সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকার বিভিন্নস্থানে ককটেল ও যানবাহনে অগ্নি সংযোগের পেছনে কাজ করছে একটি ‘একটি বিশেষ চক্র’। নাশকতাকারীদের কাছে নির্দেশ আসছে ভারতীয় নম্বর থেকে। প্রতিটি ককটেল-বোমা বিস্ফোরণ কিংবা নাশকতার ভয়াবহতার প্রেক্ষিতে দেয়া হচ্ছে ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা। তবে হামলার পর এসব দৃশ্য হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে পাঠাতে হয় নির্দেশদাতাদের কাছে। রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় গত এক সপ্তাহে হাতবোমা বিস্ফোরণের ঘটনাগুলো তদন্ত করতে গিয়ে এমন তথ্য পায় গোয়েন্দা কর্মকর্তারা।
বিশেষ করে ইতিমধ্যে ঢাকার যাত্রাবাড়ি থেকে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় গ্রেফতারকৃতদের রিমা-ে এনে জিজ্ঞাসাবাদে এসব তথ্য উঠে এসেছে। গোয়েন্দারা গ্রেফতারকৃতদের মোবাইল পরীক্ষা নিরীক্ষা করছেন। নাশকতাকারীদের ডিসেম্বর মাসকে সামনে রেখে দেশে অস্থিরতা কিংবা রাজধানীতে বড় ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনার পরিকল্পনা রয়েছে। যে কারণে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ঢাকার প্রবেশপথগুলোতে কড়া নিরাপত্তার মধ্যে রেখেছে। বাস কিংবা যানবাহন থেকে নামার পরই সন্দেহজনক ব্যক্তিদের সাথে থাকা লাগেজ ও দেহ তল্লাশী করছে। এছাড়া বাড়ানো হয়েছে তল্লাশী চেকপোস্টও। তদন্ত সংশ্লিষ্ট ডিবি কর্মকর্তাদের ভাষ্য, নির্দেশদাতাদের মধ্যে ভারতে অবস্থানরত কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতারাও রয়েছেন। গ্রেফতারদের জিজ্ঞাসাবাদে এমন তথ্য উঠে এসেছে।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেন, “ককটেল বিস্ফোরণে জড়িত বেশ কয়েকজন আমরা গ্রেফতার করেছি। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে এবং তাদের ব্যবহার করা নানা ইলেক্ট্রনিক ডিভাইস ঘেঁটে আমরা দেখেছি, তারা ভারতীয় নম্বর ব্যবহার করে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করছে। সেই সঙ্গে সাইনবোর্ড ও নারায়ণগঞ্জ এলাকায় তারা ককটেল বানাচ্ছে এসব তথ্য গ্রেফতাররাই দিয়েছেন।” যাত্রাবাড়ি থানার সামনে গত ১৮ সেপ্টেম্বর ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় রায়হান উদ্দিন নামে একজনকে গ্রেফতার করে ডিবি।
রায়হান আওয়ামী লীগের ঢাকা দক্ষিণের বংশাল থানার ৩২ নম্বর ওয়ার্ডের ৬ নম্বর ইউনিটের দপ্তর সম্পাদক। গত বছর মতিঝিল থানার একটি সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় গ্রেফতার হয়ে তিনি পাঁচ মাস কারাগারেও ছিলেন। এছাড়া একই ঘটনায় পরে গ্রেফতার রাসেল খান, আলা উদ্দিন ও আব্দুল্লাহ নামে তিনজন ছাত্রলীগের সক্রিয় সদস্য বলে দাবি করেছে ডিবি। গ্রেফতারের সময় তাদের কাছ থেকে চারটি অবিস্ফোরিত ককটেল উদ্ধারেরও তথ্য দিয়েছে তারা। আদালতের মাধ্যমে বিভিন্ন মেয়াদে রিমান্ডে নেয়া হয়েছে।
এছাড়া ১৮ সেপ্টেম্বরই যাত্রাবাড়ির দক্ষিণ দনিয়া এলাকা থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় ১০টি হাতবোমা উদ্ধার করে পুলিশ। দক্ষিণ দনিয়া কাঁচাবাজার এলাকার একটি ছয়তলা ভবনের নিচে গলির মুখে পড়ে থাকা একটি পুরোনো বাজারের ব্যাগ থেকে এসব হাতবোমা উদ্ধার করা হয়। ঠিক পরদিনই ১৯ সেপ্টেম্বর কমলাপুর রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মে হাতবোমা বিস্ফোরণের ঘটনায় ছাত্রলীগের এক নেতাসহ ২ জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। বিস্ফোরণের ঘটনার পর তদন্তে নেমে তথ্য প্রযুক্তির সহায়তায় সেই রাতে তাদের গ্রেফতার করা হয়। এদের মধ্যে রয়েছেন সাখাওয়াত হোসেন রায়হান ও মোহাম্মদ সানমুন। এর মধ্যে রায়হান ছাত্রলীগের শাহজাহানপুর থানা কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক ও রেলওয়ের ইলেকট্রিশিয়ান হিসেবে কর্মরত। সানমুন শাহজাহানপুর থানা যুবলীগের সক্রিয় কর্মী।
