দেশে তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহারে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও অঞ্চলভেদে বৈষম্যের চিত্র এখনো স্পষ্ট। ইন্টারনেট ব্যবহারে শীর্ষে রয়েছে ঢাকা এবং সবচেয়ে পিছিয়ে শেরপুর। একই সঙ্গে স্মার্টফোন ও মোবাইল ফোন ব্যবহার এবং ডিজিটাল দক্ষতার ক্ষেত্রেও জেলাভিত্তিক বড় পার্থক্য রয়েছে। ৭৮.৫ শতাংশ ব্যবহারকারী সাইবার হামলার ক্ষেত্রে কিছুটা সচেতন।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে পরিসংখ্যান ভবনের অডিটরিয়ামে ‘তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যবহারের সুযোগ ও প্রয়োগ পরিমাপ ২০২৪-২৫’ শীর্ষক জরিপের ফল প্রকাশ করা হয়। এতে প্রথমবারের মতো জেলাভিত্তিক তথ্য তুলে ধরা হয়েছে, যা দেশের ডিজিটাল চিত্রকে আরো স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব আলেয়া আক্তার। জরিপের ফলাফল তুলে ধরেন জরিপ প্রকল্পের পরিচালক সৈয়দা মারুফা শাকি।
জরিপে ডিজিটাল দক্ষতার ক্ষেত্রে মৌলিক কাজের আধিক্য দেখা গেলেও উন্নত দক্ষতার ঘাটতি স্পষ্ট। জরিপে অংশ নেওয়া ৮৪ শতাংশ ব্যবহারকারী কপি-পেস্ট করতে পারেন।
ডিজিটাল নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও মিশ্র চিত্র উঠে এসেছে। ৭৮.৫ শতাংশ ব্যবহারকারী জানিয়েছেন, তাঁরা সাইবার আক্রমণের ক্ষেত্রে কিছুটা সচেতন। তবে ৫০.৫ শতাংশ ব্যবহারকারীর জন্য ভাইরাস ও ক্ষতিকর সফটওয়্যার বড় ঝুঁকি হিসেবে রয়ে গেছে।
জরিপের তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৭৩ শতাংশ পরিবারে স্মার্টফোন রয়েছে। বিভাগীয় হিসাবে স্মার্টফোন ব্যবহারে এগিয়ে চট্টগ্রাম বিভাগ, যেখানে ৮৬ শতাংশ পরিবারে স্মার্টফোন আছে। ঢাকা বিভাগে এ হার ৮২ শতাংশ। তবে ইন্টারনেট ব্যবহারে ঢাকা বিভাগই এগিয়ে রয়েছে।
জেলাভিত্তিক হিসাবে দেখা যায়, ইন্টারনেট ব্যবহারে শীর্ষে রয়েছে ঢাকা—এখানে ৭৭.১ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করেন। এর পর রয়েছে নারায়ণগঞ্জ (৭৭ শতাংশ), কুমিল্লা (৬৮.৬ শতাংশ) ও চাঁদপুর (৬৭.২ শতাংশ)। সবচেয়ে কম ইন্টারনেট ব্যবহার হয় শেরপুর জেলায়, যেখানে এ হার মাত্র ২৫.৯ শতাংশ। এই বিশাল ব্যবধান দেশের ডিজিটাল বৈষম্যের স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরে।
স্মার্টফোন ব্যবহারের ক্ষেত্রেও জেলাভেদে বড় পার্থক্য রয়েছে। সবচেয়ে বেশি স্মার্টফোন ব্যবহার করা হয় কুমিল্লায়, যেখানে ৯৩.৭ শতাংশ মানুষ স্মার্টফোন ব্যবহার করেন। এরপর রয়েছে ফেনী (৯০.৬ শতাংশ) ও ঢাকা (৮৪.৭ শতাংশ)। অন্যদিকে পঞ্চগড়ে স্মার্টফোন ব্যবহার সবচেয়ে কম, মাত্র ৫০.১ শতাংশ।
মোবাইল ফোন ব্যবহারের দিক থেকে দেশের প্রায় সর্বজনীন চিত্র পাওয়া গেছে। কিশোরগঞ্জে ৯৯.৯ শতাংশ মানুষ মোবাইল ব্যবহার করেন, যা দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ। বিপরীতে সবচেয়ে কম মোবাইল ব্যবহার দেখা গেছে নড়াইল জেলায়। সার্বিকভাবে দেশে ৯৮.৯ শতাংশ পরিবারের কাছে অন্তত একটি মোবাইল ফোন রয়েছে, যা প্রযুক্তি বিস্তারের একটি বড় সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
