‘আনপ্রেডিক্টেবল’ শব্দটি সাবেক প্রেসিডেন্ট এইচ এম এরশাদের নামের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গিয়েছিল। তিনি সকালে এক কথা, বিকেলে সম্পূর্ণ বিপরীত বক্তব্য দিয়ে নামের সাথে আনপ্রেডিক্টেবল উপাধি পেয়েছিলেন। এরশাদ ইন্তেকাল করেছেন ২০১৯ সালের ১৪ জুলাই। এরশাদের অবর্তমানে ‘আনপ্রেডিক্টেবল’ শব্দটি যেন দেশের রাজনীতির সাথে জড়িয়ে গেছে। দেশের রাজনীতিতে যেমন অনিশ্চিত আছে, তেমিন অপ্রত্যাশিত ঘটনাও ঘটে যাচ্ছে। ‘শেখ হাসিনা পালায় না’-ঘোষণা দেয়ার এক সপ্তাহের মধ্যেই দুর্দান্ত প্রতাপশালী রাজনীতির মাফিয়ানেত্রী শেখ হাসিনাকে পালাতে হয়েছে। গণভবনে দুপুরের খাবার রান্না করেছিলেন; কিন্তু খাওয়ার সুযোগ পাননি। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকতে চেয়েছিল; সংস্কারের নামে নাকে রশি লাগিয়ে ড. আলী রীয়াজ গংরা রাজনীতিকদের ঘুরিয়েছেন; সেই আলী রীয়াজ গং পালিয়েছে; ক্ষমতাধর ড. ইউনূসকে এখন বিএনপির অনুকম্পায় থাকতে হচ্ছে। নবাব সিরাজ উদদৌলা সিনেমার গান ‘সকাল বেলা আমির রে ভাই ফকির সন্ধ্যা বেলা’র মতো অবস্থা। আনপ্রেডিক্টেবল রাজনীতিতে কখন কি ঘটে: সত্যিই বলা মুশকিল। ৫ আগস্টের আগে শেখ হাসিনার পালাবেন: কেউ কল্পনাও করত না এবং ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের আগে কেউ বিশ্বাস করত না: ড. ইউনূস নির্বাচন দেবেন। কিন্তু ঘটনা ঘটে গেছে। শুধু কি তাই, যে আওয়ামী লীগ ‘জামায়াতকে নিষিদ্ধ’ করেছিল; সেই আওয়ামী লীগের রাজনীতি ‘নিষিদ্ধ’ আর স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি জামায়াত জাতীয় সংসদে ছড়ি ঘোরাচ্ছে। স্বাধীন দেশে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি জামায়াত সংসদে আস্ফালন করবে: মানুষ যেমন কল্পনাও করত না; তেমনি বিএনপিকে বিপদে ফেলতে যেভাবে আন্দোলনের হুমকি-ধমকি চলছে, তা পতিত আওয়ামী লীগকে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্র তৈরি করছে।
জুলাই অভ্যুত্থান এবং ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বাংলাদেশের রাজনীতি কার্যত আনপ্রেডিক্টেবল হয়ে পড়েছে। কখন কি ঘটে, আগাম বোঝা সত্যিই দুরূহ। দীর্ঘ দেড় যুগ জুলুম-নির্যাতন সহ্য করে যাদের মন্ত্রী-এমপি হওয়ার কথা, তাদের অনেকেই প্রত্যাশিত মূল্যায়ন পাননি। আবার বিএনপি এবং মাঠের রাজনীতির সাথে সম্পর্ক ছিল না এবং কখনো রাজপথে দেখা যায়নি, এমন অনেকেই মন্ত্রী-এমপি ও গুরুত্বপূর্ণ পদে বসে গেছেন। বিএনপি নেতাদের এমন পরিস্থিতিতে পড়তে হবে: কেউ কল্পনাও করেননি। দীর্ঘ প্রায় দেড় যুগ পর জনগণের ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত জাতীয় সংসদ অধিবেশন চলছে। যেখানে জনপ্রত্যাশা নিয়ে যে আলোচনা হওয়ার কথা, সেটি হচ্ছে না। ফ্রান্স থেকে উড়ে এসে ড. ইউনূস যেমন অন্তর্বর্তী সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদ-পদবিতে বিদেশি নাগরিকদের হায়ারে এনে বসিয়েছিলেন; বিএনপিও দলীয় মনোনয়ন থেকে শুরু করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে তেমনি হায়ারি প্লেয়ারদের আধিক্য। আবার নির্বাচনের পর রাজনীতিকে স্থিতিশীল রূপ দিতে বিরোধী দল জামায়াত নারাজ। সংসদে বিরোধী দল জামায়াত নির্বাচিত নতুন সরকারকে ১০০ দিনের ‘হানিমুন পিরিয়ড’ও ছাড় দিচ্ছে না। অর্থনীতির বেহাল দশা, জ্বালানি, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট, কৃষকদের দুরবস্থা, মিলকারখানা স্বাভাবিকভাবে চলছে