Image description

বাংলাদেশের সঙ্গে ইরানের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। তবে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ আগ্রাসন শুরুর পর ঢাকার এক বিবৃতিতে ক্ষুব্ধ হয় তেহরান। এর জেরে হরমুজ প্রণালিতে বাংলাদেশি জাহাজ আটকে দেওয়া হয়। এখন জাহাজ ছাড়িয়ে আনতে ওই বিবৃতির ক্ষত সারাতে চায় ঢাকা।

 

চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি যৌথ হামলা চালিয়ে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যা করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। একই হামলায় দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী, সশস্ত্র বাহিনী প্রধানসহ উচ্চ পর্যায়ের আরও অনেকে নিহত হন। পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে সৌদি আরব, কাতার ও কুয়েতসহ মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোতে ‘মার্কিন স্বার্থ’ লক্ষ্য করে হামলা চালায় ইরান।

 

এই পরিস্থিতিতে ১ মার্চ বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি বিবৃতি দেয়। সেখানে ইরানের পাল্টা হামলায় মধ্যপ্রাচ্যের ‘কয়েকটি দেশের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে’ দাবি করে নিন্দা জানানো হয়। তবে এতে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের নাম ছিল না। এর আগে ইরানে চালানো আগ্রাসনেরও নিন্দা ছিল না।

 

এ নিয়ে দেশে তীব্র সমালোচনা শুরু হলে ২ মার্চ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আরেকটি বিবৃতি দেয়। পাঁচ লাইনের ওই বিবৃতিতে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির হত্যাকাণ্ডকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন উল্লেখ করে ইরানের ভ্রাতৃপ্রতিম জনগণের প্রতি শোক প্রকাশ করা হয়। পরে জাতীয় সংসদেও খামেনির মৃত্যুতে শোক প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়।

 

 

কূটনৈতিক সূত্রের বরাতে বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, শুরুতে ঢাকায় অবস্থিত ইরান দূতাবাসে শোক বইতে স্বাক্ষর করতে কোনো কর্মকর্তাকে পাঠায়নি বাংলাদেশ। এই ঘটনা ইরানিদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। পরে অবশ্য মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা গিয়ে স্বাক্ষর করেন।

 

একটি বেসরকারি টেলিভিশনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের প্রথম বিবৃতি নিয়ে নিজ দেশের অস্বস্তির কথা জানান ঢাকায় ইরানের রাষ্ট্রদূত জালিল রাহিমি জাহানাবাদী। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, বাংলাদেশের বিবৃতিতে তেহরান সন্তুষ্ট নয়।

 

গত ১ এপ্রিল দূতাবাসে এক সংবাদ সম্মেলনে এ নিয়ে ইরানের রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘বাংলাদেশ যে বিবৃতি দিয়েছে, তাতে বাংলাদেশের অবস্থান স্পষ্ট করা হয়নি।’ এ সময় স্পেনের মতো ইউরোপীয় দেশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে জনগণের যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভের দৃষ্টান্ত তুলে ধরেন তিনি। সে আলোকে বাংলাদেশও সুস্পষ্ট অবস্থান নেবে বলে আশা প্রকাশ করেন।

 

রাহিমি জাহানাবাদী বলেন, বাংলাদেশের জ্বালানিবাহী ছয়টি জাহাজকে হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার অনুমতি দিয়েছে তেহরান। তবে বাংলাদেশ জাতিসংঘ ও ওআইসির সদস্য হিসেবে ইরানে হামলাকারী আগ্রাসী শক্তির বিরুদ্ধে নিন্দা জানাতে পারত।

 

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলা এবং আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যার পর ঢাকার বিবৃতিতে যে তেহরান ক্ষুব্ধ, তা ঢাকায় ইরানের রাষ্ট্রদূতের বক্তব্যে পরিষ্কার।

 

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, মূলত এ কারণেই ইরানের নৌবাহিনী বাংলাদেশি জাহাজকে হরমুজ পার হওয়ার অনুমতি দিচ্ছে না। তবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তার দাবি, হরমুজ এলাকার বাস্তবতার কারণেই বাংলাদেশসহ অনেক দেশের জাহাজ আটকে আছে। এখানে তেহরানের বিশেষ অসন্তুষ্টির কোনো কারণ নেই।

 

সাবেক কূটনীতিক হুমায়ুন কবির বলেন, ‘পররাষ্ট্রনীতির একটি নৈতিক ভিত্তি থাকতে হয়। কোনো দেশ আক্রান্ত হলে বা আক্রমণের মুখে পড়লে সেটা বাংলাদেশ সমর্থন করে না। এই নীতিই বাংলাদেশ সবসময় অনুসরণ করে এসেছে।’

 

তার মতে, ‘বাংলাদেশের কোনো বিষয়ে অবস্থান প্রকাশের ক্ষেত্রে এ দুটো বিষয় মনে রাখা জরুরি। এর ব্যত্যয় হলেই বাংলাদেশের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। সব রাষ্ট্রেরই সার্বভৌমত্ব ও পারস্পারিক সম্মানকে গুরুত্ব দিতে হয়। এবার সেভাবে হয়নি বলেই হয়তো প্রশ্নটি উঠেছে।’

 

সম্পর্ক মেরামতে উদ্যোগী ঢাকা

 

