Image description

লাঠিতে ভর দিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেন তিনি। শরীরের প্রতিটি পদক্ষেপ যেন বলে দেয়, পথটা তাঁর জন্য সহজ নয়। তবু থেমে থাকেন না রূপা ঘোষ। বাড়ি থেকে প্রায় ১ কিলোমিটার দূরের ছোট্ট দোকানটিতে প্রতিদিন পৌঁছান। দোকান খুললেই শুরু হয় মানুষের অপেক্ষা-কারও জ্বর, কারও পেটব্যথা, কারও শরীর খারাপ। কেউ হাতে টাকা নিয়ে আসেন, কেউ আসেন খালি হাতে। রূপার কাছে দুজনের জন্যই চিকিৎসা সমান। সামর্থ্য অনুযায়ী ওষুধ দেন, পরামর্শ দেন; আর গুরুতর হলে ছুটে যেতে বলেন বড় হাসপাতালে। টাকা না থাকায় কাউকে ফিরিয়ে দেওয়ার অভ্যাস তাঁর নেই।

ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলার ব্রাহ্মণকান্দা বাজারের এই ছোট্ট দোকানটিই রূপার পৃথিবী। মাত্র চার ফুট উচ্চতার এই নারী নিজেই শারীরিক প্রতিবন্ধকতার সঙ্গে লড়ছেন। স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারেন না, লাঠিই তাঁর ভরসা। কিন্তু অন্যের কষ্ট দেখলে সেই লাঠিতে ভর দিয়েই রাতবিরাতে ছুটে যান রোগীর বাড়িতে। ২৬ বছর ধরে এভাবেই মানুষের সেবা করে চলেছেন তিনি। বিনিময়ে কখনো সামান্য কিছু টাকা পেয়েছেন, কখনো কিছুই পাননি। তবু মুখের হাসিটুকু হারায়নি।

এলাকার মানুষের কাছে তাই তিনি শুধু রূপা ঘোষ নন-‘গরিবের ডাক্তার’। দাদা মাখন লাল ঘোষ ও বাবা ভজন কুমার ঘোষের হাত ধরে যে মানবসেবার শুরু, শারীরিক সীমাবদ্ধতা ও সংসারের অভাবের মধ্যেও সেই পথ ছাড়েননি রূপা। পাশে পেয়েছেন ছোট বোন চায়না ঘোষকে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে মাস্টার্স করেও চায়না বেছে নিয়েছেন চাকরির চকচকে পথ নয়, বোনের পাশে দাঁড়িয়ে মানুষের সেবা করার কঠিন জীবন। রূপার নিজের সংসারেও অভাবের ছায়া। 

পরিবারের চারজনই প্রতিবন্ধী, বাবা অসুস্থ। কোনো দিন রোগী দেখে ১০০-২০০ টাকা আয় হয়, কোনো দিন তাও হয় না। তবু রূপার চাওয়া খুব ছোট-‘গ্রামের মানুষগুলোকে সেবা দিতে চাই, জীবনে আর কিছু চাই না।’ শরীর তাঁকে খাটো করেছে, জীবন তাঁকে দিয়েছে সীমাহীন কষ্ট। কিন্তু মানুষের জন্য তাঁর মমতাকে খাটো করতে পারেনি কোনো প্রতিবন্ধকতা। চার ফুট উচ্চতার এই মানুষটির হৃদয় তাই যেন আকাশের চেয়েও বড়।