প্রয়োজন আছে কি নেই, সেসব বিবেচনায় না নিয়েই বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ১৭ বছরে ইচ্ছাখুশিতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। উদ্যোক্তারা রাজনৈতিক বিবেচনায় এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন পেয়েছেন।
কিন্ডারগার্টেনের আদলে গড়ে ওঠা এসব বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী না পেয়ে বর্তমানে মহাসংকটে পড়েছে। ২০২৪ সালের পর অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডেও পরিবর্তন এসেছে, কিন্তু সংকট থেকে উত্তরণ মিলছে না।
দেশে বর্তমানে অনুমোদিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ১১৭। এর মধ্যে সঠিকভাবে চলছে ২০ থেকে ২৫টি।
আরো ২০টির মতো বিশ্ববিদ্যালয় মোটামুটি চলছে। তবে ৭০টির মতো বিশ্ববিদ্যালয় বড় ধরনের সংকটে পড়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পড়ালেখার মান নিয়েও বড় ধরনের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে অন্তত অর্ধশত বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি, প্রোভিসি বা ট্রেজারারের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদ শূন্য রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) সূত্র জানায়, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ১২ বছরের মধ্যে স্থায়ী ক্যাম্পাসে যাওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে ১১৭টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে পুরোপুরি স্থায়ী ক্যাম্পাসে গেছে মাত্র ৫৩টি। আর এ পর্যন্ত স্থায়ী সনদ পেয়েছে ২২টি বিশ্ববিদ্যালয়। এ ছাড়া আরো কিছু বিশ্ববিদ্যালয় স্থায়ী ক্যাম্পাসে যাওয়ার প্রক্রিয়াধীনে। তবে বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয় স্থায়ী ক্যাম্পাসে যাওয়ার কথা বলেও যেতে পারছে না।
কেউ জমি কিনে ফেলে রেখেছে। আর্থিক সংকটে অনেক বিশ্ববিদ্যালয় স্থায়ী ক্যাম্পাসে যেতে পারছে না।
ইউজিসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে মান দিয়েই টিকে থাকতে হবে। যেখানে শিক্ষার মান ভালো সেখানে স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষার্থীরা ভর্তি হবে। মানহীন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পিছিয়ে পড়বে। এ ছাড়া আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা যেহেতু বেশি, তাই আমরা বিদেশি শিক্ষার্থীদের কিভাবে আকৃষ্ট করা যায় সে পরিকল্পনা করছি। বিশেষ করে মালদ্বীপ, ভুটান, নেপাল ও আফ্রিকার অনেক দেশের শিক্ষার্থীরা বাংলাদেশে পড়তে আসতে আগ্রহী। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও বিদেশি শিক্ষার্থী নিয়ে কাজ করতে পারে।’
জানা গেছে, মহাসংকটে থাকা মানহীন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দিন দিন শিক্ষার্থী কমছে। আয় না থাকায় ভালো শিক্ষকও পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে এক-দুজনের বেশি অধ্যাপক নেই। কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের বেতন ১০ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা। কোনো রকমে একটি ভবনের এক-দুটি ফ্লোর ভাড়া করে চলছে এসব বিশ্ববিদ্যালয়। শিক্ষক নেই, ল্যাবরেটরি নেই, পাঠাগার নেই, ক্লাসও ঠিকমতো হয় না। অনেকটা নামসর্বস্ব বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হয়েছে তারা। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে পড়ালেখা না করলেও নির্দিষ্ট সময় পর শিক্ষার্থীদের ঠিকই সার্টিফিকেট দেওয়া হচ্ছে।
ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় মালিক সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সহসভাপতি আবুল কাসেম হায়দার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গত ১৭ বছর কোনো রকম পরিকল্পনা ছাড়াই অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হয়েছে। বর্তমানে ভালোভাবে একটি বিশ্ববিদ্যালয় করতে চার-পাঁচ শ কোটি টাকা দরকার। কিন্তু এত দিন ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা নিয়েও অনেকে বিশ্ববিদ্যালয় করেছে। অর্থাৎ একটা দোকান খুলে সার্টিফিকেট বিক্রি করছে। এগুলোতে লেখাপড়ার কোনো মান নেই। এখন যে অবস্থা তাতে মনে হয়, অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ই বন্ধ করার সময় এসে গেছে।’
