দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে রক্ত পরীক্ষায় ব্যবহৃত স্ক্রিনিং কিটের তীব্র সংকটের কারণে মারাত্মক জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। সরকারিভাবে সরবরাহ বন্ধ থাকায় হাসপাতালগুলো নিম্নমানের স্থানীয় কিট ব্যবহার করছে, যা ভুল রিপোর্ট দিচ্ছে। ফলে এইচআইভি/এইডস, হেপাটাইটিস-বি, সি এবং সিফিলিসের মতো সংক্রামক রোগ নীরবে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
গত ১৬ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের একটি হাসপাতালে থ্যালাসেমিয়া রোগীর শরীরে হেপাটাইটিস শনাক্ত হওয়ার পর শুরু হয় অনুসন্ধান। চিকিৎসকদের সন্দেহ ছিল রক্ত সঞ্চালনের মাধ্যমেই সংক্রমণ ঘটেছে। পরে গত ছয় মাসে যেসব দাতা ওই রোগীকে রক্ত দিয়েছেন, তাদের পরীক্ষা করে একজন হেপাটাইটিস পজিটিভ শনাক্ত হয়। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, নিম্নমানের স্ক্রিনিং কিট ব্যবহারের কারণেই এ সংক্রমণ ধরা পড়েনি। একই ধরনের আরেকটি ঘটনা ঘটে ফেনীতে। সিজারিয়ান অপারেশনের সময় রক্ত নেওয়া এক নারী ছয় মাস পর হেপাটাইটিস সি পজিটিভ হিসেবে শনাক্ত হন।
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগে সরকারিভাবে ‘অ্যাবোর্ট’-এর কিট সরবরাহ করা হতো, যা ছিল মানসম্পন্ন। কিন্তু বর্তমানে স্থানীয়ভাবে যেগুলো কেনা হচ্ছে সেগুলো অতি নিম্নমানের এবং মানহীন। সব রক্তের নমুনায় রিপোর্ট নেগেটিভ দেখায়। এমনকি পরীক্ষামূলকভাবে নিশ্চিত পজিটিভ এক রোগীর নমুনা এই কিটে দিয়ে নেগেটিভ ফল পাওয়া গেছে। সর্বশেষ সরকারিভাবে ‘কিউ ডিটেক্ট’ নামের একটি কোম্পানির ডিভাইস সরবরাহ করা হয়েছিল ২০২৩ সালে। এরপর আর কোনো সরবরাহ নেই। এফডিএ নীতিমালার কারণে আমেরিকান কোম্পানি অ্যাবোর্ট ডিভাইস উৎপাদন বন্ধ করে দেয় বেশ কয়েক বছর আগে। এখন বাংলাদেশের বাজারে যা আসছে তার কিছু চীন থেকে, আর কিছু পার্শ্ববর্তী দেশে তৈরি।
তারা বলছেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে এইচএসএম অপারেশনাল প্ল্যানে একটি অনুষঙ্গ ছিল ‘নিরাপদ রক্ত পরিসঞ্চালন’। যেখান থেকে সারা দেশের ২০৭টি ব্লাড সেন্টারে নিয়েমিত ব্লাডব্যাগ, কিট ও রিএজেন্ট সরবরাহ করা হতো। কিন্তু অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে এই ব্যবস্থা বন্ধ করে দেয়। ফলে গত দুবছর ধরে সরকারিভাবে কোনো হাসপাতালে পরিসঞ্চালন সামগ্রী দেওয়া হয়নি। এতেই এই সংকট সৃষ্টি হয়েছে। দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে এসব রোগ নানাভাবে ছড়িয়ে পড়ে ভয়াবহ সংকট তৈরি করতে পারে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুসারে, দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে দৈনিক ছয় থেকে সাত হাজার রোগীর রক্তের নমুন পরীক্ষা হয়। এসব পরীক্ষা মূলত হয় পরিসঞ্চালনের উদ্দেশ্যে। এসব নমুন পরীক্ষা যদি ভুল হয় এবং হেপাটাইটিস বা এইচআইভির মতো সংক্রামক রোগের জীবাণু শরীরে থাকা সত্ত্বেও যদি নেগেটিভ ফল আসে, তাহলে রক্ত গ্রহীতা রোগী সুস্থ হওয়ার পরিবর্তে এসব রোগে আক্রান্ত হবেন। এমনকি তাদের মাধ্যমে আরও অনেক মানুষ আক্রান্তের ঝুঁকিতে থাকবে। এভাবেই এই রোগগুলো ছড়িয়ে পড়বে।
ঢাকার একটি ইনস্টিটিউটের একজন পরিসঞ্চালন বিশেষজ্ঞ বলেন, এইচএসএম ওপি থেকে সরকারি সব ব্লাড ব্যাংকে এক বছরের জন্য প্রয়োজনীয় কিটস, ডিভাইস, ব্লাড ব্যাগ ইত্যাদি সরবরাহ করা হতো। ২০২৩ সালে সরকারিভাবে যেগুলো সরবরাহ করা হয় ২০২৪ সালের জুন-জুলাই পর্যন্ত ব্যবহার করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন হাসপাতালে সেগুলো শেষ হতে শুরু করে। ২০২৫ সালে সব সরবরাহ শেষ হয়ে গেলে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। ওই সময় বারবার অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলেও ফল পাওয়া যায়নি।
আইন অনুযায়ী রক্ত পরিসঞ্চালনের জন্য পাঁচটি সংক্রামক রোগের স্ক্রিনিং করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এগুলো হলো—ম্যালেরিয়া, সিফিলিস, হেপাটাইটিস-বি, হেপাটাইটিস-সি ও এইচআইভি/এইডস। বর্তমানে স্ক্রিনিং বাবদ সরকারি হাসপাতালের নির্ধারিত ফি ৩৫০ টাকা। আগে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে সব হাসপাতালে প্রয়োজনীয় কিটস ও রিএজেন্ট সরবরাহ করা হতো। ফলে কখনো এ ধরনের সমস্যায় পড়তে হয়নি। কিন্তু গত আগস্টের পর থেকে সংকট শুরু হয়, যা বর্তমানে ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এখন বিভাগগুলোকে নিজস্ব অর্থায়নে এসব কিট কিনতে হচ্ছে।
ঢাকা ও চট্টগ্রামের দুই মেডিকেল কলেজের দুজন পরিসঞ্চালন বিশেষজ্ঞ জানান, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় বা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মতো বড় প্রতিষ্ঠানে রক্ত পরিসঞ্চালন বিভাগে অনেক পরীক্ষা হয়, ফলে সেখানে আয় বেশি। কিন্তু অপেক্ষাকৃত ছোট মেডিকেল কলেজগুলো বা জেলা হাসপাতালের পক্ষে বিভাগের আয়ের টাকায় এই ব্যয় বহন করা সম্ভব নয়। ফলে কম দামে স্থানীয় সরবরাহকারীদের কাছ থেকে নিম্নমানের কিট কিনতে বাধ্য হচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ বলেন, যেহেতু নকল পণ্য ছড়িয়ে পড়েছে, তাই আগের মতো কেন্দ্রীয়ভাবে কেনাকাটা করতে হবে। বর্তমান সরকার তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে জিডিপির ৫ শতাংশ স্বাস্থ্যে ব্যয় করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। আগামী বাজেটে সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হলে আগামী বাজেটের বরাদ্দ থেকে এই খাতে ব্যয় সহজ হবে। বাজেটের আগ পর্যন্ত নিরাপদ রক্ত পরিসঞ্চালনে থোক বরাদ্দ দিতে হবে।
রক্ত পরিসঞ্চালন আইন-২০০৮-এর ধারা ২৪ অনুসারে, হাসপাতালের রক্ত পরিসঞ্চালন কেন্দ্রে রক্ত পরিসঞ্চালন সেবার মাধ্যমে এবং ব্লাড গ্রুপিং, ক্রসম্যাচিং, স্ক্রিনিং এবং অন্যান্য পরীক্ষা-নিরীক্ষার ক্ষেত্রে কেবিন, পেয়িং বেড, জেনারেল ওয়ার্ড ও প্রাইভেট রোগী থেকে প্রাপ্ত অর্থ নিম্নরূপে প্রাপ্ত হবেন—স্থানীয় রক্ত পরিসঞ্চালন কেন্দ্রের রক্ত পরিসঞ্চালন তহবিল ৪৫ শতাংশ। জাতীয় নিরাপদ রক্ত পরিসঞ্চালন বিশেষজ্ঞ কমিটির তহবিল ৫ শতাংশ। রক্ত পরিসঞ্চালন কেন্দ্রের কর্মকর্তাগণ অধ্যাপক, ইনচার্জ বা সমপর্যায়ের কর্মকর্তারা সমভাবে ১২ শতাংশ। সহযোগী অধ্যাপক, সহকারী অধ্যাপক বা সমমানের কর্মকর্তারা সমভাবে ১০ শতাংশ। মেডিকেল অফিসার বা সমমানের কর্মকর্তারা সমভাবে ০৮ শতাংশ। তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীরা সমভাবে ১৪ শতাংশ এবং চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীরা সমভাবে ৬ শতাংশ।
