চট্টগ্রাম নগরীর বায়েজিদ-ফৌজদারহাট সংযোগ সড়কের পাশেই পাহাড়ের বুক চিড়ে ভিতরে ঢুকে গেছে একটি সরু পথ। এ পথ ধরেই জঙ্গল সলিমপুরের গহিনে যত এগোনো যায়, ততই যেন উন্মোচিত হতে থাকে এক অচেনা, ভূতুড়ে রাজ্যের দৃশ্যপট। চারদিকে পাহাড় কাটার দগদগে ক্ষত, আর সারি সারি টিনের চালার নিচে চাপা পড়ে আছে হাজারো মানুষের বোবা কান্না।
প্রায় চার দশক ধরে ৩ হাজার ১০০ একরের এই দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় বীরদর্পে চলছে সরকারি খাসজমি দখল ও ত্রাসের রাজত্ব। সরকার বদলায়, ক্ষমতার পালাবদল হয়, কিন্তু বদলায় না জঙ্গল সলিমপুরের ভাগ্য। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় তিনটি কাগুজে সমিতির আড়ালে ১১টি সশস্ত্র বাহিনী পাহাড় কেটে প্লট বাণিজ্য করছে। তাদের কাছে জিম্মি হয়ে আছে ৩০ হাজার পরিবার। রাষ্ট্রের ভিতর গড়ে ওঠা আরেক ‘রাষ্ট্রের’ রোমহর্ষক চিত্রই উঠে এসেছে বাংলাদেশ প্রতিদিনের সরেজমিন অনুসন্ধানে। রবিবার চট্টগ্রামের অপরাধ সাম্রাজ্য খ্যাত জঙ্গল সলিমপুর পরিদর্শন শেষে সন্ত্রাসীদের আস্তানা নির্মূল করার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, ‘জঙ্গল সলিমপুর আর কোনো বিচ্ছিন্ন সন্ত্রাসীদের এলাকা থাকবে না। থাকবে না কোনো অভয়ারণ্য। রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে যারা চ্যালেঞ্জ করার দুঃসাহস দেখিয়েছে, তাদের আশ্রয়স্থল কোথায় আমরা দেখতে চাই না। জঙ্গল সলিমপুর থেকে সর্বশেষ আস্তানাও আমরা নির্মূল করব।’
জঙ্গল সলিমপুরে গিয়ে দেখা যায়, চট্টগ্রাম নগরীর বায়েজিদ- ফৌজদারহাট সংযোগ সড়ক দিয়ে এগোলেই এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন। এর ঠিক বিপরীত দিকে একটি সড়ক প্রবেশ করেছে পাহাড়ের দিকে। প্রবেশ মুখেই পড়ে পাহাড়ের বুক চিড়ে তৈরি হওয়া জঙ্গল সলিমপুরের সরু পথ। সেই পথ ধরে যেতে যেতে দেখা মেলে এক্সকাভেটর দিয়ে পাহাড় কাটার ক্ষতচিহ্ন। সময়ের আবর্তনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান কিংবা অভ্যন্তরীণ কোন্দলে হয়তো গডফাদারদের পতন হয়েছে, বদল হয়েছে মুখের। কিন্তু জঙ্গল সলিমপুরের ভাগ্য বদলায়নি। পাহাড় কেটে প্লট বাণিজ্যের এ সোনার ডিম পাড়া হাঁসটি কখনোই হাতছাড়া করতে চায় না কোনো সন্ত্রাসী বাহিনী।
জানা গেছে, নব্বইয়ের দশকের শেষভাগ ও ২০০০ সালের শুরুর দিকে জঙ্গল সলিমপুরে প্রথম দখলদারিত্বের গোড়াপত্তন হয়। ভূমিহীন ও ছিন্নমূল মানুষকে পুনর্বাসনের ধুয়া তুলে ‘চট্টগ্রাম মহানগর ছিন্নমূল বস্তিবাসী সমন্বয় সংগ্রাম পরিষদ’-এর ব্যানারে শুরু হয় পাহাড় দখল। শুরুতে এটি একটি নিরীহ আন্দোলন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেও খুব দ্রুতই তা এক সুসংগঠিত ভূমি দখলকারী সিন্ডিকেটে রূপ নেয়।
