Image description

সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনে বাংলাদেশি জাহাজের উপস্থিতি বাড়ছে। বিদেশি জাহাজের নির্ভরতা কমিয়ে এখন বিশ্ব জুড়ে পণ্য ভাসিয়ে নিচ্ছে দেশের ১০৮ বাণিজ্যিক জাহাজ। ইউরোপ-আমেরিকা থেকে চট্টগ্রাম। মধ্যপ্রাচ্য থেকে আফ্রিকা। নীল সমুদ্রের সব রুটেই পণ্য পরিবহন করছে লাল-সবুজের জাহাজের বহর। অর্থাৎ, আন্তর্জাতিক সমুদ্রসীমায় বাংলাদেশি পতাকাবাহী জাহাজের মিছিল বাড়ছে দিন দিন।

১০১টি জাহাজের মালিক দেশের বেসরকারি উদ্যোক্তা। বাকি সাত জাহাজ সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি)। বাল্ক (খোলা পণ্যবাহী), কনটেইনার ও গ্যাস-তেল ট্যাংকার মিলিয়ে এসব জাহাজে একসঙ্গে ৫৬ লাখ টন পণ্য বহন করা যায়। জাহাজ পরিচালনায় যুক্ত ২ হাজার ৭০০ থেকে ৪ হাজার বাংলাদেশি নাবিক। দেশীয় জাহাজে দেশি-বিদেশি পণ্য পরিবহন বাবদ বছরে দুই বিলিয়ন ডলার (প্রতি ডলার ১২৫ টাকা) বা ২৫ হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আসছে।

জাহাজে সব ধরনের পণ্য পরিবহন বাবদ ১৫ বিলিয়ন ডলার (১ লাখ ৮৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা) প্রতি বছর ভাড়া গুনতে হয়। বিশাল এ বাজার বিদেশি মালিকানাধীন জাহাজ থেকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে  আনতে পারলে তৈরি পোশাক শিল্পের পরেই এ খাতের অবস্থান দাঁড়াবে। কিন্তু দেশের বড় সংকট হলো সরকারের নীতিকৌশল। দীর্ঘমেয়াদে ব্যবসা করতে হলে দরকার সহজ ও উদার নীতি, যা আকৃষ্ট করবে দেশি উদ্যোক্তাদের।

তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর ওয়েবসাইটে ৩৯ বিলিয়ন ডলারের কথা উল্লেখ থাকলেও এর প্রথম সহসভাপতি সেলিম রহমান বলেছেন, ‘এখন রপ্তানি হচ্ছে ৪২ বিলিয়ন ডলার। এ রপ্তানি আয়ের বিপরীতে ৭৫ শতাংশ কাঁচামাল আমদানিতে চলে যেত। কিন্তু আশার কথা হচ্ছে, ৭৫ শতাংশের মধ্যে এখন অর্ধেকই দেশে উৎপাদন হচ্ছে কাঁচামাল।’

তার মানে সমীকরণ দাঁড়াচ্ছে, তৈরি পোশাক খাত থেকে প্রকৃত বৈদেশিক মুদ্রা আয় আনুমানিক ৩ লাখ ২৮ হাজার কোটি টাকা।

এটি এখনো পর্যন্ত দেশের প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত। বছরে সমুদ্রপথে বাংলাদেশে আমদানি-রপ্তানি পণ্য পরিবহন হয় ১৩ কোটি টন। বাংলাদেশি ১০৮টি জাহাজ এ পণ্যের মাত্র ১২ শতাংশ পর্যন্ত পণ্য পরিবহনে সক্ষমতা রাখে। বাকি পণ্য বিদেশি জাহাজে আনা-নেওয়া হয়।

২০১০ সালেও বাংলাদেশের বহরে ছিল মাত্র ৩৫টি জাহাজ। ২০১৯ সালে ‘বাংলাদেশ পতাকাবাহী জাহাজ (সুরক্ষা) আইন’ পাস হয়। এরপর বিদেশ থেকে বাণিজ্যিক পণ্য পরিবহনে দেশীয় জাহাজকে অগ্রাধিকার নীতি কার্যকর করে সরকার। এ সুযোগ পেয়েই কেএসআরএম, মেঘনা ও আকিজ গ্রুপের মতো বড় বেসরকারি শিল্পগোষ্ঠীগুলো জাহাজের বহর বাড়াতে শুরু করে। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৩ সালের মধ্যেই নিবন্ধিত জাহাজ ১০০টির মাইলফলক স্পর্শ করে! প্রতিটি জাহাজের ধারণক্ষমতা ৫৫ হাজার থেকে ১ লাখ টন।

