বৃষ্টি ও বন্যার অজুহাতে আবারও অস্থির নিত্যপণ্যের বাজার। উৎপাদন ও সরবরাহে সাময়িক বিঘ্ন ঘটলেও তার চেয়ে অনেক বেশি হারে দাম বাড়াতে বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন যেন সুযোগসন্ধানী ব্যবসায়ীরা। বাজারে সবজি থেকে শুরু করে কাঁচামরিচ, পেঁয়াজ, ব্রয়লার মুরগি, ডিম, আদা, রসুন, এমনকি চাল, আটা ও আলুর দামও বেড়েছে। এতে সীমিত আয়ের মানুষের ওপর সংসারের ব্যয় নির্বাহের চাপ অত্যধিক বেড়ে গেছে। বাজার খরচ সামলাতে দিশাহারা নিম্ন আয়ের ভোক্তারা। বাজার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাজারে কার্যকর নজরদারির অভাবে এক ধরনের ‘হরিলুট’ চলছে। সরবরাহে বৃষ্টি-বন্যার কিছুটা প্রভাব থাকলেও ব্যবসায়ীরা সে সুযোগে নিত্যপণ্যের দাম ইচ্ছামতো বাড়িয়ে দিয়েছেন।
গতকাল সাপ্তাহিক ছুটির দিনের বাজারের চিত্র বলছে, পেঁপে, মিষ্টিকুমড়া ও কাঁচাকলা ছাড়া বাজারে ৮০ টাকার নিচে কোনো তরিতরকারি পাওয়া যাচ্ছে না। এর মধ্যে অনেক সবজির দাম শতকের ঘর ছাড়িয়েছে। রাজধানীর কারওয়ান বাজারে তুলনামূলক কিছুটা কমে মিললেও বেশিরভাগ কাঁচাবাজারে করলার কেজি ১২০ থেকে ১৪০ টাকা, বেগুন প্রকারভেদে ১২০ থেকে ১৪০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। শতকের ওপর আরও রয়েছে গাজর ১২০ টাকা, টমেটো ১৪০ থেকে ১৫০ টাকা। কাঁকরোল, বরবটি, ধুন্দল, ঝিঙের মতো সবজির দামও এখন শতক ছুঁয়েছে। সপ্তাহ দেড়েক আগে এগুলো ৭০ টাকা কেজিতে বিক্রি হয়। এদিকে মুলার কেজি দোকানভেদে ৮০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। কিছুদিন আগে ৪০ থেকে ৫০ টাকা দরে বিক্রি হওয়া ঢ্যাঁড়শের কেজি এখন ৮০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। ৮০ টাকার ঘরে আরও বিক্রি হচ্ছে কচুর লতি, পটোল, লাউ, জালি কুমড়া। শাকের আঁটিও এখন দামি খাবার হয়ে উঠেছে। পুঁইশাকের আঁটি ৫০ টাকা, সামান্য কলমি শাকের আঁটিও ১৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
কাঁচাবাজারের উত্তাপ আরও বাড়িয়েছে কাঁচামরিচ। দরকারি এ পণ্যটির দাম রাতারাতি লাফিয়ে বাড়ছে। ১৫ থেকে ২০ দিনের ব্যবধানে কেজিতে ১২০ টাকা বেড়েছে। গতকাল শুক্রবারের বাজারে এ মরিচ ২৮০ টাকা কেজি বিক্রি হয়েছে। দুদিন আগেও যা ২৪০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। সপ্তাহ দেড়েক আগে ছিল ১৮০ থেকে ২০০ টাকা। এর আগে ১৬০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে।
মাসের ব্যবধানে কাঁচামরিচের দাম দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে বলে জানান নিউমার্কেট বনলতা কাঁচাবাজারের সবজি বিক্রেতা মো. মনির হোসেন। তিনি বলেন, এক মাস আগে ১২০ টাকা কেজিতে বিক্রি করেছি। তা এখন ২৮০ টাকা হয়েছে। কোথাও কোথাও ৩০০ টাকাও বিক্রি হচ্ছে। আড়তে মরিচের কমতি নেই। কিন্তু বলা হচ্ছে, বৃষ্টি-বন্যায় মরিচ ক্ষেতের ক্ষতি হয়েছে তাতে সরবরাহ কম। তাই দাম বেড়েছে। একই কারণ দেখিয়ে আড়তগুলোতে সবজির দামও বাড়ানো হয়েছে।
কারওয়ানবাজারে সবজি সরবরাহকারী পাইকারি প্রতিষ্ঠান রিয়াদ এন্টারপ্রাইজের ব্যবসায়ী বলরাম চন্দ্র জানান, বৃষ্টিতে সবজি ও কাঁচামরিচের ব্যাপক ক্ষতিসাধন হয়েছে। তাই সরবরাহ কম, দামও চড়া। এর প্রভাব দামের ওপরও পড়েছে।