স্থানীয় সূত্রগুলো বলেছে, জঙ্গল সলিমপুর বর্তমানে তিনটি প্রধান সন্ত্রাসী বাহিনীসহ ১১টি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। মূলত তিনটি কাগুজে সংগঠনের আড়ালে পুরো এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে মূল সন্ত্রাসী বাহিনীগুলো। সংগঠনগুলোর মধ্যে রয়েছে- আলীনগর বহুমুখী সমবায় সমিতি, চট্টগ্রাম মহানগর ছিন্নমূল (সমন্বয়) সংগ্রাম পরিষদ এবং চট্টগ্রাম মহানগর ছিন্নমূল বস্তিবাসী সমাজকল্যাণ সমিতি। এর মধ্যে আলীনগর এলাকা নিয়ন্ত্রণ করেন শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াসিন মিয়া। তিনি ‘আলীনগর বহুমুখী সমবায় সমিতি’র আড়ালেই চালাচ্ছেন কার্যক্রম। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পট পরিবর্তনের পর তিনি রীতিমতো মহিরুহে পরিণত হন। অভিযোগ রয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের এক প্রভাবশালী ব্যক্তির ছত্রছায়ায় তিনি জঙ্গল সলিমপুরের অঘোষিত সম্রাটে পরিণত হন, যার দাপট বর্তমান বিএনপি সরকারের আমলেও অব্যাহত রয়েছে। অথচ বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের আশীর্বাদপুষ্ট ছিলেন এই ইয়াসিন। ‘চট্টগ্রাম মহানগর ছিন্নমূল (সমন্বয়) সংগ্রাম পরিষদ’ মাধ্যমে ‘ছিন্নমূল’ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করেন শীর্ষ সন্ত্রাসী কাজী মশিউর রহমান ও তার অনুসারী রিদুয়ান।
এ সন্ত্রাসী বাহিনীকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে প্রভাবশালী দুই নেতার বিরুদ্ধে। আগে তাদের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন আওয়ামী লীগের দুই সাবেক এমপি দিদারুল আলম এবং এস এম আল মামুন। এ ছাড়া ‘চট্টগ্রাম মহানগর ছিন্নমূল বস্তিবাসী সমাজকল্যাণ সমিতি’র নিয়ন্ত্রক রোকন উদ্দিন মেম্বার, যাকে আড়ালে থেকে আশ্রয় দিচ্ছেন বিএনপির আরেক প্রভাবশালী নেতা। এ তিন শীর্ষ সন্ত্রাসী বাহিনী ছাড়াও পাহাড়ের গহিনে সক্রিয় রয়েছে- লাল বাদশা বাহিনী, ফারুক বাহিনী, গফুর মেম্বার বাহিনী, গাজী সাদেক বাহিনীসহ ৮টি সশস্ত্র গ্রুপ। নেপথ্যে আরও কয়েকজন প্রভাবশালী নেতার বিরুদ্ধে এসব বাহিনীকে মদত দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। এ নিয়ে কথা হয় জঙ্গল সলিমপুরের অন্তত সাতজন অধিবাসীর সঙ্গে। তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন- জঙ্গল সলিমপুরের এ চক্র ভাঙতে না পারার মূল কারণ হলো এর পেছনে থাকা বিশাল অর্থনৈতিক স্বার্থ। প্রতি মাসে কোটি কোটি টাকার চাঁদাবাজি এবং শতকোটি টাকার ভূমি দখলের এ বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাজনৈতিক নেতা, প্রশাসনের কতিপয় সদস্যসহ অনেকেই। মাঠপর্যায়ের সন্ত্রাসীরা ধরা পড়লেও নেপথ্যের ইন্ধনদাতা বা হোতারা সব সময়ই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। এসব সন্ত্রাসী বাহিনীকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহায়তা করেন প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক নেতা। বিনিময়ে তারা প্রতি মাসে নেন মোটা অঙ্কের মাসোহারা।
