বিপর্যস্ত অর্থনৈতিক অবস্থা থেকে উত্তরণ, বৈশ্বিক চাপ মোকাবিলা, দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি সংকট, বিনিয়োগে স্থবিরতা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ভারসাম্য আনয়ন, সংস্কার কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়া এবং দুর্বল আর্থিক খাতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার উচ্চাভিলাষী বাজেট পরিকল্পনা করেছে সরকার। যেখানে শুধু উচ্চাভিলাষী ব্যয়ই নয় একইভাবে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার বিশাল রাজস্ব আয়ের পরিকল্পনাও করা হয়েছে। তারপরও বাজেটে রেকর্ড পরিমাণ ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি থাকছে। এই ঘাটতি অর্থায়নে সরকারকে বরাবরের মতো বৈদেশিক ঋণ ও অভ্যন্তরীণ খাতের ওপর নির্ভর করতে হবে।
যেখানে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটের আকার ধরা হয় ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি, সে হিসাবে এবার বাজেটের আকার বাড়ানো হচ্ছে ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা। শতকরা হিসাবে চলতি বাজেটের তুলনায় ১৮.৭৩ শতাংশ বেশি, যা ইতিহাসের রেকর্ড বৃদ্ধি। অবশ্য সংকট মোকাবিলায় পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের আগে অন্তর্বর্তী সরকার আগের বছরের (২০২৪-২৫) তুলনায় ১০ হাজার কোটি টাকা কমিয়ে বাজেট ঘোষণা করেছিল, যা এখনো ধীরগতিতে বাস্তবায়নাধীন। আগামী বছরের বাজেটের প্রস্তুত করা সারসংক্ষেপের তথ্য বিশ্লেষণ করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। যা নিয়ে এরই মধ্যে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সিরিজ বৈঠক করেছেন। তাঁর নির্দেশনা অনুযায়ীই বাজেটের এই সারসংক্ষেপ চূড়ান্ত করেছে অর্থবিভাগ।
সরকারের প্রস্তুত করা সর্বশেষ বাজেটের খসড়ায় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, উচ্চতর প্রবৃদ্ধি অর্জন, নির্বাচনি ইশতেহারের বাস্তবায়ন, সামাজিক সুরক্ষাজালের সম্প্রসারণ, কল্যাণকর অর্থনীতির ভিত্তি স্থাপনে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড কর্মসূচির বাস্তবায়ন এবং ব্যাপকভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃষ্টিসহ ১৩টি ইস্যু সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের জন্য চিহ্নিত করা হয়েছে। এর সঙ্গে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কর্মসূচির বাস্তবায়ন শুরু করেছে সরকার, যা বিএনপির নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির অংশ। এ খাতের অধীনে মোট ১ লাখ ৩৮ হাজার ৩৩৯ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করবেন অর্থমন্ত্রী। যা আগের বছরের তুলনায় অন্তত ১২ হাজার কোটি টাকা বেশি। এ ছাড়া এ খাতের আওতার সঙ্গে বাড়ানো হবে উপকারভোগীর সংখ্যাও। নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সংস্কার কার্যক্রম চলমান থাকবে বছরজুড়ে।
অর্থবিভাগ ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ২০ বছর পর দেশ পরিচালনার দায়িত্বে আসা অভিষিক্ত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান তাঁর এই প্রথম বাজেটটাকে দেশের অর্থনীতির জন্য নতুন এক মাইলফলক হিসেবে দেখতে চান। এ জন্য ঈদের ছুটিতেই তিনি এ নিয়ে অবিরতভাবে কাজ করছেন। অবশ্য অর্থমন্ত্রী হিসেবে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীরও এটি প্রথম বাজেট, যা আগামী ১১ জুন জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করা হবে। এখন অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতার খুঁটিনাটি বিষয়গুলো কাটাছেঁড়া করা হচ্ছে। এতসব চ্যালেঞ্জ ও সংকট সত্ত্বেও সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দেওয়ার একটা