Image description

পরকীয়ায় তছনছ হয়ে যাচ্ছে সাজানো সংসার। ঘটছে একের পর এক নৃশংস খুন, বাড়ছে পারিবারিক নির্যাতন। সন্দেহ, প্রতিশোধ আর সামাজিক অপমানের জেরেই এমন নৃশংস ঘটনা ঘটছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরকীয়ার অভিযোগ ঘিরে তৈরি হচ্ছে বেশির ভাগ পারিবারিক কলহ। কখনো স্বামী স্ত্রীকে হত্যা করছে, আবার কোথাও স্ত্রী প্রেমিকের সঙ্গে মিলে স্বামীকে, কখনো পরকীয়া প্রেমিকার দ্বারা নৃশংস খুনের ঘটনা ঘটছে। অনেক ক্ষেত্রে সন্তানদের সামনেই ঘটছে এসব সহিংসতা। অপরাধ ও সমাজ বিজ্ঞানীরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অপব্যবহার, পারিবারিক দূরত্ব এবং মূল্যবোধের অবক্ষয়ের কারণে এসব ঘটনার মাত্রা জটিল করে তুলছে। মোবাইল ফোনে গোপন যোগাযোগ কিংবা অনলাইন সম্পর্ক অনেক সময় বাস্তব জীবনের দাম্পত্য সম্পর্কে ফাটল ধরাচ্ছে। সেই দ্বন্দ্ব থেকেই তৈরি হচ্ছে রাগ, হতাশা ও প্রতিশোধের মানসিকতা।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সৌদি প্রবাসী মোকাররমের সঙ্গে একই গ্রামের বাসিন্দা সৌদি প্রবাসী সুমনের সু-সম্পর্ক ছিল। সেই সুবাদে সুমন সৌদি আরব থাকাকালীন সুমনের স্ত্রী তাসলিমা আক্তার ওরফে হাসনার সঙ্গে মোকাররমের পরিচয় হয়। একপর্যায়ে তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং তারা নিয়মিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অডিও ও ভিডিও কলে কথা বলতেন। মোকাররম প্রবাসে থাকাকালীন তাসলিমাকে বিভিন্ন সময়ে পাঁচ লাখ টাকা দেন। গত ১৩ই মে নিজের পরিবারকে না জানিয়ে মোকাররম সৌদি থেকে ঢাকায় আসেন।

ওদিকে প্রেমিকা তাসলিমাও গ্রাম থেকে ঢাকায় আসেন। উঠেন বান্ধবী হেলেনার মান্ডা এলাকার বাসায়। প্রেমিকার সঙ্গে দেখা করতে মোকাররমও মান্ডার ওই বাসায় যান। ১৩ই মে রাতে মোকাররম ও তাসলিমার মধ্যে মনোমালিন্য হয়। একপর্যায়ে ১৩ বছর বয়সী মেয়ের সঙ্গে মোকাররম অসামাজিক কার্যকলাপের চেষ্টা করার সময় দেখে ফেলেন হেলেনা। এর জেরে তাদের মধ্যে ঝগড়া শুরু হয়। একপর্যায়ে তাসলিমাকে বিভিন্ন সময়ে দেয়া প্রায় পাঁচ লাখ টাকা ফেরত চান মোকাররম। এসময় মোকাররম তার ব্যক্তিগত মোবাইলে থাকা আপত্তিকর ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়ারও হুমকি দেন। এ ঘটনায় হেলেনাকে সঙ্গে নিয়ে মোকাররমকে হত্যার পরিকল্পনা করেন তাসলিমা। পরদিন সকালে নাশতার সময় মোকাররমকে পানির সঙ্গে ঘুমের ওষুধ খাওয়ানো হয়।

