Image description

চলতি অর্থবছর ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সুপ্রিম কোর্টের উন্নয়ন বাজেটে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয় সরকার। এতে অবকাঠামোগত-সংকট, এজলাসস্বল্পতা এবং প্রযুক্তিগত দুর্বল অবস্থা কাটিয়ে বিচার বিভাগকে আধুনিকায়নের একটি বড় সুযোগ হিসেবে দেখছিলেন সংশ্লিষ্টরা। কিন্তু বরাদ্দের সেই অর্থ এখন কার্যত আটকে আছে প্রশাসনিক জটিলতায়। কারণ অর্থ থাকলেও তা খরচ করার ক্ষমতা নেই সুপ্রিম কোর্টের।

প্রকল্প প্রণয়ন, অনুমোদন ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রধান বিচারপতি কিংবা সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের কোনো আর্থিক ক্ষমতা না থাকায় বরাদ্দের এক টাকাও ব্যয় করা সম্ভব হচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে সব ধরনের উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদনের ক্ষেত্রে অনূর্ধ্ব ৫০ কোটি টাকা পর্যন্ত প্রধান বিচারপতিকে ক্ষমতা প্রদান এবং সুপ্রিম কোর্টকে প্রকল্পসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন। এ বিষয়ে গত ১৭ আগস্ট পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে একটি চিঠি পাঠানো হয়েছে। চিঠিতে বিষয়টিকে ‘অতীব জরুরি’ হিসেবে উল্লেখ করা হলেও এক মাসের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, দ্রুত জটিলতা নিরসন না হলে অর্থবছর শেষ হওয়ার আগেই পুরো বরাদ্দ অব্যবহৃত থেকে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। সে ক্ষেত্রে বিচার বিভাগের উন্নয়নের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ ফেরত চলে যেতে পারে সরকারি কোষাগারে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশের বিচার বিভাগ বর্তমানে ভয়াবহ অবকাঠামোগত সংকটে রয়েছে।

বহু জেলা ও দায়রা জজ আদালতের ভবন জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। কোথাও কোথাও পর্যাপ্ত এজলাস না থাকায় একাধিক বিচারককে একই এজলাস ভাগাভাগি করে বিচারকাজ পরিচালনা করতে হচ্ছে। ফলে বিচারকদের কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে এবং মামলার নিষ্পত্তির গতি ব্যাহত হচ্ছে। বিচারিক নথি ও আলামত সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় স্থাপনা না থাকায় গুরুত্বপূর্ণ নথি সংরক্ষণেও জটিলতা তৈরি হচ্ছে। অন্যদিকে ডিজিটাল বিচারব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামোও অত্যন্ত সীমিত। 

এই বাস্তবতায় বিচার বিভাগের সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে পরিকল্পনা কমিশনের অনুকূলে সংরক্ষিত ‘বিশেষ প্রয়োজনে উন্নয়ন সহায়তা’ খাত থেকে সুপ্রিম কোর্টের উন্নয়ন বাজেটে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয় অর্থ বিভাগ। গত ২২ জুলাই এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলকে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দেওয়া হয়। তবে অর্থ বিভাগের ওই চিঠিতে শর্ত দেওয়া হয়, প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ‘সরকারি খাতে উন্নয়ন প্রকল্প প্রণয়ন, প্রক্রিয়াকরণ, অনুমোদন ও সংশোধন নির্দেশিকা-২০২২’ অনুসরণ করতে হবে। আর সেখানেই তৈরি হয়েছে মূল জটিলতা।

২০২২ সালের ওই নির্দেশিকায় জাতীয় সংসদ সচিবালয়, নির্বাচন কমিশন, সরকারি কর্মকমিশন ও দুর্নীতি দমন কমিশনের জন্য পৃথক ব্যবস্থা রাখা হলেও বিচার বিভাগের কোনো উল্লেখ নেই। প্রকল্প যাচাই, মূল্যায়ন, অনুমোদন ও বাস্তবায়নসংক্রান্ত সাতটি গুরুত্বপূর্ণ কমিটির কোথাও সুপ্রিম কোর্ট রেজিস্ট্রির কোনো প্রতিনিধিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ফলে বিচার বিভাগের জন্য কোনো উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করতে গেলেও সুপ্রিম কোর্ট নিজেই তা প্রক্রিয়াজাত বা অনুমোদন করতে পারছেন না।

এ পরিস্থিতিতে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো চিঠিতে সুপ্রিম কোর্ট বলেছেন, বিচার বিভাগের উন্নয়ন প্রকল্প প্রণয়ন, প্রক্রিয়াকরণ, অনুমোদন ও সংশোধনের ক্ষেত্রে প্রধান বিচারপতিকে আর্থিক ক্ষমতা প্রদান করা হয়নি। একই সঙ্গে বিভিন্ন কমিটি গঠনের ক্ষেত্রেও সুপ্রিম কোর্টের প্রশাসনিক কাঠামোর স্বকীয়তা বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। ফলে জনগণের ন্যায়বিচার প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

চিঠিতে অনূর্ধ্ব ৫০ কোটি টাকা পর্যন্ত সব ধরনের প্রকল্প অনুমোদনের ক্ষমতা প্রধান বিচারপতিকে দেওয়ার পাশাপাশি প্রকল্প যাচাই, মূল্যায়ন ও বাস্তবায়নসংশ্লিষ্ট কমিটিগুলোতে সুপ্রিম কোর্টের প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত করে প্রয়োজনীয় পরিপত্র জারির অনুরোধ জানানো হয়েছে। বিচার বিভাগের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে কথা বলতে না চাইলেও তাঁদের মতে, বরাদ্দ পাওয়া অর্থ কাজে লাগাতে না পারলে বিচার বিভাগের আধুনিকায়নের একটি বিরল সুযোগ নষ্ট হবে। আর সেই সঙ্গে আবারও সামনে চলে আসবে পুরোনো প্রশ্ন, রাষ্ট্রের তিন অঙ্গের একটির প্রধানের হাতে উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদনের ক্ষমতা না থাকলে বিচার বিভাগের প্রকৃত স্বাধীনতা কতটুকু?

সাবেক বিচারকদের মতে, বিষয়টি শুধু ১০০ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রশ্ন নয়; এটি বিচার বিভাগের প্রশাসনিক স্বাধীনতা ও সক্ষমতার সঙ্গেও সম্পর্কিত। রাষ্ট্রের অন্যতম সাংবিধানিক অঙ্গ হওয়া সত্ত্বেও বিচার বিভাগ এখনো উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অন্য মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের ওপর নির্ভরশীল। ফলে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়ন বছরের পর বছর পিছিয়ে যাচ্ছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক জেলা ও দায়রা জজ শাহজাহান সাজু বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, বিচার বিভাগের সর্বোচ্চ অভিভাবক প্রধান বিচারপতি।

বিচার বিভাগের অবকাঠামো, প্রশাসন ও বিচার কার্যক্রম-সংক্রান্ত সব ধরনের সমস্যা শেষ পর্যন্ত প্রধান বিচারপতির কাছেই আসে। সে কারণে বিচার বিভাগের উন্নয়ন ও প্রয়োজনীয় প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তার কার্যকর ভূমিকা রাখার সুযোগ থাকা উচিত। তিনি বলেন, সরকার বিচার বিভাগের উন্নয়নের জন্য অর্থ বরাদ্দ দিয়েছে, কিন্তু সেই অর্থ ব্যয়ে যে প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হয়েছে তা দ্রুত নিরসন করা প্রয়োজন। অন্যথায় বিচার বিভাগের উন্নয়ন কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।