সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কটূক্তি, অশ্লীল ও আক্রমণাত্মক মন্তব্যে কোনো লাগাম নেই। ভুয়া তথ্য প্রচার, রাজনৈতিক নেতাসহ বিশিষ্টজনদের চরিত্রহানি এখন চরমে। রাষ্ট্রের শীর্ষ ব্যক্তি এবং তাঁর পরিবারের সদস্যও রেহাই পাচ্ছেন না।
ভুক্তভোগী ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক, ইউটিউব—ইন্টারনেটভিত্তিক এসব প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে পড়া অগণিত অস্থায়ী ভিডিও নৈতিকতার অবক্ষয় ঘটাচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে দেশ, রাষ্ট্র, সমাজ, রাজনীতি নিয়ে কোনো পোস্ট দিতে ভয় পাচ্ছেন সজ্জন ব্যক্তিরা।
এমনও ঘটনা ঘটছে যে একজন বিশিষ্ট নাগরিকের কোনো কন্যাসন্তান নেই। কিন্তু ফেসবুকে প্রচার করা হলো—অমুকের কন্যা আপত্তিকর কাজে লিপ্ত। কয়েক দিন আগে একটি রাজনৈতিক দলের নারী কর্মীর মৃত্যুসংবাদ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদন সম্পর্কে অশ্লীল মন্তব্যের ছাড়াছড়ি লক্ষ করা যায়। একজন মৃত ব্যক্তি সম্পর্কে এ ধরনের ঘৃণা প্রকাশ সামজিক মূল্যবোধের অবিশ্বাস্য অবক্ষয় বলে অনেকে মনে করেন।
কয়েক দিন আগে ‘বিজ্ঞানতথ্য’ নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকে নাসার ঐতিহাসিক আর্টেমিস-২ চন্দ্রাভিযান নিয়ে তথ্যবহুল একটি পোস্ট লেখা হয়। এই মিশনে তিনজন পুরুষ নভোচারীর সঙ্গে অংশ নিয়েছিলেন ক্রিশ্চিনা কোচ নামের ৪৭ বছর বয়সী একজন নারী নভোচারী। পোস্টটিতে ওই নারী সম্পর্কে অনেকেই অশ্লীল মন্তব্য করলে পোস্টদাতা লেখেন, ‘মানুষ শিক্ষিত কি না তাকে বোঝার অন্যতম উপায় হলো তার আচরণ এবং ভাষা। এটিই শিক্ষার প্রতিফলন ঘটায়।...ক্রিশ্চিনা কোচ একজন বয়স্ক মহিলা।
লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ গত বছর তাঁর ফেসবুক পোস্টে লিখেছিলেন, ‘একসময় রাজনৈতিক বিষয়ে ফেসবুকে পোস্ট দিতাম। এখন পারতপক্ষে দিই না। মূর্খ আর বেয়াদব অর্বাচীনরা যেভাবে হামলে পড়ে, ট্রল করে, তা দেখলে রক্তচাপ বেড়ে যায়।’
তিনি আরো লিখেছিলেন, ‘ফেসবুক এ দেশে এখনো সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম হয়ে উঠল না। এটা চলে গেছে মূর্খ আর ইতরদের দখলে। এরা উগ্র জাতিবাদী, ধর্মোন্মাদ, সাম্প্রদায়িক, প্রচণ্ড রকম নারীবিদ্বেষী। চিলে কান নিয়ে গেছে শুনলে এরা চিলের পেছনে দৌড়ায়। এদের পোস্ট কিংবা মন্তব্য পড়লে বোঝা যায়, এদের ন্যূনতম পড়াশোনা নেই, হোমওয়ার্ক নেই, শোভন ভাষা ব্যবহারের পারিবারিক শিক্ষা নেই। এরা উইট বোঝে না।’
গত বছরের শেষ দিকে রাজনৈতিক নেতাদের নিয়ে গালাগাল সম্পর্কে একজন নারী সাংবাদিক তাঁর ফেসবুক পোস্টে লিখেছিলেন, ‘গালাগাল নতুন নয়। কিন্তু যখন তা রাজনীতির স্লোগান হয়, তখন প্রতিবাদের ভাষা হয়ে যায় অশ্লীলতা, ঘৃণা; আজ এই অশ্লীল গালি সহজেই আমাদের সন্তানদের ডিভাইস বেয়ে তাদের মন-মগজে ঢুকছে, এটাই সবচেয়ে ভয়ংকর।’
ওই সাংবাদিক রাষ্ট্র ও সরকারের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রতি প্রশ্ন রাখেন, ‘আপনারা কি বুঝতে পারছেন না, এই কদর্যতা শুধু আমার ঘরে নয়, আপনাদের ঘরেও ঢুকে পড়ছে? আপনাদের সন্তানের মনও কলুষিত করছে! দুই দিন পর কিন্তু কিছু চেয়ে না পেলে এই অশ্লীল গালিই হবে তার ক্ষোভ প্রকাশের ভাষা। অশনিসংকেত টের পাচ্ছেন না?’
