বাড়ির পাশের পুকুর, খাল কিংবা ডোবাই যেন গ্রামবাংলার শিশুদের জন্য নীরব মৃত্যুফাঁদ। দেশে পানিতে ডুবে হওয়া মৃত্যুর ৯০ শতাংশই ঘটে গ্রামাঞ্চলে। দেশে প্রতিদিন পানিতে ডুবে প্রাণ যায় গড়ে ৫০ জন মানুষের; যার মধ্যে ৭৫ শতাংশ বা প্রায় ৪০ জনই শিশু। অথচ বিশেষজ্ঞদের মতে, ছয় বছর বয়স থেকে শিশুদের সাঁতার শেখানো গেলে পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঝুঁকি কমানো সম্ভব ৯৩ দশমিক ৩ শতাংশ পর্যন্ত।
আজ ২৫ জুলাই ‘বিশ্ব পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধ দিবস’ উপলক্ষে সংশ্লিষ্ট গবেষণা, বিশেষজ্ঞ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর তথ্য বিশ্লেষণে উঠে এসেছে এই চিত্র।
‘বাংলাদেশ হেলথ অ্যান্ড ইনজুরি সার্ভে’-এর সবশেষ জাতীয় জরিপ অনুযায়ী, দেশে বছরে ১৪ হাজারের বেশি শিশুর মৃত্যু হয় পানিতে ডুবে। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মৃত্যুর দ্বিতীয় প্রধান কারণ এখন পানিতে ডুবে যাওয়া।
এই বাস্তবতারই নির্মম উদাহরণ মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলার দুই চাচাতো বোন— দুই বছরের রাইসা ও সাড়ে তিন বছরের রাফিয়া। গত ২১ জুলাই বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বাড়ির আঙিনায় খেলতে খেলতে পাশের পুকুরে পড়ে যায় তারা। উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার আগেই মৃত্যু হয় দুই শিশুর।
বাংলাদেশে পানিতে ডোবা প্রতিরোধে জাতীয় কর্মকৌশল প্রণয়নে কাজ করছে ন্যাশনাল অ্যালায়েন্স ফর ড্রাউনিং প্রিভেনশন (এনএডিপি)। সংগঠনটির আহ্বায়ক সদরুল হাসান মজুমদারের মতে, প্রকল্পভিত্তিক উদ্যোগে সম্ভব নয় এ সংকট মোকাবিলা। এটিকে রূপ দিতে হবে সামাজিক আন্দোলনে। অভিভাবকদের সচেতনতার পাশাপাশি ছয় বছর বয়স হলেই সাঁতার শেখাতে হবে প্রতিটি শিশুকে।
সাঁতার জানলে একজন মানুষের পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঝুঁকি ৯৩ দশমিক ৩ শতাংশ কমে যায় উল্লেখ করে তিনি জানালেন, জাতীয়ভাবে সাঁতার শিক্ষার বিস্তার ঘটানো গেলে সামগ্রিক মৃত্যুহার কমানো সম্ভব প্রায় ৮০ শতাংশ পর্যন্ত।
গ্রামাঞ্চলেই ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি
সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ, বাংলাদেশের (সিআইপিআরবি) জরিপ বলছে, পানিতে ডুবে মারা যাওয়া ব্যক্তির ৯০ শতাংশই গ্রামীণ এলাকার বাসিন্দা। গ্রামে বসবাসকারীদের ডুবে মৃত্যুর ঝুঁকি শহরের মানুষের তুলনায় ৮.৫৮ গুণ বেশি।
একই গবেষণায় দেখা গেছে, ৯৫ শতাংশ মৃত্যু ঘটে প্রাকৃতিক জলাশয়ে এবং ৬৭ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটে বাড়ি থেকে ১০০ মিটারের মধ্যেই। সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটে সকাল ৯টা থেকে দুপুর ২টার মধ্যে, যখন পরিবারের সদস্যরা ব্যস্ত থাকেন গৃহস্থালির কাজে এবং ঘাটতি থাকে শিশুদের তদারকিতে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্রামাঞ্চলের প্রায় প্রতিটি বাড়ির পাশেই পুকুর, খাল বা ডোবা থাকায় শিশুদের জন্য ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।
বরিশালে জাতীয় গড়ের তিন গুণ মৃত্যু
‘বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের জনগোষ্ঠীর পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঝুঁকি: ক্রস-সেকশনাল পরিবারভিত্তিক জরিপ’ শীর্ষক গবেষণায় দেখা গেছে, বরিশাল বিভাগে পানিতে ডুবে মৃত্যুর হার প্রতি এক লাখে ৩৭ দশমিক ৯ জন, যেখানে জাতীয় হার প্রতি এক লাখে ১১ দশমিক ৭ জন। অর্থাৎ বরিশালে এ হার জাতীয় গড়ের তিন গুণেরও বেশি। এক থেকে চার বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে মৃত্যুহার সবচেয়ে বেশি— প্রতি এক লাখে ২৬২ দশমিক ২ জন।
এর সাম্প্রতিক উদাহরণ বরিশালের গৌরনদী। গত ঈদের ছুটিতে বেড়াতে এসে খেলতে খেলতে বাড়ির পাশের পুকুরে ডুবে মারা যায় তিন বছরের রমজান হাওলাদার ও মোহাম্মদ মৃধা। তারা সম্পর্কে মামাতো-ফুফাতো ভাই ছিল।
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, চার বা তার বেশি সন্তানের পরিবারে বসবাসকারীদের পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। অধিকাংশ দুর্ঘটনাই ঘটে বাড়ির পাশের পুকুর, খাল বা ডোবায়। পাশাপাশি নৌযানের নিরাপত্তাহীনতা, অতিরিক্ত যাত্রী বহন, উদ্ধারসেবার সীমাবদ্ধতা এবং জরুরি চিকিৎসা পেতে দেরির কারণও বাড়ায় মৃত্যুঝুঁকি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও ইউনিসেফ বলছে, পানিতে ডুবে অধিকাংশ মৃত্যুই প্রতিরোধযোগ্য। এজন্য নিশ্চিত করতে হবে জাতীয় পর্যায়ে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা, গ্রামীণ এলাকায় শিশুদের নিরাপদ তত্ত্বাবধান, সাঁতার শিক্ষার বিস্তার এবং জলাশয়ের চারপাশে নিরাপত্তাব্যবস্থা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তুলনামূলক কম খরচে বাস্তবায়নযোগ্য উদ্যোগ— শিশুদের সাঁতার শেখানো, বাড়ির পাশের জলাশয়ে সুরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং অভিভাবকদের সচেতনতাই রক্ষা করতে পারে হাজারো শিশুর জীবন।
‘আসুন সবাই মিলে পানিতে ডুবে মৃত্যুস্রোত বদলে দিই’— এই প্রতিপাদ্যে এবার পালিত হচ্ছে বিশ্ব পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধ দিবস। সারাবিশ্বে পানিতে ডুবে যাওয়াকে মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে এবং পানিতে ডুবে প্রতিটি মৃত্যুই যে প্রতিরোধযোগ্য, তা তুলে ধরতে ২০২১ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ২৫ জুলাইকে ঘোষণা করা হয় ‘বিশ্ব পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধ দিবস’ হিসেবে।