Image description
১৩ সিটিতে ভোট

আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচন সামনে রেখে সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী চূড়ান্ত করার কাজ শুরু করেছে বিএনপি। বেশিরভাগ সিটিতে সাবেক মেয়র বা পুরোনো প্রার্থীদের পরিবর্তে বর্তমানে দায়িত্ব পালন করা প্রশাসকদের ওপরই আস্থা রাখতে চায় দলটি। বিএনপির নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানিয়েছে, প্রার্থী বাছাইয়ে স্থানীয় সাংগঠনিক অবস্থান, গ্রহণযোগ্যতা এবং প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পুরোনো তিনজন মেয়র প্রার্থীসহ প্রশাসকদের মেয়র প্রার্থী হিসেবে প্রথম পছন্দ হিসেবে বিবেচনায় রেখেছে হাইকমান্ড। প্রশাসকরাই ‘ক্লিন ইমেজ’ ধরে রাখতে পারলে মেয়র প্রার্থী হিসেবে তারা সমর্থন পাবেন, এটা প্রায় চূড়ান্ত।

বিএনপির একাধিক নীতিনির্ধারকের সঙ্গে আলাপকালে জানা যায়, সিটির মেয়র প্রার্থীদের বিষয়ে প্রাথমিকভাবে নিজেদের অবস্থান অনেকটাই নির্ধারণ করে রেখেছে বিএনপি। যাদের দলীয় সমর্থন পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি, তাদেরকেই এরই মধ্যে প্রশাসকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। দলের সম্ভাব্য প্রার্থীদেরও জনগণের কাছে পরিচিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে সাংগঠনিক ভিত্তি আরও শক্ত করা এবং জনসম্পৃক্ততা বাড়ানোর সুযোগও পাচ্ছেন তারা। এ সময়ে প্রশাসকদের কার্যক্রম, নেতাকর্মীদের সঙ্গে সমন্বয় এবং সাংগঠনিক গ্রহণযোগ্যতা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। দায়িত্ব পালনের সময় কেউ বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়লে বা নেতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি হলে সংশ্লিষ্ট সিটিতে নতুন মুখ বিবেচনায় আসতে পারে। সে ক্ষেত্রে সাবেক মেয়র প্রার্থী কিংবা আলোচনায় থাকা নেতাদের ওপর আস্থা রাখতে পারে হাইকমান্ড।

নতুন প্রার্থীদের গুরুত্ব দেওয়ার তিনটি কারণের কথা বলছেন বিএনপির নীতিনির্ধারকরা। প্রথমত, সিটির মেয়র প্রার্থীদের অনেকে এমপি ও মন্ত্রী হয়েছেন। তাদের ফেরার সুযোগ খুবই ক্ষীণ। দ্বিতীয়ত, ‘এক পরিবার, এক মনোনয়ন’—এই নীতিতে অটল আছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সেজন্য এমপি ও মন্ত্রী হয়েছেন—এমন পরিবারের কাউকে আর মেয়র প্রার্থী করা হবে না। তৃতীয়ত, বয়সের কারণে কেউ কেউ নির্বাচন করতে আগ্রহী নন।

এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সিনিয়র সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন কালবেলাকে বলেন, সিটি করপোরেশনে আমাদের বহু প্রার্থী আছে। প্রার্থী নিয়ে কোনো অসুবিধা হবে না। দলীয় ফোরামে আলোচনার পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তিনি বলেন, প্রশাসকদের কেউ যদি তার পদ থেকে রিজাইন (পদত্যাগ) করে নির্বাচন করতে চান, তাহলে অবশ্যই দল বিবেচনা করবে। এলাকায় তার কাজের মূল্যায়ন, জনপ্রিয়তা, জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতা—সবকিছুই হাইকমান্ড বিবেচনা করবে। এ ছাড়া প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে সৎ ও যোগ্য এবং সাংগঠনিক দক্ষতাকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। যারা দলকে বিজয়ের পথে এগিয়ে নিতে পারবে, তাদেরই অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক সদস্য কালবেলাকে বলেন, প্রশাসকরাই বিএনপির সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী। তারা যাতে সাংগঠনিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে নিজেদের প্রস্তুত করতে পারেন—এমন পরিকল্পনা থেকেই প্রশাসক পদে তাদের বসানো হয়েছে।

বিএনপির দায়িত্বশীল সূত্রগুলো জানিয়েছে, প্রশাসকদের বর্তমান কর্মকাণ্ডকে সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী বাছাইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তাদের সাংগঠনিক দক্ষতা, জনগ্রহণযোগ্যতা এবং মাঠপর্যায়ের সক্রিয়তা যাচাই করা হচ্ছে। এসব মূল্যায়নের ভিত্তিতেই দলীয় ফোরামে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে।