জোর চেষ্টা থাকবে এবারের বাজেটে। এ জন্য নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হবে বিশেষ কৌশল। বাজেটে বাড়বে সামাজিক সুরক্ষার আওতা, বাড়ানো হবে করমুক্ত আয়সীমা। ব্যবসা-বাণিজ্য সহজ করতে সরকারি বিভিন্ন দপ্তর ও বিভাগে করা হবে বিনিয়ন্ত্রণ। কমানো হবে করপোরেট কর। বাড়ানো হবে করের আওতা। নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতে দেওয়া হবে এককালীন আর্থিক সহায়তা। বিনিয়োগ বাড়াতে আবারও কালোটাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হ”েচ্ছ। বিশেষ করে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনতে এ উদ্যোগ অনেক বেশি কার্যকর হবে বলে মনে করে সরকার।
প্রবৃদ্ধি ৬.৫, মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশ : ২০২৬-২৭ বাজেটের খসড়া নথির তথ্যানুযায়ী, আসন্ন বাজেটে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। এর আগে অন্তর্বর্তী সরকার চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৫.৫ শতাংশ নির্ধারণ করেছিল। অবশ্য বিশ্বব্যাংক বলছে, এ বছর বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৫ শতাংশের কম। এমনকি বৈশ্বিক অচলাবস্থা এবং ইরান-ইসরায়েল ও আমেরিকার চলমান সংঘাতের ফলে আগামী বছরও বিশ্ব অর্থনীতিতে ধীর গতিতে চলমান থাকবে। তবুও বাংলাদেশের নতুন এই নির্বাচিত সরকার উচ্চতর প্রবৃদ্ধি অর্জনের এক উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বর্তমান বাজার পরিস্থিতি ও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যে এই লক্ষ্য অর্জন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। কেননা টানা কয়েক বছর ধরে দেশের মূল্যস্ফীতি প্রায় দুই অঙ্কের কাছাকাছি বিরাজ করছে। যেখানে ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের কারণে দেশের বাজারে রেকর্ড পরিমাণ জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রক্রিয়াও চলমান।
ধাপে ধাপে বাড়ানো হবে তেল-গ্যাস-বিদ্যুতের দাম : এদিকে বাজেটের খসড়াতেও উল্লেখ করা হয়েছে আগামী বছর তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম ধাপে ধাপে সমন্বয় করা হবে। অবশ্য এটাকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের কঠিন শর্তের প্রতিফলনও বলা যেতে পারে। কেননা চলমান ৪.৭ বিলিয়ন ডলার ঋণ কর্মসূচির বাইরে আরও তিন বিলিয়ন ডলার নতুন ঋণ কর্মসূচির আলোচনা শুরু করেছে নতুন সরকার। যদিও বাজেটে সব বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত থেকে ভর্তুকি পুরোপুরি তুলে দেওয়ার চাপ দিয়ে আসছে সরকার। কিন্তু আগামী বাজেটেও এখাতের জন্য ৩৭ হাজার কোটি টাকাসহ ভর্তুকি, প্রণোদনা ও নগদ সহায়তার জন্য ১ লাখ ১৭ হাজার ১২৫ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করতে যাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী।
বাজেটের আয়-ব্যয় : আগামী ২০২৬-২৭ বাজেটের মোট আকার ধরা হচ্ছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা, যা এক বছরের জন্য সরকারের মোট ব্যয় হিসেবে ধরা হয়। যেখানে সরকারের পরিচালন ও অন্যান্য ব্যয় ধরা হচ্ছে ৬ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এর বাইরে উন্নয়ন ব্যয় হিসেবে দেখানো হচ্ছে ৩ লাখ কোটি টাকা, যা বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) হিসেবে এরই মধ্যে অনুমোদন করা হয়েছে।
আসছে বাজেটে সরকারের প্রধান আয়ের ক্ষেত্র বরাবরের মতো এনবিআর। তবে এ বছর এনবিআরের করের আওতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা করা হয়েছে ব্যাপকভিত্তিক। রাজস্ব খাত থেকে মোট ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে এনবিআর থেকে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা, ননএনবিআর ২৫ হাজার কোটি টাকার, এনটিআর খাত থেকে ৬৬ হাজার কোটি টাকা আয়ের লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে। বাজেটের মোট ব্যয়ের বাকি ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা ঘাটতি হিসেবে দেখানো হচ্ছে।
