বেঁচে থাকার জন্য মানবদেহের অন্যতম প্রধান অঙ্গ ফুসফুস। জন্মের পর প্রথম শ্বাস থেকে জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যায় এই অঙ্গ। অথচ ধূমপান, তামাকের ধোঁয়া, নিকোটিনের আসক্তি, বায়ুদূষণ, সংক্রমণ ও নানা জীবনযাপনজনিত কারণে বিশ্বজুড়ে ফুসফুসের স্বাস্থ্য ক্রমেই ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
এ পরিস্থিতিতে আজ পালিত হচ্ছে বিশ্ব ফুসফুস দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য- ‘আজীবন ফুসফুসের সুস্বাস্থ্য’। ফুসফুসের সুস্থতা শুধু রোগ হওয়ার পর চিকিৎসার বিষয় নয় ; জন্ম থেকে শৈশব, কৈশোর, তারুণ্য এবং বার্ধক্য-জীবনের প্রতিটি পর্যায়েই ফুসফুসের যত্ন ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার ওপর এবারের দিবসে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। দেশে মৃত্যুর অন্যতম কারণ শ্বাসতন্ত্রের রোগ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস’ ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন শ্বাসতন্ত্রের রোগকে মৃত্যুর উল্লেখযোগ্য কারণ হিসেবে দেখিয়েছে।
শ্বাসতন্ত্রের রোগের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগ বা সিওপিডি, হাঁপানি, নিউমোনিয়া, ফুসফুসের ক্যানসারসহ বিভিন্ন রোগ রয়েছে। এসব রোগের কিছু প্রতিরোধযোগ্য ঝুঁকির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে তামাক ও ধূমপানের। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৫ সালের প্রতিবেদনের হিসাবে, বাংলাদেশে ২০২১ সালে দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসতন্ত্রের রোগে প্রায় ৬৪ হাজার ৮০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে সিওপিডিতে মারা গেছেন ৫১ হাজারের বেশি এবং হাঁপানিতে প্রায় ৯ হাজার ৮০০ জন। অর্থাৎ শুধু দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসতন্ত্রের রোগেই দেশে বছরে বিপুলসংখ্যক মানুষের মৃত্যু হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিনের কাশি, কফ, শ্বাসকষ্ট, হাঁটাচলায় দ্রুত হাঁপিয়ে যাওয়া, বুকে চাপ অনুভূত হওয়া কিংবা বারবার শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণকে সাধারণ সমস্যা ভেবে অবহেলা করা উচিত নয়। দ্রুত রোগ শনাক্ত করা গেলে অনেক ক্ষেত্রেই রোগের অগ্রগতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। জনস্বাস্থ্য ও প্রিভেনটিভ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘ধুলাবালিকে আমরা গুরুত্ব দিতে চাই না কিন্তু এটি নীরব ঘাতকের ভূমিকা পালন করে।
ধুলাবালি বায়ুদূষণের প্রধান উপাদান। ধুলাবালির সঙ্গে মিশ্রিত হয়ে নানা ভারী ধাতব পদার্থ ও ক্ষতিকর পদার্থ শ্বাসতন্ত্র দিয়ে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। ফলে শ্বাসতন্ত্রীয় রোগ হাঁচি কাশি ক্রনিক কফ, দীর্ঘদিন কাশি, নিউমোনিয়া, যক্ষ্মা ও দীর্ঘমেয়াদে ফুসফুসের ক্যানসারের মতো রোগ হয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘ভারী ধাতু যেমন ফুসফুসের ক্ষতি করে তেমনি ফুসফুস দিয়ে এটি শরীরের রক্তে প্রবেশ করে লিভার, কিডনিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
ধুলার কারণে হার্টেরও রক্ত সরবরাহ বিঘ্নিত হয়।’ বিশ্ব ফুসফুস দিবস উপলক্ষে গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি প্রতিষ্ঠান প্রজ্ঞা (প্রগতির জন্য জ্ঞান)-এর নির্বাহী পরিচালক এ বি এম জুবায়ের বলেন, ‘ফুসফুসের সুরক্ষায় প্রচলিত তামাকপণ্যসহ ই-সিগারেট, ভেপিং এবং অন্যান্য নিকোটিন পণ্যের ব্যবহার ও বিস্তার রোধে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।’ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, তরুণদের মধ্যে নিকোটিনের আসক্তি ঠেকাতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্য বিভাগ এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। শুধু আইন করলেই হবে না, বাজারে নিষিদ্ধ পণ্যের প্রবেশ, অনলাইন বিক্রি ও প্রচারণা বন্ধেও কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন।
৩ কোটি ৭৮ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক তামাক ব্যবহারকারী : দেশে ফুসফুসের স্বাস্থ্যের অন্যতম বড় হুমকি তামাক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ জাতীয় পর্যায়ের গ্লোবাল অ্যাডাল্ট টোব্যাকো সার্ভে (২০১৭) অনুযায়ী, দেশের ৩৫ দশমিক ৩ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক-প্রায় ৩ কোটি ৭৮ লাখ মানুষ-কোনো না কোনো ধরনের তামাক ব্যবহার করেন।
এর মধ্যে ১৮ শতাংশ ধূমপান এবং ২০ দশমিক ৬ শতাংশ ধোঁয়াবিহীন তামাক ব্যবহার করেন। শুধু প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যেই নয়, কিশোরদের মধ্যেও তামাক ব্যবহারের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উদ্ধৃত গ্লোবাল ইয়ুথ টোব্যাকো সার্ভে অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১৩ থেকে ১৫ বছর বয়সি শিক্ষার্থীদের ৬ দশমিক ৯ শতাংশ তামাক ব্যবহার করেছিল।
এ চিত্র তরুণ প্রজন্মের ফুসফুসের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করছে। কারণ কৈশোর ও তরুণ বয়সেই নিকোটিনের আসক্তি তৈরি হলে দীর্ঘমেয়াদে তামাক ব্যবহারের ঝুঁকি বাড়ে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে তামাক ব্যবহারের কারণে প্রতিবছর ৭০ লাখের বেশি মানুষ মারা যায়। এর মধ্যে ১৬ লাখের বেশি মানুষ সরাসরি ধূমপান না করেও পরোক্ষ ধূমপানের সংস্পর্শে এসে মারা যান।