আবুল কাসেম হায়দার সরকারকে পরামর্শ দিয়ে বলেন, ‘২০১০ সালের যে আইনে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় চলছে, তার সংশোধন দরকার। শুধু জমি দেখালেই বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দেওয়া যাবে না। যিনি বিনিয়োগ করবেন তাঁকে লভ্যাংশ নেওয়ার সুযোগ রাখতে হবে। তাহলে এই খাতে বিনিয়োগ হবে। কিছু বিশ্ববিদ্যালয় পুনরুজ্জীবিত হবে। আর যারা মান উন্নত করতে পারবে না তারা ঝরে যাবে।’
সম্প্রতি ইউজিসিসির একাধিক প্রতিবেদনেও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দুরবস্থার চিত্র উঠে এসেছে। চুয়াডাঙ্গার ফার্স্ট ক্যাপিটাল ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশে শিক্ষার ন্যূনতম পরিবেশ দেখতে পায়নি ইউজিসির তদন্ত কমিটি। ইউজিসি বলছে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০১০ অনুযায়ী, ২৫ হাজার বর্গফুট আয়তনের ভবন থাকার কথা। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষা কার্যক্রম এর অর্ধেক জায়গায় পরিচালিত হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ১৪টি প্রোগ্রামের অনুমোদন রয়েছে। সে হিসাবে কমপক্ষে ৭০ জন শিক্ষক থাকার কথা। অথচ আছে ৩৩ জন। যাঁদের মধ্যে ২৪ জন প্রভাষক। অধ্যাপক আছেন একজন, সহযোগী অধ্যাপক আছেন একজন ও সহকারী অধ্যাপক আছেন সাতজন। শিক্ষার্থী সংখ্যাও খুব কম। প্রভাষকদের বেতন দেওয়া হয় মাত্র ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা।
সূত্র মতে, ২০১৬ সাল থেকে এইচএসসি ও সমমানে পাসের হার বাড়তে থাকে। ২০২০ সালে অটোপাস দিয়ে সবাইকে পাস করিয়ে দেওয়া হয়। ২০২১ সালে সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে পরীক্ষা হয়। সে বছর পাসের হার ছিল ৯৫.২৬ শতাংশ, ২০২২ সালে ৮৫.৯৫ শতাংশ এবং ২০২৩ সালে ৭৮.৬৪ শতাংশ। ২০২৪ সালে পাসের হার ছিল ৭৭.৭৮ শতাংশ। তবে ২০২৫ সালে পাসের হার কমে দাঁড়ায় ৫৮.৮৩ শতাংশ। আর ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষা শেষ হলেও এখন ফলের অপেক্ষায় শিক্ষার্থীরা।
ইউজিসি সূত্র জানায়, উচ্চশিক্ষায় মোট আসন সংখ্যা প্রায় ১৩ লাখ। এর মধ্যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি মেডিক্যাল-ডেন্টাল কলেজ ও বিশেষায়িত কিছু উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আসন সংখ্যা ৬০ হাজারের কাছাকাছি। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজে স্নাতকে (সম্মান) চার লাখ ৩৬ হাজার ২৮৫ ও পাস কোর্সে চার লাখ ২১ হাজার ৯৯০, ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত মাদরাসায় ৪৬ হাজার ৫২৯, উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৮৭ হাজার ৫৯৩। এ ছাড়া সরকারি আরো কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ১০ হাজারের বেশি আসন রয়েছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকে (সম্মান) এক সেমিস্টারে এক লাখ ৮৬ হাজার ৮৯৯ (বছরে দুই সেমিস্টার হিসেবে পৌনে চার লাখ) আসন রয়েছে। তিন সেমিস্টার হিসাব করলে আসন আরো বাড়বে। তবে গত বছর এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় পাস করেছেন সাত লাখ ২৬ হাজার ৯৬০ জন শিক্ষার্থী। ফলে সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আসনই পূর্ণ হয় না। ফলে ছোট ও মানহীন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিক্ষার্থী পাচ্ছে না। এ বছর আরো বেশি সংকটে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
