Image description

একের পর এক বাঁধে জমছে পানি। তাতে পচে যাচ্ছে ধানের শীষ। ঘাম ঝরিয়ে ফলানো সোনালি ধান জলাবদ্ধতা থেকে বাঁচাতে তাই উদ্যোগ নেন সুনামগঞ্জের মধ্যনগরের শালিয়ানীসহ ছয়টি গ্রামের শতাধিক কৃষক। ঘোড়াডোবা হাওরের সউলডোয়ারি বাঁধ কেটে পানি সরাচ্ছিলেন তাঁরা।

বাঁধের নিচ থেকে গত রবিবার দুপুরে মাটি সরানোর সময় মাটিচাপায় প্রাণ হারান শালিয়ানীর আরমান হোসেন (১৮)।

সুনামগঞ্জসহ দেশের উত্তর-পূর্বের সাত জেলার হাওরাঞ্চলে এখন জলাবদ্ধতায় নষ্ট হচ্ছে ধান। কৃষকরা এই ধান রক্ষায় এভাবেই প্রাণান্ত সংগ্রাম করছেন। জলাবদ্ধতার পাশপাশি দেখা দিয়েছে অকালবন্যার আশঙ্কা।

কৃষকদের হাহাকারকে পুঁজি করে হাওরাঞ্চলে ফসলডুবি ঠেকাতে জেলা-উপজেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কিছু চক্র বাঁধ নির্মাণ বাস্তবায়নের নামে অবাধ দুর্নীতি করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রয়োজন না হলেও বহু স্থানে নেওয়া হয়েছে প্রকল্প।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১৭ সালে হাওরডুবির পর গণ-আন্দোলনের জেরে ঠিকাদারি প্রথা বিলোপ করে কৃষকদের অংশগ্রহণে গণশুনানির মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) প্রথায় বাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু হয়। জেলা প্রশাসককে সভাপতি ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলীকে সদস্যসচিব করে গঠিত কমিটি প্রতি উপজেলায় পিআইসি (প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি) গঠন, বাস্তবায়ন ও অনুমোদন করে থাকে।

বাঁধ এলাকার প্রকৃত কৃষককে দায়িত্ব দিয়ে পিআইসি গঠন করার নির্দেশনা লঙ্ঘিত হচ্ছে প্রকাশ্যে। সুনামগঞ্জে চলতি বছর ৬০৩ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারে ৭১৮টি পিআইসি গঠন করে কাজ করেছে পাউবো। এই কাজ এখনো চলছে। গত ১৫ ডিসেম্বর থেকে শুরু করে ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে বাঁধের কাজ শেষ করার নির্দেশনা থাকলেও তা এখনো শেষ করা হয়নি। বিভিন্ন অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, নতুন ১০০ ও পুরনো ২০০ মিলিয়ে ৩০০ বাঁধেই চলতি অর্থবছরে দুর্নীতি করা হয়েছে।
 
১০০টি নতুন বাঁধকে অপ্রয়োজনীয় উল্লেখ করেছেন হাওরের কৃষক ও কৃষকনেতারা। তাঁরা বলছেন, পুরনো ২০০ বাঁধে অতিরিক্ত ও অপ্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ দিয়ে লুটপাট করা হয়েছে।

সুনামগঞ্জ জেলা বিএনপির সদস্য অ্যাডভোকেট মো. আব্দুল হক অভিযোগ করেন, অপ্রয়োজনীয় ও অক্ষত বাঁধে বিপুল বরাদ্দ দিয়ে দুর্নীতি করা হয়েছে। তাই সময়মতো কাজ শুরু ও শেষ হয়নি। অনিয়ম হওয়ায় এখনই বাঁধে ফাটল দেখা দিচ্ছে এবং হাওরে পানি ঢুকে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। এসব অনিয়ম ও দুর্নীতির তদন্ত এবং অপরাধীদের বিচার হওয়া উচিত।