না, দ্রব্যমূলের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি: এসব নিয়ে বিরোধী দলের কোনো মাথাব্যথা নেই। তারা নিজেরা ক্ষমতা ভোগে বেশি ভাগ বসাতে সংবিধান সংশোধন, গণভোট, সংস্কার: ইত্যাদি নিয়ে সরকারবিরোধী আন্দোলনে নেমেছে। দীর্ঘ দুই যুগ বিএনপির অনুকম্পায় রাজনীতি করে জামায়াত এখন বিএনপি সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার হুঙ্কার দিচ্ছে। জনপ্রত্যাশা উপেক্ষিত হওয়ায় দেশের রাজনীতিতে অপ্রাসঙ্গিক আওয়ামী লীগ ক্রমেই প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে। রিফাইন্ড আওয়ামী লীগ ফিরছে: এমন শব্দ দরজায় কড়া নাড়ছে। আর প্রকাশ্যে দেখা যাচ্ছে এক ধরনের রাজনীতি, আর পর্দার আড়ালে দেখা যাচ্ছে উল্টো ¯্রােত।
৭ এপ্রিল হঠাৎ বোমা ফাটানো খবর গণমাধ্যমের শিরোনাম হয়। সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীকে ধানমন্ডি থেকে গ্রেফতার। তার বিরুদ্ধে হত্যামামলাসহ একাধিক মামলা। আদালত তাকে রিমান্ডে না দিয়ে কারাগারে পাঠিয়ে দেন। ১২ এপ্রিল তাকে জামিন দেয়া হয় এবং কয়েক ঘণ্টা পর কারাগার থেকে তাকে মুক্তি দেয়া হয়। এমনি একজন আওয়ামী লীগের নেতা সাবেক মন্ত্রী সাবের হোসেন চৌধুরীকে এক দিনে ছয়টি মামলায় জামিন নিয়ে মুক্তি দেয়া হয়। অথচ একই মামলায় আওয়ামী লীগের শত শত সাবেক মন্ত্রী-এমপি, নেতা দীর্ঘদিন থেকে কারাগারে। রহস্য কি? রহস্য আর কিছু নয়: শিরীন শারমিন চৌধুরী ও সাবের হোসেন চৌধুরীদের নেতৃত্বে দেশের রাজনীতিতে রিফাইন্ড আওয়ামী লীগ সক্রিয় করা। নির্বাচিত বিএনপি সরকারের অদূরদর্শী কর্মকা- ও জাতীয় সংসদে বিরোধী দল জামায়াতের জনপ্রত্যাশিত ভূমিকার বদলে রাজপথে আন্দোলন করে সরকারকে ফেলে দেয়ার হুমকি এবং সাহসী ও লোভাতুর এনসিপি নেতাদের আবারো অভ্যুত্থান ঘটানোর হুঙ্কারে যে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা চলছে; সে সুযোগ নিতে চায় রাজনৈতিক কর্মকা- নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ। মূলত আওয়ামী লীগ আসন্ন স্থানীয় নির্বাচনে (সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, জেলা পরিষদ, উপজেলা, ইউনিয়ন পরিষদ) নেতাকর্মী-সমর্থকদের সক্রিয় করে তোলার মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।
সূত্রের দাবি, ভারতে থেকেই কম বিতর্কিত নেতাদের দিয়ে রিফাইন্ড আওয়ামী লীগ পরিচালনার চেষ্টা হচ্ছে। এতে শত শত কোটি টাকা ব্যয় করা হবে। ইতোমধ্যেই সোশ্যাল মিডিয়ায় হাজার হাজার কনটেন্ট ক্রিয়েটরকে নামানো হয়েছে রিফাইন্ড আওয়ামী লীগের পক্ষে জনমত গঠনে। নামে-বেনামে যারা আওয়ামী লীগের নিষ্ক্রিয় নেতাদের সক্রিয় করে তুলবেন, তাদের বিপুলভাবে অর্থায়ন করা হবে। দেশের আওয়ামী লীগ অনুগত ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের বড় একটি অংশ আওয়ামী লীগকে আর্থিক সহায়তা করতে প্রস্তুতি নিচ্ছে। ইতোমধ্যেই এস আলমের প্রতিষ্ঠান ফাস্ট কমিউনিকেশন লি: থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্তে ব্যাংক রেজ্যুলেশনের মাধ্যমে একীভূত হওয়া পাঁচ ব্যাংক নিয়ে গঠিত ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ আবারো এস আলমের হাতে তুলে দেয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আওয়ামী লীগের বিভিন্ন জেলা কার্যালয়ের তালা খোলা হচ্ছে। ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের পরের দিন পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁওয়ে আওয়ামী লীগের অফিসের তালা খুলে দিয়েছে বিএনপির স্থানীয় নেতার উপস্থিতিতে। এখন পর্যন্ত প্রায় ৩০ জেলার বিভিন্ন উপজেলা পর্যায়ে আওয়ামী লীগের অফিস খুলেছে। গত ৭ মার্চ শেখ মুজিবের ভাষণ বাজানো হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে ফুল দিতে গিয়ে গ্রেফতার ও পরে মুচলেকা দিয়ে জামিন পেয়েছেন। ২৬ মার্চেও শেখ মুজিবের প্রতিকৃতিতে ফুল দেয়া হয়েছে।