তার আগে ১৫ সেপ্টেম্বর সুপ্রিম কোর্টের প্রধান ফটকের সামনে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় ছাত্রলীগের মতিঝিল থানা শাখার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সালমান ইসলাম সাকিব ওরফে আসিফকে গ্রেফতার করা হয়। এ সময় তার কাছ থেকে বিস্ফোরণের ঘটনায় ব্যবহৃত মোটরসাইকেল এবং চারটি ককটেল উদ্ধার করা হয়। গ্রেফতারদের জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের বরাতে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু অর্থ নয়, দলীয় বা সাংগঠনিক পদ পাওয়ার লোভেও অনেকে এসব কাজে যুক্ত হচ্ছেন।
তদন্ত সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় হাতবোমা সরবরাহ ও বিস্ফোরণের জন্য আলাদা আলাদা টিম কাজে লাগানো হচ্ছে। ককটেল তৈরির জন্যও রয়েছে নির্দিষ্ট নেটওয়ার্ক। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড ও মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প এলাকায় হাতবোমা তৈরির তথ্য পেয়েছেন তারা। ককটেল নিক্ষেপকারীদের সমন্বয় করার জন্য দেশে অবস্থানকারী আলাদা একটি গ্রুপ কাজ করে। বাসে আগুন দেয়ার ক্ষেত্রে মাদকাসক্ত ও ভাসমান মানুষদের কাজে লাগানো হচ্ছে।
রায়হানকে জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে তদন্ত সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, তারা মূলত ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাব্বির হোসেনের নির্দেশনায় এসব করছেন। সম্প্রতি যাত্রাবাড়ি, মালিবাগ, আগারগাঁও ও মহাখালীতে বিস্ফোরণ ঘটানো ককটেলগুলো সাইনবোর্ড এলাকার একটি কারখানার মত স্থানে তৈরি বলে তথ্য মিলেছে। আবার গ্রেফতারদের ফোনে যেসব ভারতীয় নম্বর পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলোর তথ্য যাচাই করে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের ‘কয়েকজন শীর্ষ নেতার’ নাম পাওয়ার কথা বলছেন গোয়েন্দারা। ওই নেতাদের কেউ কেউ জুলাই আন্দোলনে আওয়ামী লীগের পতনের পর থেকে ভারতে অবস্থান করছেন।
তদন্ত সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, বোমাবাজি যারা করছে, তারা মোটরসাইকেলকেই সুবিধাজনক বাহন মনে করছে। গ্রেফতারকৃত রায়হান ও তার চারজন সহযোগী মিলে ফ্লাইওভার থেকে যাত্রাবাড়ি থানার সামনে পাঁচটি ককটেল নিক্ষেপ করে কাজলা টোল প্লাজা দিয়ে চলে যান মোটরসাইকেলযোগে। ডিবি কর্মকর্তাদের ভাষ্য, জিজ্ঞাসাবাদে রায়হান দাবি করেছেন, একটি ভারতীয় নম্বর থেকে তার ‘রাজনৈতিক গুরু’ ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাব্বির হোসেন ককটেল নিক্ষেপের নির্দেশ দেন। পুলিশ যাতে শনাক্ত করতে না পারে, সে জন্য নাজিরাবাজারের পরিচিত দোকানদারের মোটরসাইকেল নিয়ে গিয়েছিলেন তিনি।
নাশকতায় জড়িত সন্দেহে গত সোমবার রাত ৩টার দিকে ঢাকার উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টর থেকে রবিউল ইসলাম নামে ওই ভারতীয়কে আটক করে ডিবির রমনা জোনাল টিম। পুলিশের ভাষ্য, রবিউলের ড্রাইভিং লাইসেন্স ও এনআইডির জন্ম তারিখের সঙ্গে পাসপোর্টের জন্ম তারিখের মিল নেই। তিনি এর আগে অনেকবার বাংলাদেশ ভ্রমণ করলেও সুনির্দিষ্ট কারণ তুলে ধরতে পারেননি। তিনি একেক সময় একেক তথ্য দিচ্ছেন। সম্প্রতি ঢাকা শহরসহ সারা দেশে নাশকতায় তার সম্পৃক্ততা থাকতে পারে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। রবিউল ইসলামের বাড়ি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগণার গৌড়িভোজ গ্রামে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ভারতে অবস্থানরত কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন নেতা এই নাশকতার মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে কাজ করছেন। ইতোমধ্যে নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড এবং রাজধানীর মোহাম্মদপুরস্থ জেনেভা ক্যাম্প এলাকায় ককটেল তৈরির গোপন কারখানার সন্ধান পেয়েছে পুলিশ। পুলিশের চোখ এড়িয়ে কীভাবে হাতবোমা তৈরি ও সরবরাহ করা হচ্ছেÑ এমন প্রশ্নে গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেন, আমরা নজরদারি করি বলেই তো তারা গ্রেফতার হচ্ছে।