চাঁদ সওদাগরের চাঁদপুর জাতীয়তাবাদী শক্তির উর্বর ভূমি হিসেবে পরিচিত। দশকের পর দশক এখানে রাজত্ব ছিল বিএনপির। ১৯৯১ ও ২০০১ সালের নির্বাচনে জেলার সব আসনই পেয়েছিল শহীদ জিয়ার অনুসারীরা। বিএনপির জন্য এখনো এই জেলার মাটি উর্বর। তাইতো ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে নতুন উদ্যমে জেগে ওঠেছে বিএনপি নেতাকর্মীরা। পুরো জেলাজুড়ে এখন বিরাজ করছে নির্বাচনী আমেজ।
জেলার পাঁচটি সংসদীয় আসনের মধ্যে চারটিতে বিএনপির জোয়ার দেখা যাচ্ছে। নিরঙ্কুশ বিজয়ের প্রত্যাশায় নেতাকর্মীরা এখন ফুরফুরে মেজাজে। তবে দলটি বেকায়দায় রয়েছে বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত চাঁদপুর-৪ আসন ফরিদগঞ্জে। উপজেলা বিএনপির (সদ্য বহিষ্কৃত) সভাপতি এম এ হান্নান বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ায় এ আসনে লড়াই হবে বিএনপি বনাম বিএনপি বিদ্রোহী প্রার্থীর মধ্যে, এমন ধারণা সাধারণ ভোটারদের মাঝে। তবে শেষ পর্যন্ত জয়ী হতে পারে ধানের শীষ।
এদিকে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ার সুযোগে চাঁদপুরে নড়েচড়ে ওঠে জামায়াত ইসলামী। তারা ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির দুর্গে ভাগ বসাতে চায়। এমন লক্ষ্য সামনে রেখে কাজ করছে জামায়াতসহ ১১ দলীয় জোট। জেলার অন্তত একটি আসনে জামায়াত প্রার্থীর জয়লাভের ব্যাপারে তারা আশাবাদী।
চাঁদপুর-১ : জেলার কচুয়া উপজেলা নিয়ে গঠিত চাঁদপুর-১ আসন। এই আসনে মোট ভোটার সংখ্যা তিন লাখ ৫৬ হাজার ৪৮৫ জন। এর মধ্যে এক লাখ ৮৪ হাজার ৮০২ জন পুরুষ, এক লাখ ৭১ হাজার ৬৮০ জন নারী ও তিনজন তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন।
আসন্ন নির্বাচনে এ আসনে প্রার্থী ছয় জন। এর মধ্যে বিএনপি থেকে ধানের শীষ প্রতীকে ড. আ ন ম এহসানুল হক মিলন, জামায়াত ইসলামী থেকে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে আবু নছর মো. মকবুল আহমেদ, গণঅধিকার পরিষদ থেকে ট্রাক প্রতীকে এনায়েত হোসেন, গণফোরাম থেকে উদীয়মান সূর্য প্রতীকে মোহাম্মদ আজাদ হোসেন, ইসলামী ফ্রন্ট থেকে মোমবাতি প্রতীকে মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন ও জাতীয় পার্টি থেকে লাঙ্গল প্রতীকে হাবিব খান।
সাবেক শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন দুই মেয়াদে এ আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী রেজিমে তিনি ৩৭টি মিথ্যা মামলার শিকার হয়ে দীর্ঘ সময় কারাবরণ করেন। সারাদেশে পাবলিক পরীক্ষায় নকল উৎখাতসহ শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নে মিলনের ভূমিকা অনন্য উচ্চতায়। আর এ কারণেই কচুয়াবাসীর কাছে বিজয়ের এক নাম এছানুল হক মিলন।
এ আসনে মিলনের প্রতিদ্বন্দ্বী ১১ দলীয় জোট প্রার্থী আবু নছর মো. মকবুল আহমেদ ভোটের ব্যবধান কমিয়ে আনতে মাঠে চষে বেড়াচ্ছেন। ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ভোট প্রার্থনা করছেন।
চাঁদপুর-২ : জেলার মতলব উত্তর ও মতলব দক্ষিণ উপজেলা নিয়ে গঠিত চাঁদপুর-২ আসনটি। এই আসনে মোট ভোটার সংখ্যা পাঁচ লাখ এক হাজার ৬১ জন। এর মধ্যে দুই লাখ ৫৬ হাজার ৫০০ জন পুরুষ, দুই লাখ ৪৪ হাজার ৫৫৯ জন নারী ও দুই জন তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন।
আসন্ন নির্বাচনে আসনটিতে প্রার্থী সংখ্যা আট জন। এর মধ্যে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকে ড. মো. জালাল উদ্দিন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের হাতপাখা প্রতীকে মানসুর, জাতীয় পার্টি লাঙ্গল প্রতীকে এমরান হোসেন মিয়া, এলডিপির ছাতা প্রতীকে বিল্লাল হোসেন মিয়াজী, লেবার পার্টির আনারস প্রতীকে নাসিমা নাজনীন, বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টির হাতি প্রতীকে মো. ফয়জুন্নুর, গণঅধিকার পরিষদের ট্রাক প্রতীকে মো. গোলাফ হোসেন ও নাগরিক ঐক্যের মো. এনামুল হক।