হাওরাঞ্চলবাসী নামের সংগঠনের প্রধান সমন্বয়ক ড. হালিম দাদ খান বলেন, প্রকল্প করাই হয় দুর্নীতির জন্য। রাজনৈতিক কৃতিত্ব নিতে ফসল রক্ষা বাঁধে দিন দিন বরাদ্দ বাড়ানো হলেও লুটপাট ছাড়া কাজের কাজ কিছুই হয় না। অভিজ্ঞ মাঠের কৃষক ও হাওরদরদি ব্যক্তিদের সমন্বয়ে বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে ফসল রক্ষার চেষ্টা করা হলে কাজের কাজ হতো। সেদিকে নীতিনির্ধারকদের খেয়াল নেই। বরং অনভিজ্ঞ সরকারি কর্মকর্তারা হাওরে গেড়ে বসা বাঁধচক্রের প্রভাবে ইচ্ছামতো প্রকল্প হাতে নিয়ে হাওরের ক্ষতিই করছেন।

জানা যায়, ২০১৭ সালের ভয়াবহ অকালবন্যায় বোরো ফসলহানির পর সরকার এই খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে দেয়। পাউবো সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮-১৯ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সুনামগঞ্জ জেলার ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৯৮৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা। হাওরবাসীর অভিযোগ, এই বরাদ্দের বড় অংশই প্রশাসনের একাংশ ও রাজনৈতিক নেতাদের সমন্বয়ে গড়ে তোলা চক্র হাতিয়ে নিয়েছে। হাওর বাঁচাও আন্দোলন, সুনামগঞ্জ গত রবিবার প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি দিয়ে বলেছে, বাঁধ নির্মাণে নীতিমালা মানা হচ্ছে না। সংগঠনের সভাপতি মো. ইয়াকুব বখ্ত বাহলুল ও সাধারণ সম্পাদক সুরঞ্জিত গুপ্ত রঞ্জু স্বাক্ষরিত স্মারকলিপিতে অনিয়ম ও দুর্নীতির ভয়ংকর চিত্র প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরে জড়িতদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়েছে। ১০টি দাবিতে গত শনিবার হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলন সুনামগঞ্জে সমাবেশ করেছে। উভয় সংগঠনই চলতি মৌসুমে ১০০ অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প ও ২০০ অক্ষত ও অল্প ক্ষতিগ্রস্ত প্রকল্পে বিপুল অর্থ বরাদ্দ দিয়ে সরকারি অর্থ তছরুপের অভিযোগ এনেছে।

দুর্নীতির উদাহরণ : জানা যায়. প্রকল্পের ব্যয় প্রাক্কলন থেকে শুরু করে ধাপে ধাপে চলে প্রি-ওয়ার্ক ও পোস্টওয়ার্ক দুর্নীতি। আবার সরকারি কর্মকর্তারা পিআইসি কর্মকর্তাদের সঙ্গে আঁতাত করে প্রকল্পের বরাদ্দ বাড়িয়ে নেন। এর সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরাও জড়িত। জগন্নাথপুরের উপজেলা নির্বাহী অফিসারের (ইউএনও) অফিস থেকে পিআইসির প্রধানদের অফিসে ডেকে এনে ঘুষ লেনদেন করার অভিযোগ উঠেছে গত নভেম্বরে।