সন্ত্রাসী কার্যক্রমে জড়িত কোনো সংগঠনের যাবতীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার বিধান যুক্ত করে ২০২৫ সালের ১১ মে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) অধ্যাদেশ অনুমোদন করেছে জাতীয় সংসদ। ওই অধ্যাদেশের বলে অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছিল। ওই অধ্যাদেশকে আইনে রূপ দিয়ে ৮ এপ্রিল জাতীয় সংসদে বিল পাসের ফলে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ-সংগঠনগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকল। এ আইন পাসের পর দিল্লিতে পলাতক শেখ হাসিনা দলের নেতাকর্মীদের বার্তা দিয়েছেন: আওয়ামী লীগের ব্যানারে না হলেও যেখানে সেভাবে হোক, পেশাজীবী, সংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠনের ব্যানারে হলেও মুজিববাদী নেতাকর্মীদের সক্রিয় করে তুলতে হবে। যেখানে যারা দায়িত্ব পালন করবেন তাদের আগামীতে সেখানে গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বে বসানো হবে। হাসিনার এ ঘোষণার পর বিভিন্ন পেশাজীবী সক্রিয় হয়ে উঠছেন। আইনজীবীরা তাদের আসন্ন নির্বাচনে সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় মুজিববাদীদের উপস্থিতি ব্যাপকহারে বেড়ে গেছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় আওয়ামী লীগ নেতা ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নেতাদের ভেরিফায়েড পেজগুলো সক্রিয় উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে।
আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষক সাংবাদিক মাহবুব কামাল বলেছেন, ‘দেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তন কেউ ঠেকাতে পরবে না। শেখ হাসিনা যখন বিএনপিকে খ--বিখ- করার চেষ্টা করেছেন, তখনো বলেছি: বিএনপিকে ধ্বংস করা সম্ভব নয়। শেখ মুজিবের নামে আওয়ামী লীগ ও জিয়াউর রহমানের নামে বিএনপি আগামী শত বছর টিকে থাকবে। ড. ইউনূসের একের পর এক ব্যর্থতার কারণে আওয়ামী লীগের প্রতি মানুষে সহানুভূতি সৃষ্টি হয়েছে। জুলাই অভ্যুত্থানের তিন মাসের মধ্যে যদি নির্বাচন দেয়া হতো: জনগণ আওয়ামী লীগকে প্রত্যাখ্যান করত। নিষিদ্ধের প্রতি মানুষের আকর্ষণ বেশি। আওয়ামী লীগ ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলে এক সময় দলটি দাঁড়িয়ে যাবে।’
রিফাইন্ড আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তন ক্ষেত্র প্রসঙ্গে রাজনৈতিক বিশ্লেষক সিনিয়র সাংবাদিক এম এ আজিজ বলেছেন, ‘হাসিনা ও তার মন্ত্রী-এমপিরা পালালেও দলটির কোটি কোটি কর্মী-সমর্থক দেশে রয়ে গেছেন। তারা মনে করছেন, বিগত ২০ মাস ধরে নির্যাতিত হচ্ছেন। রাজনৈতিকভাবে কিছুটা পরিচিত এবং ক্লিন ইমেজের কোনো নেতানেত্রী নেতৃত্বে এলে তাদের পেছনে আওয়ামী লীগের সারা দেশের নেতাকর্মী দাঁড়িয়ে যাবে। বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রবর্তনের পর শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান কখনো আওয়ামী লীগকে সক্রিয় হতে বাধা দেননি। তেমিন তারেক রহমানও আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কর্মকা-ে বাধার সৃষ্টি করবেন না; বরং জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকে জাতীয় সংসদের বিরোধী দল হওয়ার পরও জামায়াত অতি বাড়াবাড়ি করেছে। ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের আগে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছিল। তাই মানুষ আত্মরক্ষার্থে জামায়াতকে ঠেকাতে অনিচ্ছা সত্ত্বেও নাকে রুমাল দিয়ে বিএনপিকে ভোট দিয়েছে। মানুষ যাই করুক, স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি জামায়াতের আস্ফালন সহ্য করবে না। মধ্যপন্থি জাতীয়তাবাদী দল হিসেবে বিএনপিকে রাজনীতি করতে হবে। এখনো বিএনপিতে ২০ শতাংশ গুপ্ত জামায়াত রয়ে গেছে। জামায়াতের কর্মকা-ই দেশে বিরোধী দলের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগকে অপরিহার্য করে তুলছে।’
এদিকে জুলাই অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেয়া এনসিপি নেতারা সংসদে ও সংসদের বাইরে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করলেও পর্দার আড়ালে আওয়ামী লীগ নেতাদের সাথে তারা যোগাযোগ রক্ষা করছেন। সম্প্রতি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র মনজুর আলমের বাসায় গিয়ে ধরা খান এনসিপির নেতা কুমিল্লা-৪ আসনের এমপি হাসনাত আবদুল্লাহ। সংসদে প্রায় প্রতিদিন আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিলেও তিনি আওয়ামী লীগ নেতার বাসায় দুপুরের খাবার খেয়ে বৈঠক করায় চট্টগ্রামের জুলাইযোদ্ধাদের ঘেরাওয়ের কবলে পড়েন। বিক্ষুব্ধ জনতার ঘেরাও থেকে পুলিশ তাকে রক্ষা করে এবং আওয়ামী লীগ নেতার বাসায় গিয়ে ধরা খাওয়ায় তিনি ‘খামোশ’। এনসিপি থেকে প্রচার করা হয়: ব্যক্তিগত কারণে তিনি সেখানে গেলে বিএনপি ও ছাত্রদলের নেতারা তাকে ঘেরাও করে। কিন্তু এনসিপির ছাত্র সংগঠন জাতীয় ছাত্রশক্তির নেতা আবদুল বাকের মজুমদার ফেসবুক পোস্টে হাটে হাড়ি ভেঙে দেন। তিনি জানান, ‘আগামী সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মনজুর আলমকে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে এনসিপির মেয়র প্রার্থী করতেই হাসনাত আবদুল্লাহ দেনদরবার করেছেন। বিএনপি এটি বুঝতে পেরে তাকে ঘেরাও করে।
এর আগে এনসিপি ১২টি সিটি করপোরেশনের বেশির ভাগেই দলীয় মেয়র প্রার্থী ঘোষণা করেছে। মূলত আগামীতে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বিএনপির বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রার্থী দিতেই আওয়ামী লীগের স্থানীয় পর্যায়ের নেতাদের সাথে যোগাযোগ করছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক নেতা জানান, আগামীতে স্থানীয় নির্বাচনে জামায়াত-এনসিপি মিলে বিএনপি প্রার্থীর বিরুদ্ধে শক্ত প্রার্থী দিতেই আওয়ামী লীগ নেতাদের সাথে পর্দার আড়ালে সমঝোতা করছেন। অন্যদিকে রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে আওয়ামী লীগের নীতি নির্ধারকরাও চান স্থানীয় নির্বাচনে বিএনপিকে ঠেকাতে জামায়াত-এনসিপির সঙ্গে মিলে যেতে। স্থানীয় নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থীদের ঠেকাতে পারলে জামায়াত-এনসিপির বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে নামবে রিফাইন্ড আওয়ামী লীগ। তবে জামায়াত-এনসিপি-রিফাইন্ড আওয়ামী লীগের ত্রয়ী ঐক্য নিয়ে ক্ষমতাসীন বিএনপি এখনো উদাসীন। দীর্ঘ ১৮ বছর যারা মাঠের রাজনীতি করেছেন, জেল-জুলুম সহ্য করেছেন; নির্বাচন এবং নির্বাচনের পর তাদের বেশির ভাগকেই কোণঠাসা করায় তারা বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে মাঠের জামায়াতের রাজনীতি মোকাবিলা করতে নিরুৎসাহী।