সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খুললেই চোখে পড়ছে বিভিন্ন নামের কিশোর গ্যাংয়ের ভয়ংকর মহড়া। যেখানে শতাধিক কিশোর হাতে রানদা, চাপাতি, সামুরাই, ছুরি চাকু হাতে হেঁটে যাচ্ছে। সামনের সাড়িতে অস্ত্র নিয়ে বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গি করতে করতে এগিয়ে যাচ্ছে কিশোর দল। এসটিকে-৯০৯, আইডিইডি-৯৯৯, টিজিজিএল-১২১১, মাস্টারমাইন্ড মোহাম্মদপুর- এমন অসংখ্য নামের আইডি থেকে ছড়ানো হচ্ছে এসব ভিডিও। যেখানে ক্যাপশন- আমরা যখন আসি আতঙ্ক নিয়ে আসি, কালো মেঘ কেটে গেলে সামলাইতে পারবিতো? টক্কর নিলেই করব হামলা।
কিশোর গ্যাংগুলোর সমাজমাধ্যমে এই জানান দেওয়ার চিত্র এখন প্রতি পাড়া মহল্লার। নগর মহানগর থেকে কিশোর গ্যাংয়ের এ বিস্তার ছড়িয়েছে সর্বত্র। নৌপথেও ট্রলারে দেখা যাচ্ছে কিশোরদের অস্ত্রের মহড়া। যারাই পথের কাঁটা হচ্ছে- তাদের ওপরই হচ্ছে ভয়াবহ হামলা। প্রকাশ্য খুনাখুনি, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, ডাকাতির মতো ঘটনা দিনদিন ভয়ংকর থেকে ভয়ংকরতম হচ্ছে। এদিকে সারা দেশে কিশোর গ্যাং সদস্য বেপরোয়া হয়ে উঠলেও নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। কুমিল্লার কিশোর অপ্রতিম হত্যার পর নতুন করে আলোচনায় এই গ্যাং কালচার ভাঙতে আবারও নড়েচড়ে বসেছে পুলিশ। কুমিল্লায় ব্লক রেইডের মতো সারা দেশেই কিশোর গ্যাং অভিযান জোরদার করার কথা জানিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, পুলিশের তালিকা অনুযায়ী সারা দেশে ৩৮৬ কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য সংখ্যা সোয়া ৪ হাজার। যাদের ৮০ শতাংশের বয়স ১৬-২৫ বছর। ঢাকায় ১৫৮টি গ্যাংয়ে সক্রিয় রয়েছে ১ হাজার ২১৯ জন সদস্য। ঢাকার মধ্যে মোহাম্মদপুরে সর্বোচ্চ ২৭টি ও পল্লবীতে ১৬টি গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। এ ছাড়াও চট্টগ্রাম মহানগরে ৯৮টি, রাজশাহীতে ১৩, সিলেটে ১৫ ও গাজীপুর মহানগরে ১৩টি গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে। একাধিক সূত্র বলছে, রাজধানীসহ সারা দেশে সক্রিয় কিশোর গ্যাংয়ের মধ্যে পুরোনো সদস্যরাও সক্রিয় রয়েছে। পট পরিবর্তনের পরে পাল্টেছে শুধু নিয়ন্ত্রণকারী। অনেক কিশোর গ্যাং আন্ডারওয়ার্ল্ডের শীর্ষ সন্ত্রাসীদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে নৃশংস হত্যাকাণ্ড, আগ্নেয়াস্ত্রের মহড়া, গুলাগুলি, চাঁদা চেয়ে হুমকি ও মাদক বাণিজ্য পরিচালনা নিয়ন্ত্রণ করছে। অনেক সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও আক্রান্ত হচ্ছে এই গ্যাং সদস্যদের হাতে।
ডিএমপির তথ্য বলছে, রাজধানীর মোহাম্মদপুর, মিরপুর, উত্তরা, যাত্রাবাড়ী ও পুরান ঢাকা এলাকার বেশির ভাগ কিশোর গ্যাংয়ের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসীদের হাতে। মোহাম্মদপুরে ল ঠেলা গ্রুপ, ভাইব্বা ল কিং, টক্কর ল গ্রুপ, পাটালী গ্রুপ, লেভেল হাই গ্রুপ, আনোয়ার গ্রুপ, ফরহাদ গ্রুপ, আর্মি আলমগীর ও নবী গ্রুপ, এলেক্স গ্রুপ, আকবর গ্রুপ, গাংচিল গ্রুপ, চেতালেই ভেজাল, সাব্বির গ্রুপ, পিচ্চি হেলাল গ্রুপ, মিরাজ গ্রুপ, সুমন গ্রুপ, ও বেলচা মনির গ্রুপ এখন আতঙ্কের নাম।
তাদের নেপথ্যে শীর্ষ সন্ত্রাসী কিলার বাদল, পিচ্চি হেলালসহ আরও কয়েকজন পৃষ্ঠপোষক রয়েছে বলে পুলিশের কাছে তথ্য রয়েছে। কিন্তু পৃষ্ঠপোষকরা আইনের বাইরে থাকায় কিছুতেই থামছে না মোহাম্মদপুরে গ্যাং দৌরাত্ম্য। ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের ডিসি মো. ইবনে মিজান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, সামাজিক ও পারিবারিক ঘাটতির কারণেই কিশোররা গ্যাং কালচারে জড়িয়ে পড়ছে। মোহাম্মদপুর ও আদাবর হাউজিং এলাকা হওয়ায় চাঁদাবাজির উদ্দেশে গ্যাংয়ের পথে কিশোররা বেশি ঝুঁকছে। তবে অপরাধ করলে আইনের আওতায় আসতেই হবে। প্রতিদিন ৮০-১১০ জনকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।
