একটি রাষ্ট্রে যার যেই কাজ তার সেটাই করা উচিত। এতে রাষ্ট্র উপকৃত হয়। দেশ ঠিকঠাক মতো চলে। সুশাসন প্রতিষ্ঠা সহজ হয়। কিন্তু বাংলাদেশে আমরা দেখি অনেকেই তাদের কাজের সীমা অতিক্রম করেন। শিক্ষক শিক্ষকতার চেয়ে রাজনীতিতে মনোযোগী হন। শিক্ষকরা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ব্র্যাকেটে নিজেদের বন্দি করেন। আমলারা ক্ষমতাসীন দলের সমর্থক হিসেবে পরিচিত হতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। মেধা বা যোগ্যতা না, বরং ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে গলা মিলিয়ে, চাটুকারিতা করেই যেন তার পদোন্নতির পথ সুগম হয়। একইভাবে চিকিৎসক, প্রকৌশলী, সাংবাদিক সব পেশার মানুষ পেশাগত দায়িত্ব পালনের চেয়ে রাজনৈতিক আনুগত্যের প্রতি বেশি আগ্রহী হন। অনেক ব্যবসায়ী মনে করেন রাজনীতি করলে তাঁর ব্যবসাবাণিজ্যের প্রসার হবে। সুশীল সমাজের অনেকেই প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তি করে নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তন করতে চায়। এভাবে দেশের সব পেশার মানুষ রাজনীতির ছায়ায় বাড়তি সুবিধা লাভের সুযোগ খোঁজেন। ফলে রাজনীতি আর রাজনীতিবিদদের হাতে থাকে না। রাজনৈতিক সংগঠন আর পেশাজীবীদের সংগঠন মিলেমিশে জগাখিচুড়ি হয়ে যায়। এতে পেশাজীবী এবং ব্যবসায়ীদের পেশাদারিত্বের যেমন ক্ষতি হয়, তারচেয়েও বেশি ক্ষতি হয় গণতন্ত্রের বিকাশ। এর ফলে রাজনৈতিক দলগুলোও দক্ষ ও আদর্শবান কর্মী তৈরি না করে রেডিমেড নেতা খোঁজে।
চিকিৎসক, প্রকৌশলী, খেলোয়াড়, শোবিজের তারকা এবং ব্যবসায়ীদের দলে নিয়ে নির্বাচনি বৈতরণী সহজে পার হওয়ার জন্যই রাজনৈতিক দলগুলো এটা করে। এর ফলে রাজনীতিতে আদর্শের মৃত্যু হয়, সুবিধাবাদী, মতলববাজরা রাজনীতি দখল করে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে রাজনীতি সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়। রাজনীতির পরিচয়ে বাড়ে দুর্নীতি। এই প্রবণতার আরেকটি ভয়াবহ নেতিবাচক দিক আছে। রাজনৈতিক দলগুলো পেশাজীবী এবং ব্যবসায়ীদের নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে আগ্রহী হয়। সব দল বিভিন্ন পেশায় আমার লোক, তাদের লোক খোঁজে। যে দল যখন ক্ষমতায় আসে তখনই তারা ‘আমার লোক’ খুঁজে বের করতে চায়। আমার লোক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হন, স্বাস্থ্যের মহাপরিচালক হন, যোগ্যদের টপকে সচিব হন। আর তাদের লোকরা সব জায়গায় রীতিমতো নিষিদ্ধ হয়ে যান। এই চক্রে বন্দি হয়ে আছে পেশাগত দক্ষতা, মেধার মূল্যায়ন। ব্যবসায়ী শিল্পপতিদের মধ্যে যারা নিষ্ঠার সঙ্গে তাদের ব্যবসা পরিচালনা করতে চান, অতি রাজনীতিকরণের এই দুষ্ট চক্রে সবচেয়ে সমস্যায় পড়েন তারাই। গত ৫৪ বছরে বাংলাদেশে এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে যে, ক্ষমতাসীনদের আনুকূল্য না পেলে একটা ট্রেড লাইসেন্সও পাওয়া যায় না। গ্যাসের লাইন, বিদ্যুতের লাইন, ব্যাংক ঋণ-কিছুই পাওয়া যায় না সরকারের অনুগ্রহ ছাড়া।
তাই যারা রাজনীতির সঙ্গে মোটেও সংশ্লিষ্ট নন, তারাও সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করতে বাধ্য হন। তারা কোনো রাজনৈতিক অভিলাষ থেকে এটা করেন না। তারা করেন শিল্প কারখানা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রক্ষার জন্য। হাজার হাজার শ্রমিক ও কর্মচারীর রুটি রুজির জন্য। কিন্তু সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তাদেরও দোসর বানিয়ে ফেলা হয়। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় বেসরকারি খাত। ইউনূস সরকারের দেড় বছরের শাসনকালে বেসরকারি খাত ধ্বংসের এমনই এক পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র লক্ষ্য করা গেছে। যার ফলে, বেকারত্ব বেড়েছে। দেশিবিদেশি বিনিয়োগ কমেছে। দারিদ্র্য বেড়েছে। এই সময় ইউনূস সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় হাজার হাজার কলকারখানায় মব বাহিনী হামলা চালিয়েছে, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট করেছে। বহু ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করা হয়েছে। বহু প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রতিহিংসামূলক আচরণ করে সামগ্রিকভাবে বেসরকারি খাতকেই বিপন্ন করা হয়েছে। ফলে নতুন সরকার এক ভঙ্গুর এবং ভয়াবহ অর্থনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। শুধু বেসরকারি খাত নয়, সব পেশাজীবী প্রতিষ্ঠানে আজ তীব্র দলীয়করণের কালো ছায়া। সর্বত্র চলছে আমার লোক আর তাদের লোক খোঁজার চোর-পুলিশ খেলা। এ বিষয়টি যে প্রধানমন্ত্রীর নজরে এসেছে তা বোঝা গেল দুটি ঘটনা থেকে। প্রধানমন্ত্রী ক্রীড়াবিদদের সঙ্গে বৈঠকে বলেছেন, খেলোয়াড়দের রাজনীতিতে জড়ানো উচিত নয়। এটা শুধু খেলোয়াড়দের জন্য বার্তা নয়, সব পেশাজীবীদের জন্য ওয়েকআপ কল। এর মাধ্যমে সরকার প্রধান সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দিলেন তাঁর সরকার পেশাজীবীদের দলে ভিড়িয়ে সস্তা বাহবা কুড়াতে চায় না।
দ্বিতীয়ত, সংরক্ষিত আসনের মনোনয়নের জন্য অতীতের মতো এবারও ক্ষমতাসীন দলে শোবিজের তারকারা আবেদন করেছিলেন। কিন্তু ক্ষমতাসীন বিএনপি তাদের সবাইকে হতাশ করেছে। বিএনপি দলের দুঃসময়ের যোদ্ধাদের মনোনয়ন দিয়ে জানিয়ে দিয়েছে, রাজনীতি থাকুক রাজনীতিবিদদের হাতেই। এটি একটি ইতিবাচক প্রক্রিয়া। আমাদের আশা এভাবেই পেশাজীবী এবং ব্যবসায়ীরা নিজেদের কাজে মনোযোগী হবেন। এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ।