ফুটবল মাঠে লিওনেল মেসি ও ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা এক যুগেরও বেশি সময় ধরে বিশ্বজুড়ে আলোচনার বিষয়। ইউরোপ ছেড়ে একজন যুক্তরাষ্ট্রে, অন্যজন সৌদি আরবে যাওয়ার পর সেই লড়াই এখন অর্থনৈতিক দিক থেকেও নতুন মাত্রা পেয়েছে। একজন নিশ্চিত বিপুল বেতনের ওপর ভর করে আয় বাড়াচ্ছেন, অন্যজন তুলনামূলক কম বেতনের পাশাপাশি ব্যবসায়িক অংশীদারত্বের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি সম্পদ গড়ে তুলছেন। ফলে দুই কিংবদন্তির আয়ের ধরন ও কৌশলের পার্থক্য এখন ক্রীড়া অর্থনীতিতেও আলোচনার কেন্দ্রে।
বোলাভিপ–এ প্রকাশিত এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে দুই তারকার আয়ের ধরন ও ব্যবসায়িক কৌশলের পার্থক্য তুলে ধরা হয়েছে।
শুধু বেতন নয়, মেসির আয়ের বড় উৎস ব্যবসায়িক অংশীদারত্ব
২০২৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে লিওনেল মেসি ইন্টার মায়ামিতে যোগ দেন। তাঁর চুক্তির কাঠামো ছিল ইউরোপ বা সৌদি আরবের প্রচলিত চুক্তি থেকে ভিন্ন। নিশ্চিত বার্ষিক বেতন প্রায় ২ কোটি ৪০ লাখ মার্কিন ডলার হলেও বেতন, বোনাস ও অন্যান্য সুবিধা মিলিয়ে প্রতি মৌসুমে তাঁর মোট আয় প্রায় ৫ থেকে ৬ কোটি ডলারে পৌঁছায়।
মেসির সবচেয়ে বড় আর্থিক সুবিধা এসেছে চুক্তিতে থাকা বিশেষ ব্যবসায়িক শর্ত থেকে। ইন্টার মায়ামিতে যোগ দেওয়ার সময় তিনি এমন একটি চুক্তি করেন, যার আওতায় অ্যাপল টিভির এমএলএস সিজন পাস–এ নতুন গ্রাহক যুক্ত হলে সেখানকার আয়ের একটি অংশ তিনি পান। পাশাপাশি অ্যাডিডাস–এর তৈরি তাঁর অফিসিয়াল পণ্যের বিক্রি থেকেও রয়্যালটি পান।
মেজর লিগ সকার প্লেয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন (এমএলএসপিএ)–এর প্রকাশিত বেতন-তথ্য অনুযায়ী, এমএলএসের ইতিহাসে সর্বোচ্চ মূল বেতন পাওয়া খেলোয়াড় এখন মেসি।
এ ছাড়া ফোর্বস–সহ একাধিক আন্তর্জাতিক আর্থিক বিশ্লেষণমাধ্যম জানিয়েছে, মেসির চুক্তিতে অবসর নেওয়ার পর ইন্টার মায়ামির মালিকানার অংশ কেনার সুযোগও রাখা হয়েছে। ভবিষ্যতে ক্লাবটির মূল্য বাড়লে এই অংশীদারত্ব তাঁর সম্পদের পরিমাণ আরও বাড়াতে পারে।
সৌদি ফুটবলে রোনালদোর জন্য অর্থের বিশাল ভাণ্ডার
২০২৩ সালের শুরুতে সৌদি আরবের ক্লাব আল-নাসরে যোগ দেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। এরপর থেকে বেতন ও বিভিন্ন বোনাস মিলিয়ে তিনি বিপুল অঙ্কের অর্থ আয় করছেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আল-নাসরে যোগ দেওয়ার পর থেকে রোনালদো প্রায় ৬৭ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলার আয় করেছেন।
ক্যাপোলজি–এর তথ্য অনুযায়ী, রোনালদো প্রতি মৌসুমে প্রায় ২০ কোটি ইউরো নিট আয় করেন। এই আয়ের কারণেই তিনি বর্তমানে বিশ্বের সর্বোচ্চ পারিশ্রমিক পাওয়া ক্রীড়াবিদদের অন্যতম।
সৌদি আরব শুধু তাঁকে বড় অঙ্কের পারিশ্রমিকই দিচ্ছে না, বরং তাঁকে কেন্দ্র করেই আন্তর্জাতিক তারকাদের সৌদি প্রো লিগে আনার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। এই প্রকল্পের অন্যতম চালিকাশক্তি দেশটির পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড (পিআইএফ)।
মাঠের বাইরেও রোনালদোর নিজস্ব ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য রয়েছে। সিআর৭ ব্র্যান্ডের অধীনে তাঁর হোটেল, জিম, পোশাক ও সুগন্ধির ব্যবসা থেকে প্রতি বছর উল্লেখযোগ্য আয় আসে।
দুই তারকার দুই ভিন্ন কৌশল
দুই কিংবদন্তির আয়ের ধরন তুলনা করলে স্পষ্ট হয়, ক্যারিয়ারের শেষ পর্যায়ে তাঁরা সম্পদ বৃদ্ধির জন্য ভিন্ন পথ বেছে নিয়েছেন।
রোনালদো নিশ্চিত উচ্চ বেতন ও বোনাসভিত্তিক মডেলে এগিয়েছেন। অন্যদিকে মেসি তুলনামূলক কম বেতন গ্রহণ করলেও ব্যবসায়িক অংশীদারত্ব, ব্র্যান্ড মূল্য এবং ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের সুযোগকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন।
তবে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা ৬৭ কোটি ৫০ লাখ ডলার (রোনালদো) এবং ২১ থেকে ২৪ কোটি ডলার (মেসি) আয়ের হিসাব স্বাধীনভাবে সব আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান নিশ্চিত করেনি। কারণ দুই তারকার ব্যক্তিগত বোনাস, বাণিজ্যিক চুক্তি ও বিভিন্ন আয়-উৎসের পূর্ণাঙ্গ তথ্য সর্বজনীন নয়। তবে বেতন কাঠামো, এমএলএসপিএর তথ্য এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক বিশ্লেষণগুলো থেকে এটি স্পষ্ট যে, ক্লাব থেকে সরাসরি পাওয়া অর্থের দিক থেকে রোনালদো এগিয়ে থাকলেও, মেসির ব্যবসায়িক অংশীদারত্ব দীর্ঘমেয়াদে তাঁর সম্পদের মূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে পারে।