Image description
দ্রুত নিষ্পত্তিতে তদারকি কমিটি গঠনের দাবি

সাভারের ভয়াবহ রানা প্লাজা ধসের ১৩ বছর পূর্ণ হচ্ছে আজ। ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল ওই ভবন ধসে প্রাণ হারিয়েছিলেন ১ হাজার ১৩৮ জন শ্রমিক। আহত ও নিখোঁজ বহু মানুষের পরিবার এখনো মানবেতর জীবনযাপন করছে। বিশ্বকে নাড়িয়ে দেওয়া ওই ঘটনায় করা পাঁচটি মামলার একটিরও বিচার শেষ হয়নি। বিচারিক আদালতেই ঝুলছে মামলাগুলো। মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তিতে তদারকি কমিটি গঠনের দাবিও উঠেছে। এর মধ্যে হত্যা মামলায় ২০১৬ সালের ১৮ জুলাই অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে রানা প্লাজার মালিক সোহেল রানাসহ ৪১ আসামির বিরুদ্ধে বিচার শুরু হয়। হাই কোর্টের আদেশে কয়েক বছর স্থগিত থাকার পর মামলাটির বিচার শুরু হয়েছে আবার। ৫৯৪ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৪৫ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়েছে। আগামী ৩০ এপ্রিল এ মামলার পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য দিন ধার্য রয়েছে ঢাকার ৮ম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতে।

সংশ্লিষ্ট আদালতের অতিরিক্ত পিপি ফয়সাল মাহমুদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, হত্যা মামলায় অভিযোগ গঠনের পর কয়েকজন আসামি উচ্চ আদালতে গিয়ে মামলাটি স্থগিত করেন। এ কারণে মামলার বিচার প্রক্রিয়া অনেক বছর স্থগিত ছিল। বর্তমানে কোনো স্থগিতাদেশ না থাকায় সাক্ষ্যগ্রহণ চলমান। তা ছাড়া মামলাটি আমাদের আদালতে বদলি হয়ে আসার পর এ পর্যন্ত ৫৪ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়। আশা করছি দ্রুতই মামলাটির বিচার শেষে রায়ের পর্যায়ে আসবে।

ইমারত নির্মাণ আইনে করা মামলায় ভবন মালিক সোহেল রানাসহ ১৮ আসামির বিচারও শুরু হয় ২০১৬ সালের ১৬ জুন। ওই আদেশের বিরুদ্ধে রিভিশন মামলা করে অব্যাহতি পান দুই আসামি। পরে অধস্তন আদালতের আদেশের বিরুদ্ধে এক আসামি হাই কোর্টে গেলে স্থগিত হয়ে যায় বিচারিক কার্যক্রম। সংশ্লিষ্ট আদালতের অতিরিক্ত পিপি ইশতিয়াক হোসেন জিকু বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ইমারত নির্মাণ আইনের মামলাটি ২০২৩ সালের ১১ নভেম্বর তৎকালীন ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ হাবিবুর রহমান ভূঁইয়া নিজের ক্ষমতাবলে তার আদালতে বিচারের জন্য নিয়ে যান। তবে অনেকদিন উচ্চ আদালত থেকে এ মামলাটির ওপর স্থগিতাদেশ ছিল। বর্তমানে মামলাটি পুনরায় অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে বিচারের জন্য এসেছে। এ মামলায় একজন অসামির পক্ষে স্থগিতাদেশ থাকায় অন্য আসামিদের বিরুদ্ধে মামলার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। গত ২০ এপ্রিল ১ থেকে ৩ নম্বর সাক্ষীকে হাজিরের জন্য প্রসেস ইস্যু করা হয়েছে। আশা করছি আগামী তারিখে সাক্ষীরা আদালতে উপস্থিত হবেন।

এদিকে ছয় তলা ভবনের অনুমোদন ১০ তলা ভবনে রূপান্তর করার অভিযোগে দুদকও একটি মামলা করেছে। মামলাটি তদন্ত করে ২০১৭ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি সংস্থাটির উপপরিচালক মো. নাসিম উদ্দিন ১৭ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। বর্তমানে মামলাটি ঢাকার বিভাগীয় স্পেশাল জজ আদালতের বিচারক শারমিন আফরোজের আদালতে যুক্তিতর্ক শুনানির পর্যায়ে রয়েছে। মামলায় মোট ২০ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৯ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ করেছেন আদালত। ২০২৫ সালের ১৯ মে মামলাটি আত্মপক্ষ সমর্থন শুনানি শেষে আদালত যুক্তিতর্কের শুনানির জন্য দিন ধার্য করেন। গত এক বছর ধরে মামলাটি যুক্তিতর্ক শুনানির পর্যায়ে রয়েছে। সর্বশেষ গত ৩০ মার্চ অধিকতর যুক্তিতর্ক শুনানির জন্য দিন ধার্য থাকলেও তা হয়নি। আদালত পরবর্তী শুনানির জন্য আগামী ১৭ মে দিন নির্ধারণ করেছেন।