মার্চের শেষ সপ্তাহে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, বাংলাদেশসহ ছয়টি দেশের জাহাজ হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করতে পারবে। ১ এপ্রিল ঢাকায় ইরানের রাষ্ট্রদূতও বাংলাদেশকে সহায়তার কথা বলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা হয়নি।

 

পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান গত ৫ এপ্রিল ঢাকায় ইরানের রাষ্ট্রদূত জালিল রাহিমি জাহানাবাদীর সঙ্গে বৈঠক করেন। বাংলার জয়যাত্রাসহ বাংলাদেশগামী আরেকটি অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজের নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিতে সহায়তা চান তিনি।

 

রাষ্ট্রদূত জানান, এ নিয়ে যথাযথ পর্যায়ে ইরানি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। তবে শেষ পর্যন্ত কাজের কাজ কিছুই হয়নি। ফলে ১৯ এপ্রিল তুরস্কে ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী সাঈদ খাতিবজাদেহর কাছে আবারও বিষয়টি উত্থাপন করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ওই বৈঠকে জাহাজটি যেন নিরাপদে হরমুজ প্রণালি পার হতে পরে, সে ব্যাপারে সহায়তার অনুরোধ করা হয়েছে।

 

এর মধ্যেই মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) রাতে ইরান দূতাবাসের এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বাংলাদেশ সরকারের শোকবার্তা, বিশেষ করে জাতীয় সংসদে গৃহীত শোক প্রস্তাব এবং শোক বইতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তার স্বাক্ষরের প্রশংসা করে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ইরান দূতাবাস হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাংলাদেশি জাহাজগুলোর নিরাপদ চলাচল সহজতর করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবে।

 

যেভাবে আটকা পড়ে বাংলাদেশি জাহাজ

 

২৬ জানুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় প্রবেশ করে এমভি বাংলার জয়যাত্রা জাহাজ। এরপর মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন বন্দরে পণ্য নিয়ে যায়। ২৬ ফেব্রুয়ারি কাতারের একটি বন্দর থেকে প্রায় ৩৯ হাজার মেট্রিক টন স্টিল কয়েল নিয়ে দুবাইয়ের জেবেল আলি বন্দরে পৌঁছায় জাহাজটি।

 

২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা শুরু করলে পরিস্থিতি হঠাৎ জটিল হয়ে পড়ে। ওই বন্দরে জাহাজটির মাত্র ২০০ মিটারের মধ্যে আছড়ে পড়ে ক্ষেপণাস্ত্র। পণ্য খালাস শেষে পরবর্তী গন্তব্য ভারতের মুম্বাই বন্দর ঠিক হলেও আরব আমিরাতের কোস্টগার্ড নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে বাধা দেয়। গভীর জলসীমায় অবস্থান নেয় জাহাজটি।

 

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধবিরতি শুরু হলে ৮ এপ্রিল সৌদি আরবের রাস আল খাইর বন্দর থেকে হরমুজের দিকে যাত্রা করে বাংলার জয়যাত্রা। কিন্তু ইরানি কর্তৃপক্ষের অনুমতি না পেয়ে ফিরে আসতে হয়। এরপর ইরান হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে দেওয়ার ঘোষণা দিলে জাহাজটি আবার রওনা হয়। কিন্তু হরমুজের ২০ নটিক্যাল মাইলের মধ্যে পৌঁছানোর পর ইরানের নৌবাহিনী আবেদন প্রত্যাখ্যান করে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেয়। বাংলাদেশ সময় গত শুক্রবার রাত দেড়টার দিকে আগের অবস্থানে ফিরে যায় জাহাজটি।

 

এ বিষয়ে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেক বলেন, ‘যেভাবে সরকার কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছে তাতে আমরা আশা করি দ্রুত হরমুজ পার হতে জাহাজটি ইরানি কর্তৃপক্ষের অনুমতি পাবে।’

 

বর্তমান পরিস্থিতি

 

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছিলেন বাংলাদেশসহ ছয়টি দেশের জাহাজ হরমুজ প্রণালি পার হতে পারবে। ঢাকায় ইরানের রাষ্ট্রদূতও দিয়েছিলেন সহায়তার আশ্বাস। তারপরও হরমুজের ২০ নটিক্যাল মাইলের মধ্যে পৌঁছানোর পর ইরানের নৌবাহিনী জাহাজটিকে ফিরিয়ে দেয়। বর্তমানে ৩৭ হাজার টন সার বোঝাই করে সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি বন্দরের কাছে অপেক্ষা করছে বাংলার জয়যাত্রা।

 

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধের জেরে হরমুজ প্রণালি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে ইরান। দেশটির ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) অনুমতি ছাড়া ওই প্রণালি অতিক্রমের সুযোগ নেই। শুধু বাংলার জয়যাত্রা নয়, ক্যামেন আইল্যান্ডের পতাকাবাহী একটি জাহাজও সৌদি আরবের জুয়াইমাহ টার্মিনাল থেকে অ্যারাবিয়ান লাইট ক্রুড অয়েল নিয়ে চট্টগ্রামে আসতে পারেনি একই কারণে।

 

সিঙ্গাপুরভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের মালিকানাধীন বাংলার জয়যাত্রা ভাড়ায় নিয়ে পরিচালনা করছে। জাহাজের সব নাবিক বাংলাদেশি। জাহাজটি হরমুজ পার হয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউন ও ডারবানে যাওয়ার কথা ছিল।

 

সূত্র : বিবিসি বাংলা