কাঁচাবাজারের দেখাদেখি একই অজুহাতে রাতারাতি দাম বাড়িয়েছে পেঁয়াজের মজুতকারীরাও। রাজধানীর শ্যামবাজারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত সপ্তাহে পাইকারি পর্যায়ে দেশি পেঁয়াজের কেজি ৩২ থেকে ৩৫ টাকা বিক্রি হয়েছে। এখন তা বেড়ে ৪২ থেকে ৪৫ টাকা হয়েছে। খুচরা বিক্রেতারা আরেক ধাপ বাড়িয়ে ৫৫ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করছেন।
সরবরাহে ঘাটতি না থাকা সত্ত্বেও সরবরাহকারীরা দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন বলে জানান শ্যামবাজারের পাইকারি ব্যবসায়ী কানাই সাহা। তিনি বলেন, বছরের এ সময় পেঁয়াজে ঘাটতি হওয়ার কথা নয়। সরবরাহও আগের মতো রয়েছে। কিন্তু বৃষ্টিতে ক্ষতি হয়েছে এমনটা বলছেন সরবরাহকারীরা। শ্যামবাজারের পেঁয়াজ ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মাজেদ দাবি করেন, পাইকারিতে দাম খুব একটা বাড়েনি। তিনি বলেন, কেজিতে ২ টাকার মতো বেড়েছে। মূলত বৃষ্টির কারণে অনেকের মজুত করা পেঁয়াজের কিছু অংশ নষ্ট হয়েছে। এর প্রভাব দামেও পড়েছে। সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে, শ্যামবাজারসহ রাজধানীর অন্য পাইকারি বাজারগুলোতে সপ্তাহের ব্যবধানে দেশি পেঁয়াজের দাম ১০ টাকা বেড়েছে। মাসের ব্যবধানে ১৫ টাকা বেড়েছে। আর খুচরা বাজারে মাসের ব্যবধানে পণ্যটির দাম ১৭ দশমিক ৬৫ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে কাঁচামরিচের দাম ৮৫ শতাংশ বেড়েছে। এ ছাড়া বেগুনের দাম ৪৩ শতাংশ ও শসার দাম ৫৩ শতাংশ বেড়েছে।
সংস্থাটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাসের ব্যবধানে দাম বাড়ার তালিকায় রয়েছে আটা, ময়দা, খোলা সয়াবিন, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, মুরগি, কাঁচামরিচ ও সবজি। আর বছরের ব্যবধানে দাম বাড়ার তালিকায় রয়েছে আটা, ময়দা, খোলা ও বোতলজাত সয়াবিন, মসুর, মুগ, অ্যাংকর ডাল, আদা, রসুন, মসলা, গরু, মুরগি, কাঁচামরিচ, সবজি ও ডিম। অর্থাৎ, আগের চেয়ে এসব পণ্যের পেছনে ভোক্তাকে বেশি খরচ করতে হচ্ছে, যা নিম্ন আয়ের মানুষের টিকে থাকাকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
বাজারে হঠাৎ এমন মূল্যবৃদ্ধিতে বাজার খরচ সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছেন রাজধানীর মাতুয়াইল এলাকার অটোরিকশা চালক মো. হাবিবুর রহমান। তিনি বলেন, ‘বাড়ি ভাড়া, সন্তানদের পড়াশোনা,
বিদ্যুৎ-গ্যাসের পেছনে খরচ, চিকিৎসার বাড়তি ব্যয়ে এমনিতেই চাপে আছি। এর মধ্যে বাজারে এখন যেভাবে সবকিছুর দাম লাফাইয়া বাড়তাছে তাতে চোখে-মুখে অন্ধকার দেখতেছি। প্রতিদিনের বাজার খরচ সামাল দেওয়াই এখন কঠিন হয়ে পড়ছে।’
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাজার ব্যবস্থা ও তদারকিতে দুর্বলতা রয়েছে। আর এর সুযোগ নিচ্ছে অসাধু ব্যবসায়ীরা। এতে মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা ভোক্তাদের কষ্ট আরও বেড়ে যাচ্ছে।
ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, ব্যবসায়ীদের একটি অংশের মধ্যে নৈতিকতার বড় ধরনের ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। বাজারে যথাযথ নজরদারি না থাকায় নানা অজুহাতে যে যেভাবে পারছে অস্থিরতা সৃষ্টি করে ইচ্ছামতো পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। এ যেন হরিলুট চলছে। দেখার কেউ নেই। দীর্ঘসময় ধরে এমনটা চলে এলেও ঠেকানো যাচ্ছে না। বাজেটে ৬৩ পণ্যে শুল্ককর সুবিধা দেওয়া হলো, দাম কমা তো দূরের কথা উল্টো লাফিয়ে বাড়ছে। এখন যুক্ত হয়েছে বৃষ্টি-বন্যার অজুহাত। বন্যা তো সারা দেশে না, বৃষ্টির প্রভাব থাকলেও ততটা না, যতটা বলা হচ্ছে। আসলে দাম বাড়িয়ে অতিরিক্ত লাভ তুলে নিতেই এমনটা বলা হচ্ছে। এগুলোকে বন্ধ করতে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
বাজার বিশেষজ্ঞ গোলাম রহমান বলেন, বৃষ্টি-বন্যার প্রভাব রয়েছে, তবে ব্যবসায়ীরা সেটা ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখাচ্ছেন এবং অতিরিক্ত দাম বাড়াচ্ছেন। এ প্রবণতাটা নতুন নয়। এটাকে ঠেকাতে হলে পণ্যের সরবরাহ বাড়াতে হবে এবং সেজন্য স্বাভাবিক সরবরাহ ধরে রাখার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। সেইসঙ্গে আলু বা ফলের মতো সবজি ও কাঁচা পণ্যের সংরক্ষণে আধুনিক হিমাগার ব্যবস্থা থাকতে হবে। বাজেটে শুধু শুল্ককর ছাড় দিলেই হবে না, কারণ যতটুকু ছাড় দেওয়া হয় তা ব্যবসায়ীদের পকেটে চলে যায়। নিত্যপণ্যের দাম যেসব কারণে বাড়ে, সেগুলোকে আগে বন্ধ করতে হবে।
এদিকে বাজারে দাম বাড়ার দৌড়ে আরও রয়েছে মুরগি ও ডিম। ব্রয়লারের দাম কেজিপ্রতি অন্তত ১০ টাকা বেড়ে ১৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অনেক বাজারে ২০০ টাকাতেও বিক্রি হচ্ছে। সোনালি মুরগি কেজি ৩২০ থেকে ৩৫০ টাকা পর্যন্ত। পাশাপাশি ফার্মের বাদামি ডিমের দাম মাসের ব্যবধানে ডজনপ্রতি ২০ টাকা বেড়েছে। এ ডিমের ডজন এখন ১৪০ টাকা বিক্রি হচ্ছে। কিছুদিন আগে এ দাম ছিল ১৩০ টাকা। তার আগে যা ছিল ১২০ টাকা।
মুরগি ও ডিমের ব্যবসায়ীরা অন্যদের মতো বৃষ্টির অজুহাত দিলেও বাংলাদেশ পোলট্রি অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিএ) সভাপতি সুমন হাওলাদার বলেন, বৃষ্টি-বন্যার প্রভাব সঠিক নয়। যেসব এলাকায় বন্যা হয়েছে সেখান থেকে রাজধানীতে মুরগি আসে না। আর মানিকগঞ্জ, গাজীপুর, সাভারের মতো যেসব এলাকা থেকে মুরগি আসে, সেখানে বৃষ্টির প্রভাব তেমন নেই। মূলত বাজার নিয়ন্ত্রণকারী সিন্ডিকেটের হাতে এখন মুরগি আছে, তারাই দাম বাড়িয়ে দিয়েছে।
এদিকে কেজিতে ৪ টাকা বেড়ে খোলা আটা বিক্রি হচ্ছে ৪৫ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত। সরু চাল আগের চেয়ে কেজিপ্রতি ২ টাকা বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। বর্ষার শুরুতেই আলুর কেজিতে ৫ টাকা বেড়ে ৩০ টাকা হয়েছে। মাসের ব্যবধানে আমদানিকৃত আদার কেজিতে ২০ টাকা এবং রসুনের কেজিতে ১০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত দাম বাড়তি রয়েছে। এ ছাড়া মাসের ব্যবধানে মাছের বাজারেও দাম বাড়তি রয়েছে।