বেশ কিছু দিন ধরে নতুন প্রজন্মকে নিয়ে কত কথাই না বলা হচ্ছিল। তারা নাকি মোবাইলে সারাক্ষণ মুখ গুঁজে থাকা প্রজন্ম। ঘরের কোণে চুপচাপ বসে থাকা ‘প্রাণী’। বাইরে খেলতে যায় না বা চায় না। আকাশটা পর্যন্ত দেখে না। সালাম-নমস্কারের বালাই নেই, সবকিছুতেই বিরক্তি হতাশা- পারব তো, হবে তো। এদের দিয়ে কিচ্ছু হবে না-ভুল, সবই ভুল। জেন-জিরা আজ বিশ্বে সাম্য প্রতিষ্ঠায় নতুন স্বপ্ন দেখাচ্ছেন। জেন-জি এখন প্রচণ্ড এক শক্তির নাম, যারা প্রথাগত রাজনৈতিক ও সমাজব্যবস্থা ভেঙে নতুন রূপ দিচ্ছেন। বাংলাদেশ তার বড় প্রমাণ। শুধু কি বাংলাদেশ, না। দক্ষিণ এশিয়ায় শ্রীলংকা দিয়ে শুরু। কয়েক দিনের টানা আন্দোলনে রাজাপাকসে পরিবারের দীর্ঘ শাসনামলের অবসান ঘটে। বাংলাদেশে কোটাবিরোধী আন্দোলন দিয়ে জেন-জিদের যাত্রা।
কয়েক দিনের মধ্যেই গোটা দেশ গণতন্ত্রহীনতা আর অবাধ দুর্নীতির বিরুদ্ধে জেগে ওঠে। পতন হয় শেখ হাসিনা সরকারের। তরুণ প্রজন্মের বিক্ষোভের মুখে নেপালে প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা অলি পদত্যাগে বাধ্য হন। জেন-জিদের আন্দোলনে পতন ঘটে মাদাগাস্কার সরকারের। ভারতে শুরু হয়েছে জেন-জিদের দুর্বার আন্দোলন। পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং শিক্ষায় অব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে আন্দোলন বেগবান হচ্ছে। যে কোনো মুহূর্তে গণবিস্ফোরণ ঘটতে পরে। ফিলিপাইন, মরক্কো, পেরুবাসীকেও জেন-জিদের গা-গরম করা স্লোগানে উজ্জীবিত করেছিল। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ায় জেন-জিদের এসব আন্দোলন কী বার্তা দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্ষমতার আড়ালে সত্যকে লুকানো হলেই জেন-জিরা পথে নামছে। তথ্যপ্রযুক্তির যুগে যখনই তারা বুঝতে পারে সঠিক তথ্য লুকানো হচ্ছে; দুর্নীতি, অন্যায়ের আশ্রয় নিয়ে তাদের ঠকানো হচ্ছে তখনই তারা সংঘবদ্ধ হচ্ছে। কর্মসংস্থান কম সৃষ্টি হওয়ার কারণেও জেন-জিদের এমন উত্থান বলে মনে করা হচ্ছে।
কথা হয় সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে। তিনি যুগান্তরকে বলেন, যারাই ক্ষমতায় থাকে তাদের মধ্যে ক্ষমতার দম্ভ কাজ করে। আগাগোড়া এটিই দেখে এসেছি। ডিজিটাইজেশনের ফলে তথ্যপ্রবাহে বিরাট পরিবর্তন এসেছে। আগে তথ্য উপর থেকে নিচের দিকে আসত। অর্থাৎ ক্ষমতায় যারা আছে তাদের দিক থেকে নিচের দিকে আসত। এখন নতুন প্রজন্মের কাছে অনেক বেশি তথ্য থাকে। যার ফলে, দম্ভ ও গোপনীয় বিষয় না জানানোর প্রবণতাকে তারা চ্যালেঞ্জ করছে। লক্ষ্য করলে দেখা যায় শ্রীলংকা, নেপাল বা বাংলাদেশ সব জায়গাতেই জেন-জিরা ক্ষমতার দম্ভের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছে।
সোশ্যাল মিডিয়া, ইনস্টাগ্রাম দিয়েই তারা নিজেদের সংগঠিত করেছে। ভারতেও আমরা সেটিই দেখছি। এরা গভর্ন্যান্সের মৌলিক বিষয়- ‘জবাবদিহি’ ও ‘স্বচ্ছতা’ যেটি দক্ষিণ এশিয়ায় অনুপস্থিত সেটিকে প্রাধান্য দিচ্ছে। তারা চায় যারাই ক্ষমতায় আসুক তাদের মধ্যে এই দুটো বিষয় থাকতে হবে। সেটি যখন পায় না তখনই তারা বিক্ষুব্ধ হচ্ছে। তিনি বলেন, আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। আগের প্রজন্ম শিক্ষাজীবন শেষ করার পর কিছু না কিছু করতে পারত। কিন্তু কিছুদিন আগেও দেখেছি, তৃতীয় শ্রেণির এক কর্মকর্তার চাকরির জন্য ইঞ্জিনিয়াররাও আবেদন করেছেন। ভারতসহ পুরো দক্ষিণ এশিয়াতেই এ অবস্থা। যেহেতু ‘জবলেস গ্রোথ’ হচ্ছে সেহেতু তরুণ প্রজন্মের জন্য সুযোগের ঘাটতি হচ্ছে। তাই জেন-জিরা জানান দিচ্ছে, এই অর্থনীতি, এই ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন মেটাতে পারছে না। কাজেই এটি বদলানো প্রয়োজন।
দক্ষিণ এশিয়ায় জেন-জিদের প্রথম বিপ্লবটি হয় শ্রীলংকায়। সেখানে রাজাপাকসে পরিবারের দীর্ঘ শাসনে মূল্যস্ফীতি, রিজার্ভ তলানিতে চলে যায়। মানুষের স্বাভাবিক জীবন-জীবিকা ব্যাহত হয় চরমভাবে। পরে ২০২২ সালে জেগে ওঠে জেন-জিরা। আন্দোলনের মুখে রাজাপাকসের শাসনামল তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। বাংলাদেশে কোটা সংস্কারের দাবিতে ২০২৪ সালের এপ্রিলে ছাত্ররা মাঠে নামে। ওই বছরের জানুয়ারিতে বিতর্কিত নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে শেখ হাসিনার সরকার চতুর্থবারের মতো ক্ষমতায় আসে। জেন- জিদের দাবি তোয়াক্কা না করে দমন-পীড়নের পথ বেছে নেয় সরকার। একপর্যায়ে গণবিস্ফোরণ ঘটে। প্রায় দেড় হাজার মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়ে সপরিবারে ভারতে পালিয়ে জীবন বাঁচান শেখ হাসিনা।