এডিপি ৩ লাখ কোটি টাকা : আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য সরকার ৩ লাখ কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) অনুমোদন করেছে। উন্নয়ন ব্যয়ের অর্থায়নে দেশীয় ও বৈদেশিক উভয় উৎসের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এই ব্যয়ের জন্য সরকারি তহবিল থেকে অর্থায়ন করা হবে ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। বৈদেশিক সহায়তা ও ঋণ ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা। এবারের এডিপিতে মোট প্রকল্প সংখ্যা : প্রায় ১ হাজার ৪০০ এর বেশি। এতে নতুন প্রকল্প রয়েছে ১ হাজার ২৭৭টি। এডিপিতে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাত পরিবহন ও যোগাযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, গৃহায়ন ও কমিউনিটি সুবিধা, কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়ন, সামাজিক সুরক্ষা ও জলবায়ু সহনশীলতা।
বাজেটের ঘাটতি অর্থায়ন : বিপর্যস্ত অর্থনৈতিক অবস্থা ও চলমান বৈশ্বিক সংকটের কারণে চলতি অর্থবছরের গত ১০ মাসে রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১ লাখ কোটি টাকার ওপরে। তারপরও সরকার বিশাল আকারের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, যা উচ্চাভিলাষিতার অংশ। এ জন্য এবারও রেকর্ড পরিমাণ বাজেট ঘাটতি নিয়ে নতুন অর্থবছর শুরু করতে হচ্ছে নির্বাচিত সরকারকে। বাজেটের মোট ব্যয়ের বাকি ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি ঘাটতি হিসেবে দেখানো হচ্ছে। এই ঘাটতি অর্থায়নে সরকারকে ব্যাংক ও ব্যাংক বহির্ভূত খাতের পাশাপাশি বৈদেশিক উৎসের প্রতি নির্ভরশীল থাকতে হবে। এর মধ্যে সরকার বছরজুড়ে ব্যাংক ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা। ব্যাংক বহির্ভূত খাত থেকে নেওয়া হবে ১৫ হাজার কোটি টাকা। আগামী বছরের ঘাটতির বাকি ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করা হবে বৈদেশিক উৎস থেকে। একই সঙ্গে আগামী অর্থবছর বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করা হবে ৪৬ হাজার কোটি টাকা।
উল্লেখ্য, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থ বছরের বাজেটে ব্যাংক ঋণ নেওয়ার টার্গেট ছিল ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। অবশ্য সংশোধিত বাজেটে তা বাড়িয়ে করা ১ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়। বছরের প্রথম ৯ মাসে ব্যাংক ঋণ নেওয়া হয় ১ লাখ ৯ হাজার কোটি টাকা।
অর্থবিভাগ সূত্র জানায়, ঈদুল আজহার ছুটির ঠিক আগ মুহূর্তে সর্বশেষ প্রধানন্ত্রীর কাছে আগামী বাজেটের একটি রূপরেখার খসড়া উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। সেখানে অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমদু তিতুমীর, এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপদেষ্টা, সচিবসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও সরকারের নীতিনির্ধারকরা উপস্থিত ছিলেন। সেখানে দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, সামষ্টিক অর্থনীতির সূচক ও বৈশ্বিক পরিস্থিতি, আগামী বছরের চ্যালেঞ্জ ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় করণীয় নির্ধারণ সম্পর্কে আলোচনা করা হয়। এতে ২০২৬-২৭ বছরের জন্য আটটি চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করা হয়।
