারে, তাহলে বাংলাদেশ রেলওয়ে কেন পারবে না? এর উত্তর রেলওয়ে প্রশাসনকে জনগণের সামনে দিতে হবে।
রেলওয়ের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেছেন, ইজারায় চলা ট্রেনে সরকারিভাবে ট্রেনচালক, গার্ড ও জ্বালানি প্রদান করা হচ্ছে। ইজারাদাররা শুধু মাত্র লোকবল দিয়ে যাত্রী পরিবহণ করছে। তিনি বলেন, ৭০টি যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে। বন্ধ ট্রেনগুলো মেরামত করে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ইজারা দেওয়ারও পরিকল্পনা রয়েছে।
স্বাধীনতার পর মাত্র এক বছরই বাংলাদেশ রেলওয়ে লাভ করেছিল। ১৯৯৮-৯৯ অর্থবছরে সংস্থাটি ১ টাকা আয়ের বিপরীতে ব্যয় করেছিল ৯৫ দশমিক ৯ পয়সা। রেলের আয়ের উৎস মূলত যাত্রী ও মালামাল পরিবহণ। এর বাইরে নিজেদের ভূমি ইজারা দিয়ে কিছু আয় করে থাকে রেলওয়ে। সূত্র বলছে, রেলে ট্রেনচালক, গার্ড, টিটিই ও মাঠপর্যায়ে থাকা জনবল স্বল্পতা চরমে উঠছে। রেলওয়ে দীর্ঘদিন ধরে সিমেন্ট, সার, পাট, জ্বালানি ও খাদ্যপণ্য পরিবহণে উল্লেখযোগ্য আয় করে আসছিল। ধীরে ধীরে এসব পণ্যের পরিবহণ তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। এদিকে সেবার মান ও লাভজনক বিবেচনায় পৃথিবীর অন্যতম শীর্ষে ভারতের রেলব্যবস্থা। দেশটি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১ রুপি আয়ের বিপরীতে ৯৮ দশমিক ৩২ রুপি খরচ করেছে। অর্থাৎ তাদের রেলওয়ে লাভজনক অবস্থায় রয়েছে।
কানাডার রেলব্যবস্থা গত বছর প্রতি ১ ডলার আয় করতে ৬৩ সেন্ট খরচ করেছে।
বুয়েটের অধ্যাপক ড. এম সামছুল হক যুগান্তরকে বলেন, ট্রেন ইজারা মানেই রেলের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা। রেলের যে সম্পদ রয়েছে তা দিয়েই রেল লাভজনক হতে পারে। রেলের আয় বাড়ানোর স্বীকৃত পথ হচ্ছে কনটেইনার ও মালামাল পরিবহণ বাড়ানো। কিন্তু এ পথে রেল হাঁটছে না। রেল ট্রেন ইজারা দেওয়ার পথে হাঁটছে। হাজার হাজার একর রেলের জমি বেদখলে রয়েছে-এসব জমি থেকে আয় আসছে না। তিনি বলেন, কমিউটার ট্রেন, সার্কুলার ট্রেন বা শহরকেন্দ্রিক ট্রেন বাড়ানো হলে তা পরিচালনার মধ্য দিয়ে রেল ব্যাপক আয় করতে পারে।