নেপালে সম্পদের অসম বণ্টন, বৈষম্য আর বেকারত্বের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে তরুণরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘হ্যাশট্যাগ নেপো কিডস’, ‘হ্যাশট্যাগ নেপো বেবিস’ নামে আন্দোলন গড়ে তোলে। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, এক্স আর টিকটকের এই আন্দোলন এক সময় রাজপথে নেমে আসে। গত বছরের ৮ সেপ্টেম্বর কাঠমান্ডুতে হাজার হাজার তরুণ বিক্ষোভ সমাবেশ করেন। নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে শতাধিক নিহত হন। একপর্যায়ে পদত্যাগ করেন প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা অলি। আফ্রিকার দেশ মাদাগাস্কারেও বিদ্যুৎ ও পানি সংকট নিয়ে বিক্ষুব্ধ হয় জেন-জিরা। একপর্যায়ে সরকারবিরোধী আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করে। দুই সপ্তাহের আন্দোলনের মুখে দেশ ছেড়ে পালান এক দশকের বেশি সময় ক্ষমতা আঁকড়ে থাকা দেশটির প্রেসিডেন্ট আন্দ্রি রাজোয়েলিনা।
ভারতে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস দিয়ে শুরু হয়। খুব কম সময়েই তরুণ প্রজন্মের এই ক্ষোভ এখন দিল্লির রাজপথ ছাড়িয়ে মুম্বাই, কর্ণাটক, বিহারে ছড়িয়ে পড়েছে। ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতৃত্বে হওয়া এ আন্দোলন এখন নরেদ্র মোদি সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জেন-জিদের এই আন্দোলনের মূল দাবি ছিল শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ। শেষ পর্যন্ত মোদির পদত্যাগের একদফা দাবিতে তারা যাবে কিনা তা সময়ই বলে দেবে। প্রায় সব রাজনৈতিক দল থেকে শুরু করে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ মাঠে নেমে পড়েছেন।
কথা হয় সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ নজরুলের সঙ্গে। তিনি যুগান্তরকে বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে জেন-জিরা আন্দোলন করছে। কিন্তু একেক দেশে এই আন্দোলনের কারণ ও প্রকৃতি কিন্তু আলাদা। বাংলাদেশে শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের সুযোগই ছিল না। আবার শ্রীলংকায় বিক্ষোভ হয়েছে মূলত অর্থনৈতিক অনাচারের জন্য। নেপালে হয়েছে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, সুশাসন দিতে ব্যর্থ হওয়ার কারণে। ভারতে চলমান জেন-জিদের আন্দোলন গণ-অভ্যুত্থানে এখনো রূপ নেয়নি। সন্দেহ আছে, সেটি আসলে গণ-আন্দোলনে রূপ নেবে কিনা। কারণ, ভারতে প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী এবং শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের সুযোগ আছে। ভারতের ক্ষমতার জায়গাগুলো অনেক বিকেন্দ্রীভূত। তবে জেন-জিদের আন্দোলন একটি সাধারণ বার্তা দিচ্ছে তারা শাসকদের যে প্রচলিত ছলচাতুরী এবং ব্যর্থতা আছে সেখানে আর চুপচাপ বসে থাকবে না। তাদের জন্য একত্রিত হওয়ার এই কাজটি সহজ হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার জন্য। আন্দোলনে দক্ষিণ এশিয়ার তিনটি সরকারের পরিবর্তন হয়েছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও দর্শন বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুল আহসান যুগান্তরকে বলেন, ছাত্র সমাজ বাংলাদেশে যে কোনো আন্দোলন-সংগ্রামে জেগে উঠেছে। তবে জেন-জিদের ক্ষেত্রে একটি পার্থক্য দেখা যায়। ‘কমপ্লিট শাটডাউন’, ‘বাংলা ব্লকেড’ অর্থাৎ ভাষাগত পরিবর্তন দেখা যায়। প্রতিটি নতুন প্রজন্ম আগের প্রজন্মের চেয়ে দেড়গুণ বেশি আইকিউ নিয়ে জন্মায়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে তার চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবোধের অবক্ষয়, অভিভাবকদের ব্যর্থতার কারণে তাদের মেধা অনুযায়ী প্রাপ্তি হচ্ছে না। তারা অত্যন্ত মেধাবী ও সাহসী। কিন্তু নার্সিংটা ঠিকভাবে হচ্ছে না।