Image description

চব্বিশ মাসের কোর্সের ফাইনাল পরীক্ষা চৌদ্দ মাস পরই নিতে চান শিক্ষামন্ত্রী। এর ফলে এসএসসি ও এইচএসসির প্রায় ৩০ লাখ শিক্ষার্থীসহ শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে উৎকণ্ঠা সৃষ্টি হয়েছে। শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিখন শূন্যতা রেখে কোনো পরীক্ষার আয়োজন করা যাবে না। অভিভাবকরা বলছেন, ছাত্রছাত্রীরা স্কুল-কলেজে যায় শেখার জন্য, শুধু পরীক্ষা দিতে নয়। শিক্ষামন্ত্রী চাইলেই হুটহাট করে কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে পারেন না। এজন্য অংশীজনের মতামত নিতে হবে। এরই মধ্যে শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, ডিসেম্বরে পরীক্ষা নিতে না পারলে তাদের পানিশমেন্ট (শাস্তি) দেওয়া হবে। এদিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র দুই মাসের মাথায় শিক্ষামন্ত্রীর নানা বক্তব্য ও আচরণ ঘিরে সমাজের বিভিন্ন স্তরে তীব্র হাস্যরসের সৃষ্টি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিক্ষামন্ত্রীকে নিয়ে ট্রল শুরু করেছেন ছাত্র-ছাত্রীরাও।

জানা যায়, জানুয়ারিতে শিক্ষাবছর শুরু করে ডিসেম্বরে একাডেমিক কোর্স শেষে সব পরীক্ষা নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তিনি বলেছেন, শিক্ষার্থীদের জীবন থেকে গুরুত্বপূর্ণ সময় যেন নষ্ট না হয় এজন্যই এই উদ্যোগ। তবে মন্ত্রীর এমন বক্তব্যের পর এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার অপেক্ষায় থাকা ছাত্রছাত্রী ও অভিভাবকেরা পড়েছেন উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্যে। কারণ আগামী বছরে এইচএসসি পরীক্ষার অপেক্ষায় থাকা শিক্ষার্থীরা একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিলেন গতবছরের সেপ্টেম্বরে। তারা ক্লাস শুরু করেছিলেন গত সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে। চলতি বছরের ডিসেম্বরে তাদের পরীক্ষা নেওয়া হলে দুই বছরের কোর্স শেষ করতে হবে ১৪ মাসে। এতে তৈরি হবে বড় ধরনের শিখন শূন্যতা। না শিখেই পরীক্ষায় বসতে হবে তাদের। শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিখন শূন্যতা রেখে কোনো পরীক্ষার আয়োজন করা যাবে না। শিক্ষাব্যবস্থা থেকে নকল প্রায় বিলুপ্ত হলেও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গিয়ে ‘নকল আর হবে না’ বলে ছাত্র-ছাত্রীদের সতর্ক করেছেন শিক্ষামন্ত্রী। এটি নিয়েও সমাজের বিভিন্ন মহলে তৈরি হয়েছে হাস্যরসের। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে শিক্ষামন্ত্রীকে ‘নকলমন্ত্রী’ আখ্যা দিয়ে ট্রল করছেন। দেশের বিভিন্ন স্থানে এহছানুল হক মিলনের পদত্যাগ দাবিতে হয়েছে বিক্ষোভ মিছিলও। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মিলন ২০০১-০৬ মেয়াদে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। চিন্তা-চেতনায় এখনো দুই দশক পেছনেই পড়ে আছেন তিনি। নতুন প্রজন্মের ছাত্র-ছাত্রীদের পালস এখনো তিনি বুঝতে পারেননি।