গত বছর নির্বাচনের আগে একটি দলের পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে ফেসবুকে ফেক আইডি খুলে প্রতিপক্ষের চৌকস নেতাদের মুখোশ খুলতে, তাঁদের চরিত্র হনন করতে। সম্ভাব্য এই আক্রমণ, অশ্লীলতার জবাব দিতে অন্য দলের পক্ষ থেকেও তাদের কর্মীদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সক্রিয় হতে বলে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কিভাবে বট বাহিনী গড়ে তুলে ব্যক্তি পর্যায়ে চরিত্রহানি করা হয়, সেই কাহিনি গত মাসে একটি সংবাদপত্রের ঈদ সংখ্যায় ছাপা হয়েছে। সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের একজন উপদেষ্টা ‘ ইউটিউবার’ নামের এই গল্পের লেখক।
পরিস্থিতির আরো অবনতি : গত বছরের তুলনায় চলতি বছরের পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। গত ৯ এপ্রিল প্রকাশিত আন্তর্জাতিক ফ্যাক্ট চেকিং নেটওয়ার্ক স্বীকৃত দেশের একটি ফ্যাক্ট চেকিং বা তথ্য যাচাই প্রতিষ্ঠান ‘রিউমার স্ক্যানার বাংলাদেশ’-এর প্রতিবেদন অনুসারে চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত) বাংলাদেশে মোট এক হাজার ৯৭৪টি ভুল তথ্য শনাক্ত করেছে প্রতিষ্ঠানিট, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১৩৬ শতাংশ বেশি। ২০২৫ সালের প্রথম প্রান্তিকে এই সংখ্যা ছিল ৮৩৭। প্রতিষ্ঠানটির পর্যবেক্ষণ—এই তিন মাসে ভুল তথ্যের বিস্তার বাড়ার পেছনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনসহ জাতীয় রাজনৈতিক ও বৈশ্বিক বিভিন্ন ইস্যু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আগের প্রান্তিকের (২০২৫ সালের অক্টোবর-ডিসেম্বর) তুলনায় এই বৃদ্ধির হার প্রায় ৩৭ শতাংশ।
প্রতিষ্ঠানটির তথ্য, একক ব্যক্তি হিসেবে সবচেয়ে বেশি ভুল তথ্য ছড়ানো হয়েছে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে। রাজনৈতিক দলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভুল তথ্য প্রচারিত হয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকে নিয়ে।
সম্প্রতিক আলোচনা : সম্প্রতি একজন নারী রাজনৈতিক কর্মীকে সামজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আপত্তিকর মন্তব্য করার অভিযোগে গ্রেপ্তার এবং বিষয়টি নিয়ে বাকস্বাধীনতাকেন্দ্রিক আলোচনার মধ্যে সাংবাদিক, গবেষক ও কলাম লেখক আমীন আল রশীদ সম্প্রতি তাঁর ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, ‘আপনি দেশের প্রধানমন্ত্রী বা অন্য যেকোনো নাগরিককে নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় বিষোদগার করবেন, গালাগাল করবেন, তাঁকে নিয়ে অসম্মানজনক শব্দ লিখবেন এবং এ কারণে আপনার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে বলবেন আপনার বাকস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা হয়েছে—এটা পৃথবীর উন্নত গণতান্ত্রিক দেশও অনুমোদন করবে না। নিতান্ত রাজনৈতিক ও আদর্শিক কারণে যদি রাষ্ট্র আপনার কথা বলা ও লেখার ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে, সেটি অবশ্যই বাকস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ। কিন্তু কোনো রাষ্ট্রই গালাগাল, অশ্লীলতা ও বিষোদগারের স্বাধীনতা দেয় না, দিতে পারে না। কারণ যা খুশি বলা ও লেখার স্বাধীনতা দিলে সেখানে যে নৈরাজ্য তৈরি হবে, রাষ্ট্র সেটি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না।’
আলোচিত ওই নারী রাজনৈতিক কর্মীর জামিন পাওয়া সংক্রান্ত একটি অনলাইন সংবাদ বিষয়ে একজন মন্তব্য করেন, ‘সমালোচনা বলতে আমরা কী বুঝি এটা একটু ভেবে দেখা দরকার। গঠনমূলক সমালোচনা মানে হলো তথ্যভিত্তিক, শালীন ভাষায় কোনো বিষয়ের ভুল বা সীমাবদ্ধতা তুলে ধরা, যাতে সংশোধনের সুযোগ তৈরি হয়। কিন্তু ব্যক্তিগত আক্রমণ, পরিবারকে নিয়ে অশালীন মন্তব্য, মিথ্যা তথ্য বা গুজব ছড়ানো—এসবকে কোনোভাবেই সমালোচনা বলা যায় না। একইভাবে, ভুয়া ছবি বা ভিডিও তৈরি করে বিভ্রান্তি ছড়ানো কিংবা কাউকে অপমানজনক ভাষায় আক্রমণ করাও সমালোচনার অংশ নয়।’