তবে বেসরকারি ১০ থেকে ১৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিতে শিক্ষার্থীদের আগ্রহ থাকে। নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়, আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ (এআইইউবি), ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ (আইইউবি), ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি (আইইউবি), ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক, আহছানউল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস (ইউল্যাব), ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনোলজিসহ (আইইউবিএটি) কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা নিয়ে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে যাঁরা সুযোগ পান না, তাঁরা পরের ধাপের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি হন।
সূত্র মতে, রাজধানীর অনেক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ই শিক্ষার্থী সংকটে ভুগছে। এর মধ্যে সেন্ট্রাল ওমেনস ইউনিভার্সিটি, দ্য পিপলস ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অল্টারনেটিভ, প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটি, স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, সিটি ইউনিভার্সিটি, প্রাইম ইউনিভার্সিটি, নর্দান ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, দ্য মিলেনিয়াম ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব সাউথ এশিয়া, ইউনিভার্সিটি অব ইনফরমেশন টেকনোলজি অ্যান্ড সাইন্সেস, মানারত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, প্রাইম এশিয়া ইউনিভার্সিটি, রয়েল ইউনিভার্সিটি অব ঢাকা, বাংলাদেশ ইসলামী ইউনিভার্সিটি, আশা ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, হামদর্দ ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, ফারইস্ট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব স্কলারস, শান্ত মারিয়াম ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজি, কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, আনোয়ার খান মডার্ন ইউনিভার্সিটি, ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড ইউনিভার্সিটি অন্যতম।
রাজধানীর বাইরে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ও প্রচণ্ড শিক্ষার্থী সংকটে রয়েছে। এর মধ্যে পুন্ড্র ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, সাউদার্ন ইউনিভার্সিটি, বরেন্দ্র ইউনিভার্সিটি, ফার্স্ট ক্যাপিটাল ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, ঈশা খাঁ ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, এক্সিম ব্যাংক অ্যাগ্রিকালচার ইউনিভার্সিটি, নর্থ ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটি, খাজা ইউনূস আলী ইউনিভার্সিটি, ফেনী ইউনিভার্সিটি, ব্রিটানিয়া ইউনিভার্সিটি, পোর্ট সিটি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, টাইমস ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, নর্থ বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, কক্সবাজার ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, সিসিএন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, এনপিআই ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, ইউনিভার্সিটি অব গ্লোবাল ভিলেজ, ইউনিভার্সিটি অব ব্রাহ্মণবাড়িয়া, বান্দরবান ইউনিভার্সিটি, আহছানিয়া মিশন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, জেডএনআরএফ ইউনিভার্সিটি অব ম্যানেজমেন্ট সায়েন্সেস অন্যতম।
এ ছাড়া আরো অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে আগে থেকেই তেমন শিক্ষার্থী নেই। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের যে অবস্থা তাতে সামনেও শিক্ষার্থী পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। এসব বিশ্ববিদ্যালয় নামেমাত্র চালু রয়েছে। আবার কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়কে নানা নেতিবাচক কারণে তারকা চিহ্ন দিয়ে আলাদা করেছে ইউজিসি। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ও শিক্ষার্থী পাচ্ছে না। আর কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় এখনো তাদের শিক্ষা কার্যক্রমই শুরু করতে পারেনি।