এ ছাড়া রানা প্লাজা ভবন ধসে পড়ে যাওয়ার পর ঢাকা জেলা গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক শাহিন শাহ পারভেজ ধামরাই থানায় অস্ত্র আইন ও বিশেষ ক্ষমতা আইনে দুটি মামলা করেছিলেন। এই দুটি মামলায় সোহেল রানাকে একমাত্র আসামি করা হয়েছে। বর্তমানে মামলা দুটি প্রথম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজের বিচারক এ বি এম আশফাক উল হকের আদালতে বিচারাধীন। সর্বশেষ মামলা দুটি গত ৩০ মার্চ সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য দিন ধার্য থাকলেও সাক্ষীরা উপস্থিত হননি। এজন্য সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য আগামী ৩০ এপ্রিল নতুন দিন ঠিক করেছেন বিচারক। রানা পক্ষের আরেক আইনজীবী মো. বদরুল ইসলাম (জুয়েল) ক্ষোভ প্রকাশ করে বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানান, ভবন মালিক সোহেল রানা নয়। বিল্ডিংটি তার বাবা আবদুল খালেক ওরফে কুলু খালেক নামে রেজিস্ট্রি করা ছিল। শুধু বিল্ডিংটি তার নামে ছিল। এটা ছিল বড় অপরাধ। নিজের ক্ষতি করে মানুষ হত্যা করবে? এটা অবশ্যই বিশ্বাসযোগ্য নয়। রানার বিরুদ্ধে সব মিলিয়ে ছয়টি মামলা দায়ের করা হয়েছিল। সব মামলায় অতি উৎসাহী হয়ে দায়ের করা হয়েছে।

২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল রানা প্লাজা নামের ভবন ধসের ঘটনায় ১ হাজার ১১৭ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও ১৯ জন মারা যান। ধ্বংসস্তূপ থেকে ২ হাজার ৪৩৮ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারকৃত লাশের মধ্যে ৮৪৪টি স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ডিএনএ পরীক্ষার নমুনা রেখে ২৯১ জনের অশনাক্ত লাশ জুরাইন কবরস্থানে দাফন করা হয়। উদ্ধারকৃত জীবিতদের মধ্যে ১ হাজার ৫২৪ জন আহত হন। তাদের মধ্যে পঙ্গুত্ববরণ করেন ৭৮ জন।

মামলা দ্রুত নিষ্পত্তিতে তদারকি কমিটি করার দাবি : রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় দায়ের করা মামলা দ্রুত ও কার্যকরভাবে পরিচালনার জন্য একটি সম্মিলিত তদারকি কমিটি গঠনের দাবি জানিয়েছেন বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নেতারা। গতকাল রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) ‘রানা প্লাজা ধসের ১৩ বছর : পোশাক শিল্পে পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার বর্তমান অবস্থা’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় বক্তারা এ দাবি জানান। সভাটির আয়োজন করে ইন্ডাস্ট্রিয়াল বাংলাদেশ কাউন্সিল (আইবিসি)। রানা প্লাজা ভবন ধসের ১৩ বছর পূর্তি উপলক্ষে শ্রমিকদের ন্যায্য বিচার, ক্ষতিপূরণ এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার দাবিতে একটি মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ওয়ার্কার্স রিসোর্স সেন্টারের চেয়ারম্যান রুহুল আমিন বলেন, রানা প্লাজা দুর্ঘটনায় নিহতদের কোনোভাবেই অবমূল্যায়নের সুযোগ নেই। এ ঘটনায় প্রায় ১ হাজার ১৩৭ জন শ্রমিক নিহত হন এবং আড়াই হাজারের বেশি শ্রমিক স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করেন। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দুর্ঘটনায় বারবার শ্রমিকরাই প্রাণ হারান, কিন্তু মালিকদের জবাবদিহি নিশ্চিত হয় না। তিনি বলেন, মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির স্বার্থে একটি যৌথ তদারকি কমিটি গঠন প্রয়োজন।