দেশের চার জেলায় চার বিভীষিকাময় ঘটনা ঘটেছে, যা মধ্যযুগীয় বর্বরতাকেও হার মানায়। সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে জমি নিয়ে বিরোধের জেরে বাবার বুকেই নিরাপদ থাকতে পারেনি পাঁচ বছরের শিশু হৃদয়। প্রতিপক্ষের চাপাতির কোপে বাবার কোলেই প্রাণ যায় তার। কক্সবাজারে পারিবারিক বিরোধ কেন্দ্র করে ঘুমের ওষুধ মেশানো রসমালাই খাইয়ে স্ত্রীকে হত্যার পর লাশ কয়েক টুকরো করে গুমের চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে। গ্রেফতারের পর ১৬৪ ধারার দেওয়া জবানবন্দিতে এ তথ্য দিয়েছে স্বামী। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে পূর্ব বিরোধের জেরে কোমল পানীয়ের সঙ্গে এসিড মিশিয়ে রহমত উল্লাহ (১৫) নামের এক কিশোরকে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় প্রধান আসামিকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এছাড়া ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুরে বৈশাখী মেলায় ঘুরতে গিয়ে নিখোঁজ এক কিশোরীর লাশ ইটভাটার পুকুর থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, সংঘবদ্ধ ধর্ষণের পর তাকে হত্যা করে পানিতে ফেলে দেওয়া হয়েছে। প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-
শাহজাদপুর (সিরাজগঞ্জ) : নিহত হৃদয়ের বাবা ফারুক হোসেন ও স্বজনরা জানান, বৃহস্পতিবার সকাল ১০টার দিকে শাহজাদপুর উপজেলার গালা ইউনিয়নের মাজ্জান গ্রামের মৃত হাতেমের ছেলে হামেদ আলী সরদার তার বাড়িতে টয়লেট নির্মাণ করছিলেন। এজন্য তিনি ফারুক হোসেনের গোয়ালঘর ঘেঁষে মাটি ফেলছিলেন। এ নিয়ে দুজনের মধ্যে প্রথমে তর্কাতর্কি ও পরে হাতাহাতি শুরু হয়। একপর্যায়ে হামেদের পক্ষ নিয়ে তার অপর ভাই পেশকার, আশকার, হাকিম ও মোক্তার লাঠিসোঁটা ও চাপাতি নিয়ে এগিয়ে আসে। এ সময় ৫ বছরের সন্তানকে কোলে নিয়ে পালানোর চেষ্টা করেন ফারুক হোসেন। তখন হামেদ চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে ফারুকের কোলে থাকা শিশু হৃদয় হোসেনকে গুরুতর আহত করে। তার মাথা ও হাতে কোপ লেগে রক্তাক্ত হয়। প্রতিবেশীরা শিশুটিকে হাসপাতালে নেওয়ার পথে সে মারা যায়। এ ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। খবর পেয়ে আশপাশের শত শত উৎসুক নারী-পুরুষ এসে ভিড় করেন ওই বাড়িতে। এদিকে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে গেছে অভিযুক্ত হামেদ, পেশকার, আশকার, মোক্তার ও হাকিম।
শাহজাদপুর থানার ওসি (তদন্ত) মো. নাজমুল কাদের বলেন, লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য সিরাজগঞ্জ সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় ফারুক সরদার থানায় মামলা করবেন।
কক্সবাজার : স্ত্রীকে হত্যা করে লাশ গুমের পর ঢাকায় আত্মগোপন করেছিল ঘাতক স্বামী সাইফুল ইসলাম তারেক (৩০)। মঙ্গলবার তাকে শাহবাগ থেকে গ্রেফতার করে কক্সবাজারে আনা হয় এবং আদালতে সোপর্দ করা হয়। পুলিশ জানায়, আদালতে তিনি ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
এর আগে গত ১১ এপ্রিল বিকালে কক্সবাজার সদর উপজেলার ঝিলংজা ইউনিয়নের জানারঘোনায় একটি পরিত্যক্ত ডোবাসদৃশ স্থান থেকে মস্তক ও দুই হাতের কবজিবিহীন এক নারীর লাশ উদ্ধার করা হয়। পরে নিশ্চিত হওয়া যায় ওই নারী শাহিদা আক্তার রিপা ওরফে মুন্নি (২৯)। তিনি মহেশখালী উপজেলার চরপাড়া এলাকার আমান উল্লাহর মেয়ে। তার স্বামী তারেক একই উপজেলার গোরকঘাটা ইউনিয়নের দাসি মাঝিপাড়ার নুরুল ইসলামের ছেলে। এ ঘটনার পর নিহতের মা হাছিনা আক্তার বাদী হয়ে কক্সবাজার সদর থানায় হত্যা মামলা করেন। এরপর পুলিশ তদন্তে নামে এবং আসামিকে গ্রেফতার করে।
