Image description

দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লেও পরিস্থিতি কোনোভাবেই সংঘাতমুখী হোক— এমনটি চায় না সরকার ও ক্ষমতাসীন দল বিএনপি। তাই কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত নেতাকর্মীদের স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে— কোনো উসকানিতে পা দেওয়া যাবে না, ধৈর্য ও সংযম বজায় রাখতে হবে। একই সঙ্গে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে না দেখে এর নেপথ্যে কোনো বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিকল্পনা রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখছেন সরকারের নীতিনির্ধারকরা।

ক্ষমতাসীনদের ভাষ্য, জাতীয় সংসদে অন্যতম বিরোধী দল হিসেবে জাতীয় নাগরিক পার্টিকে (এনসিপি) প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক মর্যাদা দেওয়া হচ্ছে। সংসদ ও রাজপথ— উভয় ক্ষেত্রেই বিরোধী দলের গণতান্ত্রিক কর্মকাণ্ডে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো বাধা দেওয়া হয়নি। কিন্তু তারপরও দলটি কেন ধারাবাহিকভাবে রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরির মতো অবস্থান নিচ্ছে, সেটিই এখন সরকারের পর্যবেক্ষণের বিষয় হয়ে উঠেছে।

সরকারসংশ্লিষ্ট একাধিক দায়িত্বশীল নেতা মনে করছেন, পরিকল্পিতভাবে রাজনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূত বক্তব্য, ব্যক্তিগত আক্রমণ এবং উসকানিমূলক ভাষা ব্যবহার করে রাজনীতির মাঠ উত্তপ্ত করার চেষ্টা চলছে। তাদের আশঙ্কা, এই অস্থির পরিবেশের সুযোগ নিয়ে পতিত ফ্যাসিবাদী শক্তিকে আবারও সক্রিয় হওয়ার ক্ষেত্র তৈরি করে দেওয়ার অপচেষ্টা থাকতে পারে। সে কারণেই এনসিপির সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে ক্ষমতাসীন মহল।

গত কয়েকদিনে সিলেট, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারে এনসিপির কর্মসূচি ঘিরে হামলা, বাধা ও সংঘর্ষের ঘটনায় রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন উত্তাপ ছড়িয়েছে। এসব ঘটনায় বিএনপি ও এনসিপি একে অন্যকে দায়ী করছে। স্থানীয় পর্যায়ে পাল্টাপাল্টি মামলাও হয়েছে। এনসিপির অভিযোগ, স্থানীয় বিএনপি, ছাত্রদল-যুবদল এবং প্রশাসনের ভূমিকার কারণেই তাদের নেতাকর্মীরা হামলার শিকার হয়েছেন। তবে বিএনপির দাবি, সরকারের আমলে অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় বিরোধী দলগুলো সর্বোচ্চ রাজনৈতিক স্বাধীনতা ভোগ করছে এবং তাদের কর্মসূচিতে প্রশাসনিক বাধা দেওয়া হচ্ছে না।

ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের মতে, বিরোধী রাজনীতি করার অধিকার যেমন রয়েছে, তেমনি রাজনৈতিক বক্তব্যেও শালীনতা ও দায়িত্ববোধ থাকা জরুরি। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং দলটির জ্যেষ্ঠ নেতাদের নিয়ে ধারাবাহিক কটূক্তি ও ব্যক্তিগত আক্রমণ স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভের জন্ম দিচ্ছে। তাদের ভাষায়, তারেক রহমান বিএনপির নেতাকর্মীদের কাছে শুধু দলের প্রধান নন, আবেগ ও রাজনৈতিক বিশ্বাসেরও প্রতীক। ফলে তাকে লক্ষ্য করে শিষ্টাচারবহির্ভূত বক্তব্য রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়িয়ে দিচ্ছে।

এই প্রেক্ষাপটে গত শুক্রবার রাতে রাজধানীতে ঢাকা-৬ আসন বিএনপি ও অঙ্গসহযোগী সংগঠনের উদ্যোগে একটি বড় মশাল মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। পুরান ঢাকার মালিটোলা পার্ক থেকে শুরু হয়ে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে গিয়ে শেষ হওয়া ওই মিছিলে নেতৃত্ব দেন ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন। বিএনপি নেতারা বলছেন, এটি ছিল রাজনৈতিক শিষ্টাচার রক্ষার দাবিতে প্রতীকী প্রতিবাদ।

দলটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, ‘ব্যক্তিগত আক্রমণ, কুৎসা রটানো কিংবা নোংরা অপপ্রচার রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য ক্ষতিকর। যারা রাজনীতি করেন, তাদের বক্তব্যে পরিমিতি বোধ না থাকলে রাষ্ট্র ও সমাজ উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’

এনসিপির নেতাদের ওপর হামলার বিষয়ে তিনি বললেন, কারা দায়ী, তা স্থানীয় প্রশাসন তদন্ত করে ব্যবস্থা নেবে। তবে একই সঙ্গে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার ক্ষেত্রেও দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে।

রিজভী আরও বলেছেন, ‘যারা মনে করছেন ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করবেন, তারা সফল হবেন না। কোনোভাবেই ফ্যাসিবাদের পুনরাগমন যেন না ঘটে, সে বিষয়ে সরকার যেমন সতর্ক, বিরোধী দলগুলোরও তেমনি দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা উচিত।’

তিনি জানিয়েছেন, কেন্দ্র থেকে বিএনপির নেতাকর্মীদের সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে— কোনো ধরনের সংঘাত বা প্রতিশোধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়ানো যাবে না। সরকার দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখাকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো শুধু মাঠের সংঘর্ষ নয়; বরং নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় সরকার ও প্রধান বিরোধী শক্তির সম্পর্ক কোন পথে এগোবে, তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। তাদের অভিমত, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা যতই তীব্র হোক, সংলাপ, সহনশীলতা ও শিষ্টাচারের চর্চা দুর্বল হলে তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত গণতান্ত্রিক পরিবেশের ওপরই পড়বে।

জাতীয় অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ বলেছেন, সব রাজনৈতিক পক্ষেরই সংযমী থাকা প্রয়োজন। মতভেদ থাকতেই পারে, কিন্তু সমালোচনার ভাষা কখনোই শালীনতার সীমা অতিক্রম করা উচিত নয়। রাজনৈতিক উত্তেজনার পরিবর্তে দায়িত্বশীল আচরণই বর্তমান বাস্তবতায় সবচেয়ে প্রয়োজন।