রক্ত পরিসঞ্চালন আইন-২০০৮-এর ২৬(৮)-এ বলা হয়েছে, রক্তবাহিত রোগ নির্ণয়, রক্তের অন্যান্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও রক্ত সংরক্ষণ ইত্যাদি কাজের জন্য প্রয়োজনীয় পর্যাপ্ত রিএজেন্ট, কিটস ও রক্তব্যাগ ইত্যাদির সরবরাহ সরকার বা যথাযথ কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করবে। তবে জরুরি ক্ষেত্রে রিএজেন্ট, কিটস, রক্তের ব্যাগ ও ট্রান্সফিউশন সেট, ডিসপোজেবল সিরিঞ্জ, নিডল ও অন্যান্য সামগ্রী ক্রয়ের জন্য মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল বা ইনস্টিটিউট হাসপাতাল সর্বাধিক ১০ হাজার টাকা, জেলা হাসপাতাল ৭ হাজার টাকা ও অন্যান্য হাসপাতাল ৫ হাজার টাকা নগদ রাখতে পারবে এবং জরুরি প্রয়োজনে এসব সামগ্রী কেনা যাবে। উপধারা ১১-তে বলা হয়েছে, কমিটির সদস্য সচিব রক্ত পরিসঞ্চালন কেন্দ্রের জন্য জরুরি প্রয়োজনে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো রিএজেন্ট, যন্ত্রপাতি কেনা বা অন্য প্রয়োজনীয় খাতে রক্ত পরিসঞ্চালন তহবিল থেকে ব্যয় করতে পারবেন।
একজন পরিসঞ্চালন বিশেষজ্ঞ বলেন, পরিসঞ্চালনের জন্য রোগীদের কাছ থেকে ৩৫০ টাকা নিতে পারি। রক্তপরিসঞ্চালন আইন ও বিধি ২০০৮ অনুসারে এর ৪৫ শতাংশ পুনরায় ডিভাইস কিনতে ব্যবহার করা যাবে। সেই হিসাবে আমাকে ভ্যাট, ট্যাক্সসহ ১৫০ টাকায় সব কেনাকাটা করতে হয়। কারণ ব্লাডগ্রুপ রিএজেন্ট, টেস্টটিউব, সিরিঞ্জসহ যাবতীয় সামগ্রীর জন্য বরাদ্দ থাকে মাত্র ২৫ টাকা। তালিকায় অনেক পরীক্ষা আছে, তবে সেটা বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনির্ভাসিটি ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ছাড়া অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোতে হয় না। তাই বাকিদের আয় ৩৫০ টাকাই। পরিসঞ্চালনের সব পরীক্ষার কিট আগে সরকার কিনে দিত। তখন এই টাকায় অন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী কেনা সম্ভব ছিল। এখন আমরা পরীক্ষার কিট কিনেছি কিন্তু ব্যবহার করছি না।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. মুশতাক হোসেন বলেন, হাম থেকে শিক্ষা নিতে হবে। নিরাপদ রক্ত পরিসঞ্চালনে নির্ধারিত পাঁচটি সংক্রামক রোগের পরীক্ষা অবশ্যই করতে হবে। সেটা যদি না হয় তাহলে দেশ ভয়াবহ পরিণতির দিকে যাবে, যা কল্পনাতীত। এসব সংক্রামক রোগ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়বে। তিনি বলেন, ওপির মাধ্যমে দেশ স্বাস্থ্য সেবায় অনেক ভালো যেসব সার্ভিস পেতো সেগুলো বহাল রাখতে হবে। এক্ষেত্রে রাজস্ব খাত থেকে বরাদ্দ দিতে হবে। নয়তো সব সংক্রামক রোগ হামের মতো ছড়িয়ে পড়বে।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে নিরাপদ রক্ত পরিসঞ্চালন কাউন্সিলের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ডা. আসাদুল ইসলাম বলেন, সরকার ওপি বন্ধ করার মধ্য দিয়ে সেফ ব্লাড কর্মসূচি বন্ধ করে দিয়েছে। এমনকি সিএমএসডিতে (কেন্দ্রীয় ঔষধাগার) কিট, রিএজেন্ট বা ব্লাড ব্যাগ মজুত নেই। ফলে সারা দেশে সংকট তৈরি হয়েছে। এরই মধ্যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়ে জানালেও সেখান থেকে এ বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, স্ক্রিনিংয়ের পরীক্ষাগুলো করা না হলে সারা দেশে হেপাটাইটিস-বি/সি ও এইচআইভির মতো মারাত্মক সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়বে। এ সমস্যা সমাধানে একটি ন্যাশনাল ব্লাড সেন্টার করার প্রয়োজনীয়তার উল্লেখও করেন তিনি।