বাংলাদেশ ওশান গোয়িং শিপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন সভাপতি ও ইস্ট কোস্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজম জে চৌধুরী জানালেন, সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় জাহাজ ব্যবসার এ সম্প্রসারণ। তৈরি পোশাক শিল্পের পর দ্রুত বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের এক নতুন দুয়ার হলো এ জাহাজ ব্যবসা। এতে সরকার ২০৩০ সাল পর্যন্ত ট্যাক্স মওকুফের সুযোগ দিয়েছে। তাই একলাফে এত জাহাজে বিনিয়োগ করেছে উদ্যোক্তারা। এ খাতের আয় ও নাবিকের বেতন বাবদ বছরে বৈদেশিক মুদ্রা আসে দুই বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

নিজেদের পণ্য পরিবহনের সফলতার পর দেশীয় জাহাজ মালিকরা এখন আন্তর্জাতিক পণ্য পরিবহনেও ভূমিকা রাখছে। ফলে বড় শিল্পগোষ্ঠীর মধ্যে চলছে জাহাজ বাড়ানোর এক অলিখিত প্রতিযোগিতা। বেসরকারি খাতে সমুদ্রগামী শিপিং ব্যবসার পথিকৃৎ চট্টগ্রামের কেএসআরএম গ্রুপ। ২০০৯ সালে তারা জাহাজ কেনা শুরু করে। দেড় দশক ধরে ধাপে ধাপে বহর বাড়ায় তারা। এরপর অনেক বছর এককভাবে শীর্ষে অবস্থান করেছিল। তাদের জাহাজ সংখ্যা এখন ২৭।

দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠান মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ (এমজিআই) সমুদ্রগামী জাহাজ ব্যবসায় শুরু করে অনেক পরে, ২০১৯ সালে। তাদের দ্রুত ও সুদূরপ্রসারী বিনিয়োগ কৌশল পুরো খাতের সমীকরণ বদলে দেয়। সাত বছরে প্রতিষ্ঠানটি কেএসআরএমকে ছুঁয়ে ফেলে। এখন এ দুই শিল্প গ্রুপের বহরে জাহাজ আছে ২৭টি করে ৫৪টি। নতুন ও সবচেয়ে আধুনিক জাহাজ নিয়ে এগিয়ে আছে মেঘনা গ্রুপ। শুধু তাই নয়, নিবন্ধনের অপেক্ষায় থাকা জাহাজ যুক্ত হলে মেঘনা গ্রুপ তালিকার শীর্ষে পৌঁছে যাবে। তাদের একটি জাহাজ অনুমতির অপেক্ষায়। আরও তিনটি পাইপলাইনে। আগামী কয়েক মাসেই ৩১টি জাহাজের মালিক হবে এমজিআই।

মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের (এমজিআই) চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল বললেন, ‘এ খাত যে সম্ভাবনাময় সেটি সরকারকে বোঝাতে আমাদের সাত-আট বছর লেগেছে। এখন দেশের দুটি শিল্প গ্রুপের কাছেই অর্ধেক জাহাজ। অন্য শিল্প গ্রুপ এগিয়ে এলে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পথ আরও সুগম হবে। বাংলাদেশে মাত্র ১০৮টি জাহাজ রয়েছে। অথচ ইন্দোনেশিয়ায় জাহাজ সাড়ে ১১ হাজার। আন্তর্জাতিক সমুদ্র পরিবহন ব্যবসার বিপুল সম্ভাবনা কাজে লাগাতে বিনিয়োগ উদ্যোক্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে নীতিকৌশল আরও সহজ করা দরকার সরকারের।’

ডেটাভিত্তিক ওয়েবসাইট ভিজুয়াল ক্যাপিটালিস্টের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে বাণিজ্যিক নৌবহরের তালিকায় সবার ওপরে রয়েছে ইন্দোনেশিয়া। তাদের জাহাজ সংখ্যা ১১ হাজার ৪২২টি। এরপরই চীনের অবস্থান। তাদের রয়েছে ৮ হাজার ৩১৪ জাহাজ। তৃতীয় অবস্থানে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ পানামা। তাদের বহরে জাহাজ ৮ হাজার ১৭৪। চতুর্থ অবস্থানে এশিয়ার আরেক দেশ জাপান। তাদের কাছে জাহাজ আছে ৫ হাজার।

জাহাজ নিবন্ধনের সরকারি প্রতিষ্ঠান ‘রেজিস্ট্রার অব বাংলাদেশ শিপস’-এর প্রধান কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন শেখ জালাল উদ্দিন গাজী বলেছেন, ‘নিবন্ধনের অপেক্ষায় থাকা আরও তিনটি জাহাজ যোগ হলে মেঘনা গ্রুপ তালিকার শীর্ষে উঠে আসবে। তাদের জাহাজগুলো নতুন ও আধুনিক হওয়ায় আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনে বিশ্ববাজারে দ্রুত ভাড়া (চার্টার) পায়। এতে জ্বালানি খরচ কম পড়ে। আন্তর্জাতিক সমুদ্র নিরাপত্তার মানদণ্ড পূরণ হওয়ায় তারা বেশি বাণিজ্যিক সুবিধা পায়।’

