জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে ঘোষিত জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ‘জুলাই পদযাত্রা’ কর্মসূচি এখন শুধু রাজনৈতিক প্রচারে সীমাবদ্ধ নেই; একের পর এক হামলা, সংঘর্ষ ও পাল্টাপাল্টি মামলার কারণে তা নতুন রাজনৈতিক উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। হবিগঞ্জ থেকে সিলেট— বিভিন্ন জেলায় কর্মসূচি ঘিরে সহিংসতার ঘটনায় মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়েছে এনসিপি ও বিএনপি। উভয়পক্ষ একে অন্যকে দায়ী করলেও এনসিপির দাবি, এটি তাদের সাংগঠনিক বিস্তার ঠেকানোর পরিকল্পিত চেষ্টা। অন্যদিকে বিএনপির অভিযোগ, এনসিপির শীর্ষ নেতাদের উসকানিমূলক বক্তব্য এসব ঘটনার মূল কারণ।
জুলাই পদযাত্রাকে কেন্দ্র করে গত কয়েক দিনে হবিগঞ্জ, সিলেটসহ অন্তত পাঁচ জেলায় সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে। কোথাও এনসিপির নেতাকর্মী আহত হয়েছেন, কোথাও গাড়িবহরে হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছে। হামলার পর উভয়পক্ষ একে অন্যের বিরুদ্ধে মামলা করেছে।
এসব ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন নয়, বরং পূর্বপরিকল্পিত রাজনৈতিক আক্রমণ হিসেবে দেখছে এনসিপি। দলটির অভিযোগ, নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান ঠেকাতে বিএনপি ও তাদের অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা পরিকল্পিতভাবে হামলা ও বাধা সৃষ্টি করছে। এমনকি এসব ঘটনার পেছনে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ইন্ধন রয়েছে বলে দাবি এনসিপির নেতাদের। তবে হামলা-মামলায় কর্মসূচি থেমে থাকবে না বলে স্পষ্ট জানিয়েছে দলটি। বরং উপজেলা ও পৌরসভা পর্যায়ে সাংগঠনিক কার্যক্রম আরও জোরদার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তাদের হাইকমান্ড।
গত ২৮ জুলাই হবিগঞ্জ সার্কিট হাউজের সামনে এনসিপির জুলাই পদযাত্রায় বক্তব্য চলাকালে হামলার ঘটনা ঘটে। এতে দলের মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলমসহ অন্তত ১০ নেতাকর্মী আহত হন। হামলায় গুরুতর আহত ছাত্রশক্তি ও এনসিপির কর্মী আলিফ চৌধুরীর বাঁ চোখের দৃষ্টিশক্তি চিরতরে নষ্ট হয়ে গেছে। চিকিৎসকদের আশঙ্কা, তার ডান চোখও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
ঘটনার প্রতিবাদে পরদিন দেশব্যাপী বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করে এনসিপি। তবে ২৯ জুলাই হবিগঞ্জে ১৪৪ ধারা জারি করে প্রশাসন। ওই দিন জেলা শহরে পদযাত্রা ও সমাবেশ শেষে স্থানীয় বিএনপির অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের সঙ্গে আবারও সংঘর্ষ হয়। এতে সারজিস আলমসহ আরও কয়েকজন আহত হন। হামলাকারীরা কয়েকটি গাড়িও ভাঙচুর করে বলে অভিযোগ উঠেছে।
হামলার ঘটনায় হবিগঞ্জ জেলা ছাত্রশক্তির আহ্বায়ক তন্ময় তাহের বাদী হয়ে জেলা ছাত্রদলের সভাপতি শাহ রাজীব আহমেদকে প্রধান আসামি করে ১১১ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। পরে জেলা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন পাল্টা মামলা করে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, সারজিস আলমসহ ১০ জনের নাম উল্লেখ করে মোট ৫০ জনকে হত্যাচেষ্টা, ভাঙচুর ও ছিনতাইয়ের অভিযোগে আসামি করেন।
এরপর গত বৃহস্পতিবার সিলেটের গোলাপগঞ্জে জুলাই পদযাত্রায় অংশ নিতে যাওয়া এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতাদের গাড়িবহরে ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও কয়েকটি গাড়ি ভাঙচুরের অভিযোগ ওঠে। সর্বশেষ শুক্রবার রাতে সিলেটের জৈন্তাপুরে পদযাত্রা শেষে ফেরার পথে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর গাড়িবহরে আবারও হামলার অভিযোগ পাওয়া যায়। ভাঙা কাচে পাটওয়ারীসহ দুজন আহত হন।
এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব বলেছেন, উপজেলা ও পৌরসভা পর্যায়ে দলের সাংগঠনিক বিস্তার ঠেকাতেই ধারাবাহিকভাবে হামলা, মামলা ও বাধা সৃষ্টি করা হচ্ছে। তার দাবি, এর পেছনে বিএনপির কেন্দ্রীয় ও জেলা পর্যায়ের নেতাদের ইন্ধন রয়েছে।
দলের যুগ্ম আহ্বায়ক ও মিডিয়া উপকমিটির প্রধান সারোয়ার তুষার বলেছেন, সরকারি দল পরিকল্পিতভাবে নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান ঠেকাতে হামলা ও দমনপীড়নের পথ বেছে নিয়েছে। তবে রাজনৈতিকভাবেই এর মোকাবিলা করা হবে এবং সাংগঠনিক কর্মসূচি আরও বেগবান করা হবে।
অন্যদিকে বিএনপি ও তাদের অঙ্গসংগঠনের নেতাদের দাবি, এনসিপির কয়েকজন শীর্ষ নেতা, বিশেষ করে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ধারাবাহিক কটূক্তি ও উসকানিমূলক বক্তব্যের কারণে মাঠপর্যায়ে উত্তেজনা তৈরি হচ্ছে। এসব ঘটনার দায় এনসিপির উসকানিমূলক রাজনীতির ওপরই বর্তায় বলে মনে করেন তারা।
এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে এনসিপির নেতারা বলছেন, কোনো বক্তব্যে আপত্তি থাকলে তার জবাব রাজনৈতিকভাবেই দেওয়া উচিত, হামলা বা সহিংসতার মাধ্যমে নয়। তাদের মতে, ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও যদি বিরোধী রাজনৈতিক দলের ওপর হামলা-মামলা চলতে থাকে, তাহলে দেশের গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিয়েই প্রশ্ন উঠবে।
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে ঘিরে বিতর্ক প্রসঙ্গে এনসিপির আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেছেন, একজন বিরোধী দলের নেতার দায়িত্বই হচ্ছে সরকারের সমালোচনা করা। কোথাও আইনের লঙ্ঘন হলে আইন তার নিজস্ব প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থা নেবে; রাজনৈতিক বক্তব্যের জবাবও রাজনৈতিকভাবেই দেওয়া উচিত।
দলটির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলমের ভাষ্য, বর্তমানে বিএনপি যেভাবে এনসিপিকে বাধা দেওয়ার বা গলা টিপে ধরার চেষ্টা করছে, তা অতীতে আওয়ামী লীগের আচরণেরই পুনরাবৃত্তি।