জরিপের ফলে দেখা যায়, জাতীয়ভাবে ৫৫ শতাংশ পরিবারে ইন্টারনেট সংযোগ রয়েছে এবং ব্যক্তি পর্যায়ে ৫৩.৪ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করেন। তবে শহর ও গ্রামের মধ্যে ব্যবধান উল্লেখযোগ্য। শহরে ৭৫.৭ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করলেও গ্রামে এ হার মাত্র ৪৩.৬ শতাংশ। অর্থাৎ দুই অঞ্চলের মধ্যে ব্যবধান ৩২.১ শতাংশ।
প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে লিঙ্গভিত্তিক পার্থক্যও রয়েছে। পুরুষদের মধ্যে ইন্টারনেট ব্যবহার ৫৬.৬ শতাংশ, যেখানে নারীদের মধ্যে তা ৫০.২ শতাংশ। একইভাবে মোবাইল মালিকানায়ও পুরুষ এগিয়ে। আধুনিক প্রযুক্তির যুগে এখনো অর্ধেক নারী ইন্টারনেটের বাইরে থাকাকে একটি বড় উদ্বেগের বিষয় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইন্টারনেট ব্যবহারের উদ্দেশ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয় সরকারি চাকরির বিজ্ঞপ্তি খোঁজার জন্য। ৬৪ শতাংশ ক্ষেত্রে মানুষ এ উদ্দেশ্যে ইন্টারনেট ব্যবহার করেন। এর পরই রয়েছে খেলাধুলা বিষয়ক তথ্য অনুসন্ধান (প্রায় ৫০ শতাংশ)। তবে অনলাইনে পণ্য বা সেবা কেনার হার এখনো কম—মাত্র ১১.৬ শতাংশ।
জরিপে দেখা গেছে, উচ্চমূল্য ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তির পথে একটি বড় বাধা। প্রায় ৪৩.৬ শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন, ইন্টারনেটের বেশি খরচের কারণে তাঁরা এটি ব্যবহার করতে আগ্রহী নন। বিশেষ করে গ্রামীণ ও নিম্ন আয়ের মানুষের ক্ষেত্রে এই সমস্যা বেশি প্রকট।
কম্পিউটার ব্যবহারের ক্ষেত্রেও বড় বৈষম্য রয়েছে। শহরে ২১.১ শতাংশ পরিবারের কম্পিউটার থাকলেও গ্রামে তা মাত্র ৩.৬ শতাংশ। ব্যক্তি পর্যায়েও একই চিত্র—শহরে ২৫.৬ শতাংশ মানুষ কম্পিউটার ব্যবহার করেন, যেখানে গ্রামে মাত্র ৫ শতাংশ।
বিবিএসের এই জরিপে স্পষ্ট হয়েছে, দেশে প্রযুক্তির বিস্তার দ্রুত ঘটলেও তা এখনো সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছায়নি। বিশেষ করে জেলা, গ্রাম-শহর এবং নারী-পুরুষের মধ্যে বৈষম্য রয়ে গেছে। পাশাপাশি উন্নত ডিজিটাল দক্ষতার অভাব, উচ্চ খরচ এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি দেশের ডিজিটাল অগ্রযাত্রার বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে এসেছে।
সেমিনারে উন্মুক্ত আলোচনা পর্ব পরিচালনা করেন বিবিএসের কম্পিউটার বিভাগের পরিচালক কবির উদ্দিন আহাম্মদ। সেমিনারে বিশেষ অতিথি ছিলেন পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. মীর হোসেন ও মোহাম্মদ মাসুদ রানা চৌধুরী। এতে বিবিএস মহাপরিচালক মো. ফরহাদ সিদ্দিকসহ প্রকল্পের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।