নৌপরিবহন অধিদপ্তরের তালিকা অনুযায়ী, বাংলাদেশি পতাকাবাহী জাহাজের অর্থনৈতিক (ইকোনমিক লাইফ) গড় বয়স ১৭ বছর। মেঘনা গ্রুপের ২৭টি জাহাজের গড় বয়স প্রায় ১০ বছর। এই গ্রুপের বহরে ২০২০ সাল বা তার পরে নির্মিত অত্যাধুনিক জাহাজের সংখ্যা ১৫টির বেশি। বহরে থাকা চারটি জাহাজ ২০২২ ও ২০২৩ সালে নির্মিত।

অন্যদিকে, কেএসআরএম গ্রুপের জাহাজের গড় বয়স সাড়ে ১৬ বছর। তাদের বহরে ২০০২ থেকে ২০০৮ সালের তৈরি জাহাজের সংখ্যা বেশি। কেএসআরএম গ্রুপের ২৭ জাহাজের মোট পণ্য পরিবহন ক্ষমতা ১৫ লাখ ৩৪ হাজার টন। আর মেঘনা গ্রুপের ২৭টি জাহাজের সম্মিলিত পরিবহন ক্ষমতা ১৫ লাখ ১৫ হাজার টন। কেএসআরএম গ্রুপের বহরে সবই বাল্ক (খোলা পণ্যবাহী) জাহাজ। মেঘনা গ্রুপের বহরে ২৫টি খোলা পণ্যবাহী, ২টি তেল-গ্যাস পরিবহন করে।

ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতায় এ দুই শিল্প গ্রুপের ঠিক পরেই অবস্থান আরেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান আকিজ গ্রুপ। ২০১০ সালে একটি পুরনো জাহাজ কিনে ব্যবসা শুরু করে। ১৬ বছরে তাদের বহরে ১১টি খোলা পণ্যবাহী জাহাজ যুক্ত হয়েছে।

বাংলাদেশে দেশীয় পতাকাবাহী কনটেইনার জাহাজ আছে শুধু বনেদি শিপিং ব্যবসায়ী সাবের হোসেন চৌধুরীর। তার এইচআর লাইনসের বহরে আছে আটটি জাহাজ। কনটেইনার পণ্য পরিবহনে একক আধিপত্য ধরে রেখেছে তারা। যার সবই সিঙ্গাপুর-কলম্বো-চট্টগ্রাম রুটে পণ্য পরিবহন করছে।

এ ছাড়া সাতটি খোলা পণ্যবাহী জাহাজ পরিচালনা করছে ভ্যানগার্ড। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বিএসসির বহরে বর্তমানে সচল রয়েছে সাতটি জাহাজ। এর মধ্যে চারটি খোলা পণ্যের ও তিনটি তেল বহনকারী ট্যাংকার।

সিমেন্ট খাতের শীর্ষ প্রতিষ্ঠান ক্রাউন সিমেন্টের বহরে রয়েছে তিনটি বাল্ক ক্যারিয়ার। হানিফ মেরিটাইমের বহরে তিনটি খোলা পণ্যবাহী জাহাজ। ডরিয়া শিপিংয়ের দুটি অয়েল ট্যাংকার। আজম জে চৌধুরীর ‘এমজেএল বাংলাদেশ’র বহরে রয়েছে সবচেয়ে বড় তিনটি তেল ট্যাংকার। একটি করে জাহাজ রয়েছে বসুন্ধরা, প্যাসিফিক, ডেল্টা, আবুল খায়ের, এএমএস লজিস্টিকস, পিনন, সানশাইন, পিএইচ, টিকে ও ডরিন শিপিংয়ের। কেএসআরএম ও এমজিআই বাদে বেসরকারি ১৬টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ৫৪টি জাহাজ পণ্য পরিবহনে যুক্ত আছে।

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম চেম্বার সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক এবারের ঘোষিত বাজেটের পর এক প্রজ্ঞাপনে হতাশ হয়ে বললেন, ‘আগের বাজেটে ২৫ বছরের পুরনো জাহাজ আমদানির সুযোগ ছিল, ১০ বছর আগে বিক্রির কোনো সুযোগ ছিল না। এবার ১০ বছরের বেশি পুরনো জাহাজ আমদানি করা যাবে না। আনার পর পঁাচ বছর পর্যন্ত বিক্রির সুযোগ রাখা হয়েছে। এমন কঠিন শর্তে উদ্যোক্তারা আগ্রহ হারাতে পারেন।’