Image description
নজর দিতে হবে রপ্তানিমুখী শিল্প এসএমইতে

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের পরিকল্পনা উপদেষ্টা অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেছেন, ‘আইএমএফ নিজের গরজেই বাংলাদেশকে ঋণ দেবে। কারণ আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল শীর্ষক এ প্রতিষ্ঠানটির কাজই হচ্ছে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোকে বিপদ থেকে রক্ষা করা। তারা মূলত সংস্কারের জন্য নির্বাচিত সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে ঋণের কিস্তি বিলম্বিত করার কথা বলছে। কিন্তু ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানটি নিজেও জানে এটা বড় ধরনের সংস্কারের সময় নয়। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে দেশে যে সংকট তৈরি হয়েছে, প্রথমে তা সামাল দিতে হবে।’

গতকাল বিকালে বাংলাদেশ প্রতিদিনকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা বলেন। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন,                 নীতি সংস্কার ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা প্রণয়নের লক্ষ্যে সম্প্রতি একটি অ্যাডভাইজরি বা পরামর্শক কমিটি গঠন করেছে বর্তমান সরকার। ৩৬ সদস্যবিশিষ্ট সেই কমিটির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। পাঁচ বছরের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনা প্রণয়ন করবে এ কমিটি। আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে এ পরিকল্পনা তৈরির কাজ শেষ হওয়ার আশা করা হচ্ছে। এরই মধ্যে কমিটি একটি সভাও করেছে। ৮ এপ্রিল গঠিত এ কমিটিতে দেশের খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ, গবেষক, শিক্ষাবিদ এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

নতুন পরিকল্পনার আগে পুরোনো পরিকল্পনা মূল্যায়ন করা দরকার :  নতুন দায়িত্ব নিয়ে সরকারের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা প্রণয়ন প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, ‘এ ধরনের কাজের জন্য এত বড় গ্রুপের দরকার নেই। প্রথমে অর্থনীতিবিদদের নিয়ে ছোট একটি গ্রুপ করে, সেই গ্রুপ থেকে পরামর্শ নিয়ে পরে মন্ত্রণালয়গুলোকে যুক্ত করা উচিত।’ তিনি বলেন, ‘পুরো দেশের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা করতে হলে সব মন্ত্রণালয়ের ইনপুট লাগবে। এটা এককভাবে পরিকল্পনা কমিশনের পক্ষে করা সম্ভব নয়। এ ছাড়া নতুন অর্থনৈতিক পরিকল্পনা প্রণয়নের আগে বিগত সরকারের পরিকল্পনাগুলো মূল্যায়ন করা দরকার। সবশেষ অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় যে টার্গেটগুলো ছিল, তার কতটা অর্জিত হয়েছে, কোথায় ঘাটতি রয়েছে তা বের করতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা ভবিষ্যত পরিকল্পনার সঙ্গে দেশের উন্নয়ন প্রকল্পের (এডিপি) কার্যকর যোগসূত্র স্থাপন করতে হবে।’

জ্বালানিসংকটে সরকারের দায় নেই : নতুন সরকারের পরিকল্পনা সম্পর্কে অর্থনীতির এই অধ্যাপক বলেন, ‘বর্তমান সরকারের প্রতি আমার সমবেদনা আছে। এ সরকার ক্ষমতায় আসার পর জ্বালানি নিয়ে যে সংকট তৈরি হয়েছে এতে তাদের কোনো দায় নেই। তেলের অভাবে গাড়ি চলছে না। গ্যাসের অভাবে ইলেকট্রিক চুলা ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে স্বল্প আয়ের মানুষের ওপর চাপ বাড়ছে। এ সংকট শুধু বাংলাদেশে নয়, ভারত, পাকিস্তানের মতো দেশেও দারিদ্র্য বাড়িয়ে দিচ্ছে।’

সংকটের কথা দেশের মানুষকে জানানো উচিত : সাবেক পরিকল্পনা উপদেষ্টা অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, ‘শুধু অন্তর্বর্তী সরকার খারাপ অর্থনীতি রেখে গেছে, এ কথা বলে লাভ নেই। প্রকৃত অবস্থা সবাইকে জানানো উচিত। জ্বালানি খাতে কী ঘটছে, কোথায় সংকট, এ সঙ্কট সামাল দিতে কী পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে এসব বিষয় দেশের মানুষকে খোলাখুলি জানানো দরকার। সবার আগে জনগণের আস্থা অর্জন করতে হবে। যখন সরকারের কাজে জনগণের আস্থা চলে আসবে, তখন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সহজ হয়ে যাবে।’

নতুন বাজেটে খুব বেশি কিছু করার নেই : আসন্ন বাজেট সম্পর্কে জানতে চাইলে ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, ‘সরকার চাইলেও নতুন বাজেটে খুব বেশি কিছু করতে পারবে না। সামনের বাজেটে জ্বালানি খাতে ভর্তুকি বাস্তবসম্মত রাখতে হবে। এনবিআরের রাজস্ব প্রস্তাবে ঘাটতি থাকবে। ফলে বাজেট ঘাটতি বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ঘাটতি বেড়ে গেলে বেসরকারি খাতের সুযোগসুবিধার জায়গা কমে যাবে। কারণ ঋণপ্রবাহ বাড়ালে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যেতে পারে।’

রপ্তানিমুখী শিল্পে নজর, সর্বোচ্চ গুরুত্ব জ্বালানি খাতে : সাবেক এই পরিকল্পনা উপদেষ্টা বলেন, ‘আমি পলিসি মেকার হলে রপ্তানিমুখী শিল্পে নজর দিতাম। সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতাম জ্বালানি খাতে। সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি অব্যাহত রাখতাম। অর্থনীতি বাঁচিয়ে রাখতে হলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পেও নজর দেওয়া দরকার। কারণ এসএমই কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে। এ খাতে নজর না দিলে কর্মসংস্থান কমবে। দারিদ্র্য আরও বাড়বে।’ তিনি জানান, অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য একটি ঋণসুবিধার উদ্যোগ নিয়েছিল, তবে বাংলাদেশ ব্যাংক এ বিষয়ে চাপ দেয়নি বলে কাজ হয়নি।