মোকাররম ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়লে বালিশচাপা দিয়ে হত্যা করেন হেলেনা। পরে মোকাররমের মরদেহ আট টুকরো করে ভাড়াবাসার ভবনের নিচে ময়লার স্তূপে ফেলে দেন। মোকাররমের মাথার অংশ বাসা থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে ফেলে দিয়ে আসেন।
শুধু মোকাররম নয়, প্রতিনিয়ত এমন নৃশংসতার শিকার হচ্ছে নারী-পুরুষ ও শিশুরা। ফরিদপুর সদর উপজেলায় একটি পুকুর পাড়ে মাটিচাপা দেয়া অবস্থায় এক নারী ও তার তিন বছরের শিশুকন্যা সামিয়ার অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ জানায়, পরকীয়ার জেরেই তিন বছরের সন্তানসহ জাহানারা বেগম (৩০) নামের ওই গৃহবধূকে হত্যার পর মাটিচাপা দেয়া হয়। এই ঘটনায় উজ্জ্বল খান নামে কথিত প্রেমিককে আটক করা হয়।

জাহানারা রাজবাড়ী জেলার গোয়ালন্দ উপজেলার পরেশ উল্লাহ মাতবরের পাড়ার আমজাদ হোসেনের স্ত্রী। গত ৪ঠা মে এ ঘটনা ঘটে। জাহানারা বেগম ও তার শিশু সন্তান নিখোঁজের ঘটনায় স্বামী আমজাদ হোসেন গোয়ালন্দ থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন। নিখোঁজের ১০ দিন পর ১৪ই মে স্থানীয়রা মাটিচাপা অবস্থায় মরদেহের সন্ধান পেয়ে পুলিশকে খবর দিলে পুলিশ লাশ দু’টি উদ্ধার করে।

চলতি বছরের জানুয়ারিতে পরকীয়া প্রেমের জেরে বরিশালের হিজলা উপজেলায় নদীর তীরে এনে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে মুন্সীগঞ্জের হোটেল কর্মচারী আমির হোসেনকে। সে লক্ষ্মীপুরের চরগাছিয়া এলাকার স্বপন হাওলাদারের ছেলে। দুই সন্তানের জনক আমির মুন্সীগঞ্জে একটি হোটেল কর্মচারী ছিলেন। সেখানে স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে থাকতেন। স্বপন হাওলাদার জানান, দীর্ঘদিন ধরে মুন্সীগঞ্জে একটি হোটেলে চাকরি করতেন আমির। স্ত্রীর পরকীয়ার কারণে ছেলেকে জীবন দিতে হয়েছে। ছেলের হত্যার সঙ্গে স্ত্রী খোদেজা বেগমও জড়িত।

যশোরের শার্শায় নিখোঁজের এক মাস পাঁচদিন পর গোয়ালঘরের মাটি খুঁড়ে ইকরামুল কবির (২৫) নামে এক যুবকের অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। পরকীয়া সম্পর্ক, দাম্পত্য কলহ ও টাকার বিরোধকে কেন্দ্র করে সংঘটিত এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে এক দম্পতিকে আটক করা হয়। ৯ই মে রাতে বসতপুর পূর্বপাড়া গ্রামে পুলিশের অভিযানে মরদেহটি উদ্ধার করা হয়। স্থানীয় সূত্র ও পরিবার জানায়, বসতপুর গ্রামের আল-ফুয়াদের স্ত্রী মুন্নী বেগম (২২)-এর সঙ্গে ইকরামুলের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। এ সম্পর্ককে কেন্দ্র করে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে প্রায়ই পারিবারিক অশান্তি লেগে থাকতো। এরই মধ্যে আর্থিক লেনদেন নিয়েও বিরোধ তৈরি হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক মানবজমিনকে বলেন, দাম্পত্য জীবনে সংকট তৈরি হলে অধিকাংশ মানুষ পারিবারিকভাবে সমাধানের চেষ্টা না করে আবেগপ্রবণ সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। কেউ আইনের আশ্রয় না নিয়ে নিজের হাতে প্রতিশোধ তুলতে চাইছেন। ফলে ছোট একটি সম্পর্কের জটিলতা ভয়াবহ অপরাধে রূপ নিচ্ছে। তিনি বলেন, শুধু আইন প্রয়োগ করে এ ধরনের অপরাধ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। পারিবারিক বন্ধন শক্তিশালী করা, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং নৈতিক মূল্যবোধ চর্চার মাধ্যমেই কমতে পারে পরকীয়াকে কেন্দ্র করে বাড়তে থাকা নৃশংসতা। এসব নৃশংসতা ঠেকাতে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র সবারই একসঙ্গে কাজ করতে হবে।