এদিকে সুনামগঞ্জ জেলার দোয়ারাবাজার উপজেলার বাদেগোরেশপুরে ২১ নম্বর পিআইসির ক্ষেত্রে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। জেলা কমিটিতে আলোচনা না করে এবং উপজেলা কমিটির মতামত অগ্রাহ্য করে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া জনৈক মিজান উদ্দিনকে একটি প্রকল্প উপহার দেন। মিজান জেলা প্রশাসকের ঘনিষ্ঠ হেলাল উদ্দিন মাছুমের আপন ভাই। স্থানীয় কৃষকরা বলছেন, প্রকল্পের টাকায় হেলাল-মিজানদের বাড়ির রাস্তা তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। অথচ হাওরের ফসল রক্ষার কাজে এই বরাদ্দ শতভাগ অপ্রয়োজনীয়। অতীতে পাউবো কখনো এখানে প্রকল্প নেয়নি। অবশ্য এলাকাবাসীর প্রতিবাদের মুখে প্রকল্পের অবশিষ্ট বিল আটকে দেওয়া হয়েছে। এলাকাবাসী এই দুর্নীতির বিষয়ে লিখিত আবেদন করেছেন। সুনামগঞ্জের সদ্য বদলি হওয়া জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া ১০০ নতুন ও অক্ষত ২০০ বাঁধ নির্মাণে দুর্নীতির অভিযোগ সম্পর্কে গত বুধবার কালের কণ্ঠকে বলেন, প্রি-ওয়ার্ক থেকে শুরু করে মাঠ পর্যায়ে বাঁধের পুরো কাজটাই বাস্তবায়ন করে পাউবো। অনিয়ম বা দুর্নীতি হয়ে থাকলে তারা (পাউবো) বলতে পারবে। তাঁর (ডিসির) নিজের বিরুদ্ধে ওঠা পিআইসিসংক্রান্ত প্রস্তাব জেলা কমিটির বৈঠকে উত্থাপন না করার অভিযোগ সম্পর্কে বলেন, পাউবোর এই তথ্য ঠিক না।

সুনামগঞ্জের প্রায় প্রতিটি উপজেলা নির্বাহী অফিসারের অফিস ঘিরে বেপরোয়া বাঁধ-বাণিজ্যের অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, এ ধরনের কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি। ইউএনওরা শুধু পিআইসি গঠনের কাজে সম্পৃক্ত ছিলেন। বাঁধ নির্মাণে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার না করে জেলা প্রশাসক বলেন, এখন পর্যন্ত বরাদ্দের ৪৫ শতাংশ টাকা বিতরণ করা হয়েছে; ৫৫ শতাংশই বাকি রয়েছে। দুর্নীতি হবে কিভাবে?

পাউবো, সুনামগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মামুন হাওলাদার দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়ার কথা স্বীকার করে বলেন, অভিযোগ যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। অভিযোগ থাকায় দোয়ারাবাজারের একটি প্রকল্পের অবশিষ্ট বিল ছাড় দেওয়া হয়নি।

অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প : জানা গেছে, প্রয়োজন না থাকলেও বাঁধ নির্মাণের প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এসব প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে জামালগঞ্জের রৌয়াখাড়ায় ১৭ লাখ টাকার ৩৯ নম্বর, সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার ১৫ লাখ ৯৮ হাজার ৭৭৫ টাকা বরাদ্দের ১৭ নম্বর, শান্তিগঞ্জের ৩৫ লাখ টাকার ১ ও ৬৫ নম্বর, বিশ্বম্ভরপুরের ২১ ও ২২ নম্বর প্রকল্পও ছিল অপ্রয়োজনীয়। জামালগঞ্জের ভীমখালী ইউনিয়নের হুগলি গ্রামে ৩৯ নম্বর প্রকল্পের বিষয়ে কৃষক আমিরুল হক জানান, এখানে কোনো প্রকল্পের দরকার ছিল না। এই বাঁধে বিনা প্রয়োজনে ১৭ লাখ টাকা বরাদ্দ করা হয়। জগন্নাথপুরের ১ নম্বর প্রকল্পে এবার মোটা অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে প্রকল্পের প্রথম সভাপতি আলা মিয়াকে বাদ দিয়ে মোস্তাফিজুর রহমানকে সভাপতি করা হয়েছে। এলাকাবাসী বলছে, এখানে একটি প্রকল্প দিলেই চলত। কিন্তু কর্তাব্যক্তিরা লোপাটের উদ্দেশ্যে দুটি প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছেন। হাওর বাঁচাও আন্দোলন সুনামগঞ্জের সভাপতি ইয়াকুব বখ্ত বাহলুল কালের কণ্ঠকে বলেন, চলতি বছর শতাধিক অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পে সরকারের অন্তত ২০ কোটি টাকা অপচয় করা হয়েছে।