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির এক নেতা বলেন, ড. ইউনূস যেমন হায়ারে এনে সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে লোক বসিয়েছিলেন; বিএনপিও নির্বাচনে হায়ারে এনে অনেককে প্রার্থী করেছে এবং নির্বাচনের পর সরকারে দলের সাথে সম্পর্কহীন ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসিয়েছে। যা মাঠের নির্যাতিত নেতানেত্রীরা ভালোভাবে নিতে পারছেন না। তাছাড়া অনেকেই মনে করেন, চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানের পর এবং ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগে এবং ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অধিবেশন শুরুর পর থেকে জামায়াতে ইসলাম যা করছে, তাতে মানুষ ত্যক্তবিরক্ত। অনেকেই মনে করেন, স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি জামায়াতের আস্ফালন সহ্য করার চেয়ে স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি গণবিরোধী রাজনৈতিক শক্তি রিফাইন্ড আওয়ামী লীগের কার্যক্রম মেনে নেয়া ভালো। গতকালও জামায়াতের নেতৃত্বে গঠিত ১১ দলীয় জোট বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে রাজপথে দ্বিতীয় ধাপে ১৫ দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। ১৮ এপ্রিল থেকে ২ মে পর্যন্ত এ কর্মসূচি ঘোষণা করেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী, ২৫ এপ্রিল দেশের সব বিভাগীয় শহরে গণমিছিল আর ২ মে প্রতিটি জেলায় ১১ দলীয় জোটের উদ্যোগে গণমিছিল কর্মসূচি পালন করবে। এছাড়া মাঝের দিনগুলোতে বিভাগীয় শহর ও গুরুত্বপূর্ণ জেলায় গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে সেমিনার ও লিফলেট বিতরণ করা হবে।
জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. নূরুল আমিন ব্যাপারী বলেন, ‘আওয়ামী লীগ ফিরে এলে বিএনপি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কোনোভাবেই আওয়ামী লীগকে ফিরে আসতে দেয়া উচিত নয়। আওয়ামী লীগের অপরাধীরা বিচারের মাধ্যমে বের হলে কারো করার কিছু নেই। সামনে সিটি করপোশেন নির্বাচন। আওয়ামী লীগ যদি ফিরে আসার বাতাস উঠে: তাহলে সিটি করপোরেশন নির্বাচনে হিন্দুরা বিএনপিকে ভোট দেবে না। জামায়াতের বিরুদ্ধে ওই ভোটগুলো না পেলে স্থানীয় নির্বাচনে বিএনপির ডিজাস্টার ঘটে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আর জামায়াত-এনসিপি প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগ ও ভারতের বিরোধিতা করলেও আসন্ন স্থানীয় নির্বাচনে পর্দার আড়ারে গোপন চুক্তির মাধ্যমে বিএনপির বিরুদ্ধে একাট্টা হয়ে লড়াই করলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। যে জামায়াত নির্বাচনে বিজয়ী হতে ‘রোজা আর পূজাকে এক মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ’ প্রচার করে হিন্দু ভোট পেতে পূজাম-পে ছুটে যায়, তাদের পক্ষে স্থানীয় নির্বাচনে জিততে আওয়ামী লীগের ভোট পেতে পর্দার আড়ালে সব কিছুই করা সম্ভব।’
জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার গঠনের পর দুই মাস যেতে না যেতেই বিরোধিতার নামে জামায়াতের রাজপথের আন্দোলন কর্মসূচি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার বদলে গোটা রাজনীতিকেই যেন আনপ্রেডিক্টেবল করে তুলেছে।