পুলিশ জানায়, ২৬ মার্চ রসমালাইয়ে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে স্ত্রীকে অচেতন করে তারেক। এরপর তাকে গলা কেটে হত্যা করে। তার মাথা ও দুই হাতের কবজি বিচ্ছিন্ন করে। একদিন পর ঝিলংজার জানারঘোনার একটি পরিত্যক্ত ডোবায় দেহটি ফেলা হয়। আর বিচ্ছিন্ন মাথা ও হাতের অংশ কক্সবাজার সদর থানার পাশে খুরুশকুল-কস্তুরাঘাট নতুন ব্রিজের ওপর দিয়ে বাঁকখালী নদীতে নিক্ষেপ করা হয়।
কক্সবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ছমিউদ্দিন বলেন, আসামির স্বীকারোক্তি ও আদালতে দেওয়া জবানবন্দির ভিত্তিতে হত্যায় ব্যবহৃত ছুরি এবং ঘুমের ওষুধ মেশানো রসমালাইয়ের অবশিষ্টাংশ উদ্ধার করা হয়েছে। তবে মাথা ও হাতের কিছু অংশ উদ্ধারে এখনো অভিযান চলছে।
নবীনগর (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) : নিহত রহমত উল্লাহ উপজেলার বিদ্যাকুট ইউনিয়নের মেরকুটা গ্রামের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সিদ্দিক মিয়ার ছেলে। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, একই গ্রামের খায়ের মিয়ার ছেলে হাসান মিয়া ৪ এপ্রিল রহমত উল্লাহকে কোমল পানীয়ের সঙ্গে এসিড মিশিয়ে পান করায়। এতে সে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে। তাকে প্রথমে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতালে এবং পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসা শেষে মঙ্গলবার বাড়িতে আনা হলে রাত ১টা ৩০ মিনিটে তার মৃত্যু হয়। পুলিশ তার লাশ উদ্ধার করে সুরতহাল প্রতিবেদন শেষে ময়নাতদন্তের জন্য ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পাঠিয়েছে।
নিহতের মামা হানিফ মিয়া বৃহস্পতিবার যুগান্তরকে বলেন, আমার ভাগিনাকে কোমল পানীয়ের সঙ্গে এসিড মিশিয়ে খাইয়ে দিয়েছে হাসান। নবীনগর থানায় তিনজনকে আসামি করে আগেই অভিযোগ দিয়েছিলাম। এখন মামলা করব।
নবীনগর থানার ওসি জানান, অভিযোগ পাওয়ার পর প্রধান আসামি হাসান মিয়াকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এ বিষয়ে আইনি প্রক্রিয়া চলমান।
ঝিনাইদহ : পরিবার ও স্থানীয়রা জানান, বুধবার সকালে বৈশাখী মেলায় বান্ধবীদের সঙ্গে ঘুরতে যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল ওই কিশোরী। এরপর আর বাড়ি ফিরেনি সে। কোটচাঁদপুর-কালীগঞ্জ সড়কের ইকো ব্রিকস’র পুকুরে বৃহস্পতিবার তার লাশ দেখে পুলিশে খবর দেওয়া হয়। পুলিশ এসে লাশ উদ্ধার করে। সেখানে ছুটে আসেন নাছিমার স্বজনরাও। এ সময় তাদের আহাজারিতে সেখানে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়।
কোটচাঁদপুর থানার ওসি মো. আসাদ-উজ-জামান জানান, ওই কিশোরী বুধবার রাগ করে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল। তাকে সংঘবদ্ধ পাশবিক নির্যাতনের (ধর্ষণ) পর হত্যা করে লাশ পুকুরে ফেলে দেওয়া হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। তবে প্রকৃত কারণ জানতে ময়নাতদন্তের জন্য লাশ ঝিনাইদহ জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।