খাসজমিতে অবৈধ বাণিজ্য : জঙ্গল সলিমপুরের সরকারি খাসজমি ও বনভূমি দখল করে শত শত কোটি টাকার অবৈধ বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে ভূমি দখলকারী সিন্ডিকেট। প্রকাশ্য দিবালোকে এক্সকাভেটর দিয়ে পাহাড় কেটে সমতল করে ২ থেকে ৫ শতকের প্লট তৈরি করা হচ্ছে। এসব প্লট আকারভেদে ২ লাখ থেকে ২০ লাখ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। প্রধানত নিম্ন আয়ের মানুষ, পোশাক শ্রমিক এবং বিভিন্ন মামলার পলাতক আসামিরা সস্তায় নিরাপদ আশ্রয়ের আশায় এসব প্লট কিনছেন। তবে ক্রেতাদের কাছে বিক্রির সময় কোনো বৈধ দলিল দেওয়া হয় না; কেবল ৩০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে ভুয়া ‘পজেশন’ হস্তান্তরের চুক্তিপত্র ধরিয়ে দেওয়া হয়। এই বিশাল অবৈধ কর্মযজ্ঞের নেপথ্যে রয়েছে তিনটি কথিত সমিতি আলীনগর বহুমুখী সমবায় সমিতি, চট্টগ্রাম মহানগর ছিন্নমূল সংগ্রাম পরিষদ এবং চট্টগ্রাম মহানগর ছিন্নমূল বস্তিবাসী সমাজকল্যাণ সমিতি। এই ভূমি বাণিজ্য নির্বিঘ্ন করতে পুরো জঙ্গল সলিমপুরকে ১১টি ব্লকে ভাগ করে ১৫-২২ সদস্যের উপ-গ্রুপের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। এরই মধ্যে ৩ হাজার ১০০ একরের ওপর ২৫ থেকে ৩০ হাজারেরও বেশি অবৈধ বসতি গড়ে উঠেছে। প্লট বেচাকেনায় উভয় পক্ষকেই সমিতিকে ৫০ হাজার থেকে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দিতে হয়।
অবৈধ বিদ্যুৎ-পানি সিন্ডিকেট : জঙ্গল সলিমপুরে বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাস সিলিন্ডার সরবরাহকে কেন্দ্র করে এক বিশাল ‘সেবা খাত’ সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছে স্থানীয় সন্ত্রাসী বাহিনীগুলো। সমিতির আড়ালে পরিচালিত এই সিন্ডিকেট সরকারি কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে প্রায় ৩০ হাজার পরিবারকে জিম্মি করে রেখেছে। প্রতি মাসে শুধু এই তিন খাত থেকে তারা ৮ থেকে ১০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। এই এলাকায় মাত্র ২২ মিটারের অধীনে অবৈধভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। একটি নতুন বিদ্যুৎ সংযোগ নিতে গ্রাহককে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা দিতে হয় এবং প্রতি ইউনিটের বিল আদায় করা হয় ১৮ থেকে ২০ টাকা। একইভাবে পানির নতুন সংযোগের জন্য ৫ থেকে ৮ হাজার টাকা আদায় করা হয়। মাসিক পানির বিল হিসেবে পরিবারপ্রতি ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে ১২০০ থেকে ২০০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়। এ ছাড়া বাসিন্দাদের বাধ্য হয়ে সিন্ডিকেটের কাছ থেকে ১৮০০ থেকে ৩২০০ টাকা দিয়ে গ্যাস সিলিন্ডার কিনতে হয়। বাইরের কোনো দোকান থেকে গ্যাস কেনার সুযোগ তাদের নেই।