বহুল আলোচিত ব্যবসায়ী এস আলমের সঙ্গে সম্পৃক্ততাকে কেন্দ্র করে চেয়ারম্যান খুরশীদ আলমের নিয়োগ বাতিলের পরও ইসলামী ব্যাংকে অস্থিরতার জের রয়েছে এখনো কিছুটা। নগদ টাকা তোলার চাপ এবং অন্য ব্যাংকে তহবিল স্থানান্তরের প্রবণতা পুরোপুরি কাটেনি। পরিস্থিতি সামলাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ১৭ হাজার কোটি টাকা ব্যাংকটিকে নগদ সহায়তা দিলেও গ্রাহকের চাহিদা মেটাতে প্রায় হিমশিম খাচ্ছে। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।
তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক জহির হোসেনকে বোর্ড-চেয়ারম্যানের যাবতীয় ক্ষমতাসহ ইসলামী ব্যাংকের সমন্বয়কের দায়িত্ব দেওয়ায় আমানতকারীদের আস্থা ফিরতে শুরু করেছে। অন্তত ১৫ হাজার আমানতকারী হিসাব বন্ধ করার পর গতকাল শনিবার পর্যন্ত পুনরায় ব্যাংকে ফিরে এসেছেন। ৮০০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে তাদের জমার পরিমাণ।
অনেক করপোরেট গ্রাহকও লেনদেন বন্ধ করে দেওয়ার পর আবার ফিরতে শুরু করেছেন। সম্প্রতি ২০টি করপোরেট প্রতিষ্ঠান লেনদেন চালু করেছে ব্যাংকটির সঙ্গে। অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের বাস্তব অভিজ্ঞতাসম্পন্ন দক্ষ ব্যক্তির সমন্বয়ে ব্যাংকটিতে পূর্ণাঙ্গ বোর্ড দিতে চেষ্টা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে তাদের তালিকায় থাকা কেউ কেউ আগ্রহ না দেখানোয় বোর্ড গঠনে বিলম্ব হচ্ছে বলে জানা গেছে।
ইসলামী ব্যাংকের রাজধানীর পান্থপথ শাখার গ্রাহক তারিন শাহরিয়ার জানিয়েছেন, তার ৩৪ লাখ টাকার ডিপিএস রয়েছে। তিনি হিসাব ভাঙার জন্য আবেদন করেছিলেন। চেক জমা দিয়ে জুনের প্রথম সপ্তাহে টাকা পাননি। এমনকি সোনালী ব্যাংকে স্থানান্তর করতে পারেননি। তখন মাথায় রীতিমতো বাজ পড়ে। তবে ১৭ জুন ব্যাংক টাকা দিতে সম্মত হয়। কিন্তু প্রায় ৪ লাখ টাকা কেটে রাখবে বলে জানায়। তখন টাকা না তুলে তিনি ফিরে যান। তারিন শাহরিয়ার বলছিলেন, ‘নতুন করে ভালো বোর্ড এলে টাকা রাখব এবং নয়তো ক্ষতি হলেও টাকা তুলে ফেলব।’
ব্যাংকটির হবিগঞ্জ শাখার একজন গ্রাহক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, তার ১০ লাখ টাকা আমানত আছে ব্যাংকটিতে। এ টাকা নিয়ে হতাশায় রয়েছেন। পেশায় প্রভাষক এ ব্যক্তি বলছিলেন, ব্যাংকটি নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক অনেক কিছু করছে। তবে শরিয়াহ ব্যাংকিংয়ে অনভিজ্ঞ ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদ, অধ্যাপক এম জুবায়দুর রহমান এবং সাবেক ডেপুটি গভর্নর খুরশীদ আলমের মতো বিগত তিন চেয়ারম্যান নিয়োগ যে ভুল ছিল, তা সাধারণ গ্রাহকরা বুঝতে পারেন; কেন্দ্রীয় ব্যাংক কী বুঝতে পারে না?
ঢাকার গুলশান শাখার গ্রাহক সাজ্জাদ হোসেন জানিয়েছেন, ‘তিনি ১৫ কোটি টাকার জন্য তিনটি চেক দিয়ে টাকা পাচ্ছেন না। নানা কৌশলে টাকা দিচ্ছে না।’
ব্যাংকটির সঙ্গে জড়িত সূত্র জানায়, গত জুন মাসের শুরুর দিকে চেয়ারম্যান হিসেবে খুরশীদ আলমের নিয়োগের পর ব্যাংকটি ধ্বংসের আশঙ্কায় গ্রাহকরা টাকা তোলায় হুমড়ি খেয়ে পড়েন। টাকা তুলতে সময়সীমা বেঁধে দেয় ব্যাংকটি। এতে আতঙ্ক ছড়ায়। জুনের প্রথম ১৪ দিনেই প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা উত্তোলন হয়। জমা পড়ে মাত্র ৫০০-৬০০ কোটি টাকা। পরিস্থিতি সামাল দিতে কমপক্ষে ১৭ হাজার কোটি টাকা নগদ তারল্য সহায়তা দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু তাতেও গ্রাহকদের আস্থা ফেরেনি। তখন সংকটের কেন্দ্রবিন্দু এস আলমের দোসরখ্যাত চেয়ারম্যান খুরশীদ আলমকে বাধ্যতামূলক বিদায় দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক জহির হোসেনকে সমন্বয়কের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এতে আপাতভাবে ব্যাংকে স্বস্তি ফেরে কিছুটা। বাংলাদেশ ব্যাংক সর্বশেষ তিন চেয়ারম্যানের ভুল নিয়োগের অভিজ্ঞতা থেকে সরে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের নিয়ে শিগগির ব্যাংকটিতে পূর্ণাঙ্গ বোর্ড দিতে যাচ্ছে বলে জানা গেছে।
তথ্য বলছে, সম্প্রতি ২০টি সেরা করপোরেট প্রতিষ্ঠান লেনদেন শুরু করেছে ইসলামী ব্যাংকে। এসব প্রতিষ্ঠান প্রায় ৪০ কোটি টাকা জমা দিয়েছে এবং উত্তোলন করেছে ৩০ কোটি টাকা। সেই হিসাবে জমার পরিমাণ বেশি প্রায় ১০ কোটি টাকা। লেনদেন পুনরায় শুরু করা প্রতিষ্ঠানগুলো হলো— টেক্সকো টেক, পদ্মা অয়েল, স্টেলার ইন্ডাস্ট্রিজ, সি পি বাংলাদেশ, সি পি বাংলাদেশ (হ্যাচারি), প্রাণ অ্যাগ্রো, হেদায়েত অ্যান্ড ব্রাদার্স, যমুনা ফার্টিলাইজার, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম, মদিনা ট্রেডিং, আরএফএল প্লাস্টিকস, স্পেকট্রা হেক্সা ফিডস, আবুল খায়ের স্টিল মেল্টিং, সি পি বাংলাদেশ কো. লি, ইনজেনিয়াস ক্রপ সায়েন্স, আকিজ ফুড অ্যান্ড বেভারেজ, এমিনেন্স কেমিক্যাল, আকিজ সিমেন্ট, অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজ ও এসিআই গোদরেজ অ্যাগ্রোভেট।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলছিলেন, ইসলামী ব্যাংকের ভিত শক্ত। তবে জুনের শুরুতে কয়েক দিন লেনদেন বন্ধ ছিল। কারণ, টাকা জমা দিলে ব্যাংক চাহিদামতো টাকা দিতে পারত না। চেয়ারম্যান ও বোর্ড বাতিলের পর পরিস্থিতি অনেকটা পাল্টেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ২৬ জুলাই পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে এসেছে ২৪৩ কোটি ৭৯ লাখ ডলার রেমিট্যান্স। ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে এসেছে ৩৫ কোটি ৭৭ লাখ ডলার। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা বাংলাদেশে কৃষি ব্যাংকের রেমিট্যান্স ৩০ কোটি ১৬ লাখ ডলার। যদিও বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শীর্ষ থাকা ইসলামী ব্যাংক রেমিট্যান্স সংগ্রহ করে ৬৮৮ কোটি ডলার। তৃতীয় অবস্থানে থাকা কৃষি ব্যাংকের রেমিট্যান্স ৪১০ কোটি ডলার। তবে জুন মাসের অস্থিরতার কারণে ইসলামী ব্যাংককে পেছনে ফেলে প্রথম ১৩ দিনে কৃষি ব্যাংক ২৩ কোটি ৪০ লাখ ডলার রেমিট্যান্স নিয়ে প্রথম এবং ইসলামী ব্যাংক ২১ কোটি ৩০ লাখ ডলার সংগ্রহ করে দ্বিতীয় স্থানে নেমে যায়।
শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোসলেহ উদ্দিন বললেন, রেমিট্যান্সে ইসলামী ব্যাংকের এককভাবে অবদান প্রায় ৩২ শতাংশ। ব্যাংকটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার জায়গা পূরণ হবে না। রেমিট্যান্স সংগ্রহ মারাত্মকভাবে কমে যাবে।
ইসলামী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আগামীর সময়কে বললেন, ‘গত মাসের শুরুতে কিছু শাখায় বড় অঙ্কের চেকের সমস্যা হয়েছিল। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নগদ সহায়তায় ব্যাংকটি সাময়িক চাপ সামলাতে সক্ষম হয়েছে। এখন আতঙ্কিত হওয়ার মতো কিছু নেই।’