এ ছাড়া এমন ঘটনাও ঘটছে যে ফেসবুকে কারো পোস্টের কমেন্ট বক্সে গালাগাল করে ব্র্যাকেটে লেখা হচ্ছে—‘আমি আমার বাকস্বাধীনতার কিছুটা প্রয়োগ করলাম’।
বিশেষজ্ঞ মত : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও বিশ্ববিদ্যালয়টির নৈতিক উন্নয়ন কেন্দ্রের সাবেক পরিচালক ড. শাহ কাওসার মুস্তাফা আবুলউলায়ী এ বিষয়ে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ছাড়াও সমাজে অশালীন আচরণ, গালাগালি বেড়েছে বলেই মনে হয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এ ক্ষেত্রে অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। রাজনীতিতেও এই অন্যায় চর্চা হচ্ছে। এতে আমাদের জাতি নৈতিকভাবে নিম্নগামী হচ্ছে। পাকিস্তান আমলেও রাজনীতিতে গালাগালি ছিল, কিন্তু তা ছিল একটি মাত্রার মধ্যে। একজন ফিলোসফার হিসেবে এই চর্চাকে আমি অশুভ মনে করি এবং মেনে নিতে পারি না। গালাগালি, চরিত্র হনন, অশালীন আচরণের সঙ্গে অর্ধসত্য এবং অসত্য তথ্য প্রচারও ক্ষতিকর, নৈতিকতাবিরোধী। এই পরিস্থিতি প্রতিরোধে সমাজচিন্তাবিদদের উদ্যোগ নিতে হবে। শিক্ষক, বুদ্ধিজীবীসহ দল-মত-নির্বিশেষে সবারই এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখা দরকার। আমি আমার সন্তানকে তো শালীনতা শেখাই। শালীনতা সত্যের পক্ষে এবং সত্য কথা বলতে শেখায়। আমাদের সমাজ সেভাবেই গড়ে ওঠা দরকার।’
আলোচিত বিষয়ে আইনি প্রতিকার সম্পর্কে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরশেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, “যখন এই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ছিল না, তখনো কাউকে গালাগালি করা, অসম্মান করা বা মানহানি করা—এগুলোর জন্য প্যানাল কোডে বিধান ছিল মামলা করার, এমনকি ক্ষতিপূরণ চাওয়ারও। ডিজিটাল মাধ্যম হওয়ার পরে এই মাধ্যমে যখন এগুলো শুরু হলো, তখন এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট করা হয়েছে। পরবর্তীকালে এটি বিভিন্নভাবে সংশোধন হলেও ওই বিধানটি আছে। এই অপরাধের জন্য বিচারের জায়গা হলো ট্রাইব্যুনাল। সাইবার ট্রাইব্যুনালে গিয়ে ভুক্তভোগী অভিযোগ করতে পারেন এবং সেগুলো হচ্ছেও। তবে ফেক আইডি একটি বড় ধরনের সমস্যা। ডিজিটাল যুগের সবচেয়ে বড় একটি দুর্বলতা এটি। এখানে কতগুলো ‘বট বাহিনী’ আছে। আপনি যদি কোনো পলিটিক্যাল বক্তব্য দেন, দেখবেন ৫০০ কমেন্ট আসছে। তার মধ্যে মাত্র ২০ থেকে ৩০ জনের আইডেন্টিটি বা ছবি আছে। বাকি সব এ, বি, সি, ডি...। এগুলো ভুয়া। কোনো ব্যক্তি এগুলো চালাচ্ছে, বিভিন্ন মানহানিকর বক্তব্য দিচ্ছে, কিন্তু নিজের নাম দিচ্ছে না।
এ জায়গাটায় আমাদের সরাসরি কিছু করার নেই। ফেসবুক চালায় আমেরিকানরা। কোনো ব্যক্তি যদি মনে করেন কোনো অ্যাকাউন্ট থেকে অপপ্রচার হচ্ছে, তবে তিনি ফেসবুক কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করলে তাদের একটি টিম আছে, তারা চাইলে ওই আইডি ব্লক করে দিতে পারে। আমার মনে হয় এটার (বট বাহিনী) পেছনে খুব বেশি লোক নেই। কমেন্টগুলো দেখলে বোঝা যায় যে ভাষাগুলো একই ধরনের। একেক মানুষের মাথা থেকে তো একেক ধরনের কমেন্ট বা গালি আসার কথা। কিন্তু এখানে দেখা যায় একজন ব্যক্তিই শত শত ফেক আইডি ব্যবহার করে এই কাজগুলো করছে। জনসাধারণের কাছে আমার আবেদন হলো, আপনারা যখন ফেসবুকে কোনো আনআইডেন্টিফায়েড বা ছবি ছাড়া আইডি দেখবেন, সেগুলোকে ইগনোর করবেন। এগুলো আপনারা খুলবেন না বা দেখবেন না। তাহলে আলটিমেটলি তাদের উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়ে যাবে।”