সিটি করপোরেশনের অন্তত ৮ জন প্রশাসকের সঙ্গে কথা হয় কালবেলার। তারা জানান, সবশেষ বৈঠকেও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান তাদের মেয়র নির্বাচনে প্রস্তুতি নেওয়ার কথা বলেছেন। দলের সব বাছাই প্রক্রিয়া অতিক্রম করেই তারা প্রশাসক পদে এসেছেন। বিএনপি চেয়ারম্যান প্রত্যেককে নির্দেশনা দিয়েছেন মানুষের মন জয় করার জন্য কাজ করতে। ঘরে ঘরে গিয়ে মানুষের সমস্যার কথা শুনে তা সমাধানের কথাও বলেছেন।

জানা গেছে, চলতি বছরের অক্টোবর-নভেম্বর থেকে শুরু হতে পারে স্থানীয় সরকার নির্বাচন। এ প্রক্রিয়ায় ধাপে ধাপে সিটি করপোরেশন নির্বাচন দেওয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার। এবারের নির্বাচনে দলীয় প্রতীক থাকছে না। দলীয় প্রতীক না থাকায় আওয়ামী লীগের অনেকেই নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন, বিএনপির ভেতরে এমন আলোচনা আছে।

এ বিষয়ে বিএনপির একাধিক নেতা বলেন, নির্বাচনে বিধিনিষেধ থাকবে কি না, এটা আদালতের বিষয়। ডেমোক্রেসি সিস্টেমে যে কারও নির্বাচন করার অধিকার রয়েছে। বিএনপির প্রার্থীদের গ্রহণযোগ্যতা থাকলে বিজয়ী হবে, না হলে নয়। বিএনপি অতীতের মতোই স্বচ্ছ, সুন্দর ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন দেবে।

দলীয় সূত্রমতে, ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটি করপোরশনে সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী বাছাইয়ে মাঠ পর্যায়ে জরিপ চালাচ্ছে বিএনপি। নির্বাচনের জয়লাভের সম্ভাবনা, সাংগঠনিক যোগ্যতা, জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতা আছে—এমন ব্যক্তিই প্রার্থী দৌড়ে এগিয়ে থাকবেন।

ঢাকা দক্ষিণ সিটির প্রশাসক আব্দুস সালাম কালবেলাকে বলেন, ‘‘দলের সবুজ সংকেত পেয়ে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছি। নগরবাসীর নাগরিক সেবা নিশ্চিতের পাশাপাশি বিএনপির প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ঢাকাকে ‘গ্রিন সিটি, ক্লিন সিটি’ গড়ে তুলতে কাজ করে যাচ্ছি।’’

ঢাকা উত্তর সিটির প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন বলেন, ‘নির্বাচন করার প্রস্তুতি নিচ্ছি। তবে দলীয় সিদ্ধান্ত মেনেই কাজ করব।’ তিনি জানান, শিগগির অঞ্চলভিত্তিক সফর শুরু করে মানুষের সমস্যা সরাসরি শুনবেন এবং সমাধানে কাজ করবেন। পাশাপাশি প্রতিদিন আসা শত শত মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে চেষ্টা চালিয়ে যাবেন।

৮ সিটিতে বদলাচ্ছে পুরোনো মুখ: দলীয় সূত্র জানিয়েছে, গাজীপুর সিটিতে ২০১৮ সালের বিএনপির প্রার্থী হাসান উদ্দিন সরকার বয়সজনিত কারণে নির্বাচন করতে আগ্রহী নন। বর্তমান প্রশাসক মো. শওকত হোসেন সরকার দলীয় সমর্থন দৌড়ে এগিয়ে রয়েছেন। তিনি স্থানীয় প্রভাবশালী সরকার পরিবারের সদস্য হওয়ায় তার একটি শক্ত অবস্থান রয়েছে।

সিলেট সিটি করপোরেশনে টানা এক দশক মেয়রের দায়িত্ব পালন করা আরিফুল হক চৌধুরী বর্তমানে শ্রমমন্ত্রী। ফলে তাকে ফের সিটি নির্বাচনে ফেরানোর সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। এ সিটিতে বর্তমান প্রশাসক ও সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল কাইয়ুম চৌধুরীকে বিবেচনা করা হচ্ছে। অন্যদিকে, কুমিল্লা সিটিতে বিএনপির বহিষ্কৃত সাবেক টানা দুবারের মেয়র মনিরুল ইসলাম সাক্কুর পরিবর্তে বর্তমান প্রশাসক ও মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. ইউসুফ মোল্লা টিপু সমর্থনের দৌড়ে এগিয়ে রয়েছেন।

বরিশাল সিটি করপোরেশনে বিএনপির সাবেক প্রার্থী ও সাবেক মেয়র মজিবুর রহমান সরোয়ার বর্তমানে বরিশাল-৫ আসনের সংসদ সদস্য। ফলে তাকেও এবার সিটি নির্বাচনে না ফেরানোর পক্ষে দল। বরং বর্তমান প্রশাসক ও বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক বিলকিস জাহান শিরীনকে সম্ভাব্য প্রার্থী বিবেচনা করছে হাইকমান্ড।

রাজশাহী সিটি করপোরেশনে ২০১৮ সালে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করেছিলেন সাবেক মেয়র মোহাম্মদ মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল। তবে এবার মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান প্রশাসক মাহফুজুর রহমান হাইকমান্ডের প্রথম পছন্দ।

ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনে ২০১৯ সালের বিএনপির প্রার্থী অধ্যাপক একেএম শফিকুল ইসলামের পরিবর্তে বর্তমান প্রশাসক ও ময়মনসিংহ দক্ষিণ জেলা বিএনপির সদস্য সচিব রোকনুজ্জামান সরকার রোকন এবং নবগঠিত বগুড়া সিটি করপোরেশনের প্রথম নির্বাচনে বর্তমান প্রশাসক ও জেলা বিএনপির সহসভাপতি এম আর ইসলাম স্বাধীনকে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বরিশাল সিটির প্রশাসক বিলকিস জাহান শিরীন কালবেলাকে বলেন, ‘দীর্ঘ ৪৫ বছরের রাজনৈতিক জীবনে দলের প্রতিটি দুঃসময়ে সক্রিয় ছিলাম। দলের প্রতি ত্যাগ, অবদান ও কমিটমেন্টের মূল্যায়ন হিসেবেই দায়িত্ব পেয়েছি। বিএনপি চেয়ারম্যানের নির্দেশনা অনুযায়ী জনগণের প্রত্যাশা পূরণে নগরীতে পরিচ্ছন্নতা অভিযান, বৃক্ষরোপণ, খাল খনন ও পরিবেশ উন্নয়নের বিভিন্ন কর্মসূচি চলমান রয়েছে।’

কুমিল্লা সিটির প্রশাসক ইউসুফ মোল্লা টিপু বলেন, ‘বিএনপি চেয়ারম্যানের আস্থার প্রতিদান দিতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। অতীতে উপেক্ষিত বিভিন্ন খাতে কাজ শুরু করা হয়েছে। কুমিল্লা সিটিকে দুর্নীতিমুক্ত করাই আমার প্রধান লক্ষ্য এবং উন্নয়নকাজের গুণগত মান নিশ্চিত করতে নিজেই নিয়মিত প্রকল্প পরিদর্শন করছি।’

পুরোনো তিন প্রার্থীর ওপর আস্থা হাইকমান্ডের: দলীয়ভাবে অংশ নেওয়া সবশেষ ২০২১ সালের চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচনে প্রার্থী ছিলেন মহানগর বিএনপির সভাপতি ডা. শাহাদাত হোসেন, ২০১৮ সালের খুলনা সিটিতে বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক নজরুল ইসলাম মঞ্জু এবং ২০১৬ সালে নারায়ণগঞ্জ সিটির প্রার্থী অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন। এই তিন প্রার্থীর ওপর আবারও আস্থা রাখতে যাচ্ছে বিএনপি। নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার প্রায় সাড়ে তিন বছর পর আদালতের রায়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে যোগদান করেন শাহাদাত হোসেন। নজরুল ইসলাম মঞ্জু ও সাখাওয়াত হোসেন সংশ্লিষ্ট সিটির প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করছেন।

চট্টগ্রাম সিটি মেয়র শাহাদাত হোসেন কালবেলাকে বলেন, ‘নির্বাচনের জন্য আমি প্রস্তুত। আমার প্লাস পয়েন্ট হচ্ছে, ১৮ মাস ধরে মেয়রের দায়িত্ব পালন করছি।’ তিনি দাবি করেন, চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা ৬০-৭০ শতাংশ কমেছে এবং চলমান খালগুলোর সংস্কার কাজ শেষ হলে পরিস্থিতির আরও উন্নতি হবে। এ ছাড়া তিন লাখ অসহায় পরিবারকে টিসিবি কার্ড দেওয়া হয়েছে, যার মাধ্যমে তারা কমমূল্যে পণ্য পাচ্ছে। ৪১ ওয়ার্ডে খেলার মাঠ নির্মাণের প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে এরই মধ্যে ১১টি মাঠ নির্মাণ করা হয়েছে।

খুলনার প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু কালবেলাকে বলেন, ‘কাকে মনোনয়ন দেবেন, এটা সম্পূর্ণ বিএনপি চেয়ারম্যানের এখতিয়ার। দলের কাছে মেয়র নির্বাচনের জন্য আবেদন করব, মনোনয়ন দিলে করব।’ তিনি বলেন, ‘খুলনা সিটিতে প্রায় ১০ লাখ মানুষের নাগরিক সেবা অব্যাহত রাখতে প্রায় ১৩ ঘণ্টা ধরে কাজ করছি। বিগত সময়ের উপেক্ষিত উন্নয়নমূলক কাজগুলো করছি। অব্যবস্থাপনা দূর করে সুন্দর সিটি করপোরেশন গড়ে তোলার চেষ্টা করছি।’

নারায়ণগঞ্জ সিটির প্রশাসক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘আগামী সিটি নির্বাচন করার মনমানসিকতা নিয়ে আমাদের প্রশাসকের দায়িত্ব দিয়েছে হাইকমান্ড। দায়িত্ব পালনে যদি কোনো ব্যত্যয় না ঘটে, তাহলে অবশ্যই নির্বাচন করব।’