গত মঙ্গলবার থেকে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা শুরু হয়েছে সারা দেশে। আগামী জুলাইয়ে শুরু হবে এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা। সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী আগামী ডিসেম্বরে ফের এসএসসি ও সমমান এবং এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা হওয়ার কথা। অথচ রীতি অনুযায়ী এই ছাত্রছাত্রীদের আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাইয়ের মধ্যে পরীক্ষায় বসার কথা ছিল। আসলেই কোনো বছর থেকে ডিসেম্বরে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে সে ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট করে কিছু জানাতে পারেননি শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলনও। চলতি বছর থেকেই শুরু হবে নাকি আগামী বছর থেকে এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে- তা জানতে সাংবাদিকরা দফায় দফায় মন্ত্রীর কাছে জানতে চাইলেও নির্দিষ্ট করেননি তিনি। তবে মিলন বলেন, জানুয়ারিতে ক্লাস শুরু হয়েছে। ডিসেম্বরে কোর্স শেষ হলে একজন শিক্ষার্থীর জীবন থেকে কেন এক বছর সময় নষ্ট হয়ে যাবে? আমি এমনটি চাই না। আসন্ন জুলাইয়ে এইচএসসির পাবলিক পরীক্ষা নেওয়ার পর আগামী ডিসেম্বরে ফের এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়ার সক্ষমতা শিক্ষাবোর্ডগুলোর রয়েছে কি না- সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে এহছানুল হক মিলন বলেন, শিক্ষাবোর্ডের কারণে তো পরীক্ষা পেছাবে না। বোর্ডের দায়িত্বই তো পরীক্ষা নেওয়া। শিক্ষাবোর্ড পরীক্ষা নিতে ফেল করলে তাদের পানিশমেন্ট হবে।

শিক্ষাবোর্ডের কর্মকর্তারা জানান, চলমান এসএসসির পরীক্ষার পর খাতা দেখা ও ফল প্রকাশ শেষে উচ্চমাধ্যমিকের ভর্তি কার্যক্রম শুরু হবে। এর পর জুলাই থেকে শিক্ষার্থীদের এইচএসসির শিক্ষা সেশন শুরু হবে। গতবছর উচ্চমাধ্যমিকে ভর্তি হওয়া ছাত্রছাত্রীদের কলেজে ক্লাস শুরু হয়েছে সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে। তবে শিক্ষামন্ত্রী এই শিক্ষা সেশন জানুয়ারি থেকে শুরু করতে চান।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান এই প্রতিবেদককে বলেন, শিক্ষামন্ত্রী ডিসেম্বরে যাদের এসএসসি পরীক্ষা নিতে চান, তাদের জানুয়ারি থেকে কলেজে ক্লাস করাতে চান কীভাবে? তাদের ফল প্রকাশ, ভর্তি কার্যক্রম শেষ করতে তো কমপক্ষে তিন মাস পেরিয়ে যাবে। ডিসেম্বরে এসএসসি পরীক্ষা নিলে কোনোভাবেই জানুয়ারি থেকে এইচএসসিতে পাঠদান শুরু করার সুযোগ নাই। এ বিষয়ে প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, বছরের নির্দিষ্ট সময়ে পরীক্ষাগুলো নেওয়া দরকার। কিন্তু চলতি বছর থেকেই যদি ডিসেম্বরে পরীক্ষার আয়োজন করা হয় তবে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে শিখন-ঘাটতি তৈরি হবে। এটি ধাপে ধাপে করা যেতে পারে। তাই চলতি বছরের ডিসেম্বরে পরীক্ষাগুলো না নিয়ে আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি-মার্চে পরীক্ষার আয়োজন করা যেতে পারে।

অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি জিয়াউল কবির দুলু এই প্রতিবেদককে বলেন, পড়ালেখার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে জ্ঞান অর্জন করা, পরীক্ষা নয়। শিক্ষার্থীরা কতটুকু শিখল তা জানতে পরীক্ষা নেওয়া হয়। শিখন ঘাটতি রেখে, দুই বছরের কোর্স দেড় বছরের কম সময় পড়িয়ে পরীক্ষা নিলে সেটি হবে আত্মঘাতী। এটি কখনো সুফল বয়ে আনবে না। তিনি অংশীজনের মতামত নিয়ে ধাপে ধাপে যে কোনো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের পরামর্শ দেন।