আগামী বছরের জন্য চিহ্নিত আট চ্যালেঞ্জ : এই বাজেটের চিহ্নিত আটটি চ্যালেঞ্জ হলো-মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব সংগ্রহের কাক্সিক্ষত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন, চলমান কৃচ্ছ্রসাধন নীতি থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসা, গ্যাস-বিদ্যুৎ ও সারে প্রয়োজনীয় ভর্তুকির চাহিদা মিটিয়ে উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থ সঞ্চালন, প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি বৃদ্ধি করা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি- বিশেষ করে বৈদেশিক অর্থায়নের প্রকল্প গ্রহণের হার কমে আসা, অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক বিনিয়োগ বাড়াতে কাঠামোগত সংস্কার অব্যাহত রাখা ও বিনিয়োগ পরিবেশ আরও ব্যবসাবান্ধব রাখা, এবং ঋণ ধারণ সক্ষমতা বৃদ্ধি ও ঋণের স্থিতিশীলতা রক্ষায় রাজস্ব আদায় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি।
চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় করণীয় : চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় করণীয় দিকগুলোর মধ্যে রয়েছে কর-প্রশাসনের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং অটোমেশন জোরদারকরণ। আয়কর ও মূল্যসংযোজন করের আওতা বৃদ্ধি ও কর অব্যাহতির সংস্কৃতি হতে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসা। এডিপির পূর্ণ বাস্তবায়ন নিশ্চিতকরণে মনিটরিং কার্যক্রম জোরদার করা। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বৈদেশিক অর্থায়নের ব্যবহার বাড়াতে দক্ষতা বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ। সীমিত পর্যায়ে কৃচ্ছ্রসাধন কার্যক্রম অব্যাহত রাখা; তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের ক্ষেত্রে ধাপে ধাপে মূল্য সমন্বয়ের প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখা। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডসহ সামাজিক নিরাপত্তার পরিধি বিস্তৃত করা এবং একই সঙ্গে দ্বৈততা পরিহার এবং জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলার জন্য উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন।
বাজেটের অগ্রাধিকার : বাজেটের অগ্রাধিকার হিসেবে রয়েছে ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি উন্নীতকরণের লক্ষ্যে প্রবৃদ্ধি অর্জন। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। কল্যাণকর অর্থনীতির ভিত্তিস্থাপনে ফ্যামেলি কার্ড, কৃষক কার্ড ইত্যাদির মাধ্যমে সামাজিক নিরাপত্তার খাত সম্প্রসারণ। প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনে সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে উদ্যোক্তা তৈরি ও দেশে বিদেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি।
ভৌত ও সামাজিক অবকাঠামো খাতে ইস্পিত উন্নয়নের লক্ষ্যে সঠিক প্রকল্প নির্বাচনি গবেষণা, উদ্ভাবন এবং বিজ্ঞানভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন শিক্ষার পরিবেশ ও উপকরণ নিশ্চিত করা। জনগণের দোরগোড়ায় উন্নত চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়া; আর্থিক খাত পুনর্গঠনের মাধ্যমে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কৃষি খাতে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলা করে টেকসই উন্নয়ন অভিষ্টসমূহ অর্জন। ডিরেগুলেশন কার্যক্রম গ্রহণ এবং বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নে প্রতিকূলতা দূর করা। এবং সৃজনশীল (চলচিত্র, সংগীত শিল্প, খেলাধুলা, গ্রামীণ সংস্কৃতি) অর্থনীতি খাতের বিকাশে সহায়তা করা।
বাজেটে নতুনত্ব : বাাজেটে তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ‘সৃজনশীল অর্থনীতি’ নামে নতুন ধারণা যুক্ত করার আলোচনা চলছে। তথ্যপ্রযুক্তি, ফ্রিল্যান্সিং, সাংস্কৃতিক শিল্প, উদ্ভাবনভিত্তিক ব্যবসা এবং স্টার্টআপ খাতকে উৎসাহ দিতে বিশেষ প্রণোদনা ও তহবিল গঠনের প্রস্তাব রয়েছে বলে জানা গেছে। এ ছাড়া সরকারি নিয়ন্ত্রণ কমিয়ে বিভিন্ন স্বায়ত্তশাসিত সংস্থাকে আরও কার্যকর করতে ‘ডিরেগুলেশন’ বা বিনিয়ন্ত্রণ নীতির বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। সরকার মনে করে, এতে ব্যবসা সহজীকরণ এবং বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত করার চেষ্টা করা হবে।
ভর্তুকি-প্রণোদনা ও নগদ সহায়তা : ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে বিদ্যুৎ (৩৭ হাজার), গ্যাস (৬.৫ হাজার) ও সার (২৭ হাজার) ভর্তুকি বাবদ অর্থের সংস্থান রাখা হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার ফলে উদ্ভূত বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় বিদ্যুৎ, এলএনজি ও কৃষি ভর্তুকি বাবদ অতিরিক্ত বরাদ্দের প্রয়োজন হবে। বর্তমান সরকারের ফ্যামিলি কার্ড কার্যক্রম সম্প্রসারণের মাধ্যমে ওএমএস, টিসিবি ও খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি ধীরে ধীরে কমিয়ে আনা হবে।
সার্বিকভাবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ভর্তুকি ও প্রণোদনা এবং নগদ ঋণ বাবদ ১,১৭,১২৫ কোটি টাকা (জিডিপির ১.৭১ শতাংশ) বরাদ্দ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মাধ্যমে বেসরকারি খাতের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আওতায় অর্থায়নের সুযোগ সৃষ্টি করা হবে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী, বিশেষত : বিশ্বব্যাংক অর্থায়নে আগ্রহী। এ খাতের সার্বিক উন্নয়নে সরকার ফ্যাসিলিটেটরের ভূমিকা পালন করতে পারে। প্রয়োজনীয় নীতি, কাঠামোগত সংস্থার, ডিজিটাল ও অন্যান্য অবকাঠামোগত উন্নয়ন ইত্যাদি।
সামাজিক সুরক্ষা, ফ্যামিলি কার্ড-কৃষক কার্ড : অধিক সংখ্যক মানুষকে সামাজিক সুরক্ষার ছাতার নিচে আনতে সরকার এর আওতা বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছে। একই সঙ্গে এর অধীনে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কর্মমসূচির বাস্তবায়ন শুরু করেছে। যা বিএনপি নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির অংশ। এ খাতের অধীনে মোট ১ লাখ ৩৮ হাজার ৩৩৯ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করবেন অর্থমন্ত্রী। যা আগের বছরের তুলনায় অন্তত ১২ হাজার কোটি টাকার বেশি। এ ছাড়া এ খাতের আওতার সঙ্গে বাড়ানো হবে উপকারভোগীর সংখ্যাও।
সংশ্লিষ্টদের মতামত : প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, সব শ্রেণির মানুষকে স্বস্তি দেওয়ার জন্য অনেক পদক্ষেপ নেওয়া হবে। নিত্যপণ্যের বাজার সবার ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখার চেষ্টা থাকবে। আমরা আরও আগে থেকেই বলে আসছি বর্তমান পরিস্থিতি চ্যালেঞ্জিং হলেও অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের সুযোগ এখনো রয়েছে।
এজন্য সরকার, বেসরকারি খাত এবং সাধারণ মানুষ সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং বাস্তবভিত্তিক সংস্কারের মাধ্যমে অর্থনীতিকে টেকসই পথে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। যার প্রতিফলন আসছে বাজেটে সাধারণ মানুষ দেখতে পাবেন।
বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, এবারের বাজেটটা বিএনপির জন্য অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং। বিপর্যস্ত আর্থিক খাতে আস্থা ফেরানো বিনিয়োগ সচল করা এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধিকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। একই সঙ্গে সামাজিক নিরাপত্তা খাতকে ঢেলে সাজানো দরকার। তবে সরকার এবার তাদের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের প্রতিই বেশি জোর দেবে বলে তিনি মনে করেন।