এদিকে ভইর্যা দে গ্রুপের প্রধান আশিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে মিরপুর এলাকায় একাধিক কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। এই আশিকের পৃষ্ঠপোষক বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী মফিজুর রহমান মামুন বলে জানা গেছে। এ ছাড়া শাহ আলী থানা এলাকায় সক্রিয় কয়েকটি কিশোর গ্যাং সদস্যরা ভারতে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী শাহাদাতের হয়ে কাজ করে। পল্লবীতে রাজু গ্রুপ, রকি গ্রুপ, পিন্টু-কাল্লু গ্রুপ, রোমান্টিক গ্রুপ, মুসা হারুনের ভাই ভাই গ্রুপ, মুরাদ গ্রুপ, আরমান গ্রুপ, জুম্মান গ্রুপ, বাহাদুর গ্রুপ, বাহবালী গ্রুপ, ৬.৯ ইয়াসিন গ্রুপ, সোহেল গ্রুপ, আসাদ কাল্লু গ্রুপ ও দীপ গ্রুপ। উত্তরার দক্ষিণখানে বিগবস, ইয়ংস্টার গ্রুপ, ব্লাড বয়েজ, উত্তরা পূর্ব থানায় সসুজন গ্রুপ, রাজিব গ্রুপ, খোরশেদ গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে। এ ছাড়াও কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে লাল্লু ওরফে কিলার লাল্লু, ইব্রাহিম চৌধুরী ওরফে কিলার ইব্রাহিম, আরিফ ওরফে চাপা আরিফ, মাহী, শাওন ওরফে শুটার শাওন, তাবরেজ ও রবিনের তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছে গোয়েন্দারা।
অপরাধ বিশ্লেষক মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ উমর ফারুক বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে কেউ মূল জায়গা কাজ করছে না। মূল জায়গা বলতে- গ্যাংয়ের পৃষ্ঠপোষকদের কখনো আইনের আওতায় আনতে দেখা যায় না। কারণ তারা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী লোক হয়ে থাকেন। শীর্ষ সন্ত্রাসীরাও এই কিশোরদের দিয়ে অপরাধ করিয়ে থাকছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। ফলে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা দিনদিন বেড়েই চলেছে। এর থেকে পরিত্রাণের একটিই উপায়- পৃষ্ঠপোষকদের আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (গোয়েন্দা) মো. শফিকুল ইসলাম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, রাজধানীতে নিয়মিতই কিশোর গ্যাং বিরোধী অভিযান অব্যাহত রয়েছে। প্রতিদিন শত শত অপরাধী গ্রেপ্তার হচ্ছে। এরপরও কেউ অপরাধে বা গ্যাং কালচারে জড়ালে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না।
সারা দেশেই ভয়ংকর রূপে কিশোররা : শুধু রাজধানী ঢাকা মহানগরী নয় অন্য মহানগর ও জেলাগুলোতেও ভয়ংকর রূপে উত্থান ঘটেছে গ্যাং কালচারের। অনুসন্ধানে জানা গেছে, চট্টগ্রাম নগরী কিংবা জেলার অলিগতিতে গজিয়ে উঠেছে অসংখ্য কিশোর গ্যাং। যাদের সরাসরি মদত দিচ্ছেন স্থানীয় কিছু রাজনৈতিক নেতা এবং এলাকার প্রভাবশালী ‘বড় ভাইরা’। গরির চকবাজার, বাকলিয়া, পতেঙ্গা, হালিশহর, খুলশীসহ নগরী এবং জেলার বিভিন্ন এলাকায় চাঁদাবাজি, জমি দখল, ছিনতাই এবং মাদক কারবারে সরাসরি জড়িত তারা। বরিশাল নগরীর বিভিন্ন এলাকায় অর্ধশতাধিক কিশোর গ্যাং গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে। বগুড়ায় দিনদিন ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য।
শহরের অলিগলি থেকে শুরু করে এখন গ্রামীণ এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়েছে তাদের তৎপরতা। ময়মনসিংহে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। নগর থেকে উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত দলবদ্ধ কিশোরদের ছিনতাই, মারামারি, হামলা ও মাদক-সংশ্লিষ্ট অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঘটনা ঘটছে। নারায়ণগঞ্জ জেলা শহর ও বিভিন্ন উপজেলা শহরে কিশোর গ্যাংয়ের শতাধিক বাহিনী সক্রিয় রয়েছে। মাদকের নেশায় রংপুরেও কিশোর গ্যাং মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। নগরীর বিভিন্ন পাড়া, মহল্লা ও বস্তিতে গড়ে উঠছে ১০টির বেশি কিশোর অপরাধী চক্র। এ ছাড়াও নগরীর লালবাগ, রেলস্টেশন এলাকা, আসরতপুর, মাহিগঞ্জ, জুম্মাপাড়া, হনুমানতলা, মিস্ত্রিপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় শতাধিক চক্র রয়েছে।