সাবেক সংস্থাপন প্রতিমন্ত্রী মরহুম নুরুল হুদার হাতে গড়া বিএনপির উর্বর ভূমিতে মনোনয়ন পেয়েছেন জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ড. মো. জালাল উদ্দিন। তিনি এ আসনে ২০১৮ সালেও বিএনপি থেকে মনোনয়ন পেয়েছিলেন। নুরুল হুদার অবর্তমানে বিএনপির দুঃসময়ে নেতা-কর্মীদের পাশে থাকা জালাল উদ্দিনকে জনগণ প্রাণভরে ভালোবাসেন। এ আসনে জালাল উদ্দিনের প্রতিদ্বন্দ্বী ১১ দলীয় জোট প্রার্থী বিল্লাল হোসেন মিয়াজী এলডিপি (ছাতা) গণসংযোগ করছেন। হঠাৎ করে তিনি কেন্দ্র থেকে নাজিল হওয়ায় বেকায়দায় পড়েছেন ১১ দলীয় জোট নেতাকর্মীরা।
চাঁদপুর-৩ : জেলার চাঁদপুর সদর উপজেলা এবং হাইমচর উপজেলা নিয়ে গঠিত চাঁদপুর-৩ আসনটি। এই আসনে মোট ভোটার সংখ্যা পাঁচ লাখ ৪৬ হাজার ৩৩৪ জন। এর মধ্যে দুই রাখ ৮২ হাজার ৭০৪ জন পুরুষ, দুই লাখ ৬৩ হাজার ৬২৮ জন নারী ও দুই জন তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন।
আসন্ন নির্বাচনে এ আসনে প্রার্থী সাত জন। এর মধ্যে বিএনপি থেকে ধানের শীষ প্রতীকে শেখ ফরিদ আহমেদ মানিক জামায়াতের দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে অ্যাডভোকেট শাহাজাহান মিয়া, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশে হাতপাখা প্রতীকে শেখ জয়নাল আবেদিন, ইসলামী ফ্রন্ট থেকে মোমবাতি প্রতীকে এ এইচ এম আহসান উল্লাহ, গণঅধিকার পরিষদ থেকে ট্রাক প্রতীকে সাংবাদিক জাকির হোসেন, কমিউনিস্ট পার্টি থেকে কাস্তে প্রতীকে কমরেড জাহাঙ্গীর হোসেন, গণফোরাম থেকে উদীয়মান সূর্য থেকে অ্যাডভোকেট সেলিম আকবর।
চাঁদপুর জেলা বিএনপি সভাপতি শেখ ফরিদ আহমেদ মানিক ১৬ বছর ধরে স্থানীয় বিএনপির অঘোষিত কর্ণধার। ২০১৮ সালেও বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছিলেন মানিক। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের রাতের ভোটের আমলে তাকে গৃহবন্দী করা হয়। এ আসনে অপ্রতিদ্বন্দ্বী মানিক বিরতিহীনভাবে চষে বেড়াচ্ছেন নির্বাচনী মাঠ-ঘাট। সাংগঠনিক শক্তি তাকে আসনটিতে এগিয়ে রেখেছে। বিএনপির দুর্গ হিসেবে পরিচিত চাঁদপুর জেলার সদর আসনটিতে নেতাকর্মীরা রয়েছেন ফুরফুরে মেজাজে।
অপরদিকে ১১ দলীয় জোট তথা জামায়াতের প্রার্থী চাঁদপুর জেলা শাখার সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট শাহজাহান মিয়া অবিরত গণসংযোগ করছেন। তিনি ২০১৪ সালে সদর উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনিও আশা ছাড়ছেন না বিজয়ী হওয়ার।
চাঁদপুর-৪ : জেলার ফরিদগঞ্জ উপজেলা নিয়ে গঠিত চাঁদপুর-৪ আসনটি। এই আসনের মোট ভোটার সংখ্যা চার লাখ ৬৩১ জন। এর মধ্যে দুই লাখ আট হাজার ৬০৩ জন পুরুষ, এক লাখ ৯২ হাজার ২৭ জন নারী ও একজন তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন।
আসন্ন নির্বাচনে এ আসনে প্রার্থী আট জন। এর মধ্যে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকে লায়ন মো. হারুনুর রশীদ, জামায়াতে ইসলামীর দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে বিল্লাল হোসেন মিয়াজী, স্বতন্ত্র থেকে ঘুড়ি প্রতীকে জাকির হোসাইন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের হাতপাখা প্রতীকে মকবুল হোসেন, জাতীয় পার্টির লাঙ্গল প্রতীকে মাহমুদ আলম, স্বতন্ত্র থেকে চিংড়ি প্রতীকে মো. আব্দুল হান্নান, গণফোরামের উদীয়মান সূর্য প্রতীকে মনির চৌধুরী, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট থেকে মোমবাতি প্রতীকে মো. আব্দুল মালেক বুলবুল।
২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি জাতীয় সংসদে যে ২৭টি আসন পায়, তার মধ্যে ফরিদগঞ্জ একটি। ওই সময় এ আসন থেকে নির্বাচিত হয়েছিলেন লায়ন মো. হারুনুর রশীদ। দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটির রাজস্ব ও ব্যাংকিংবিষয়ক সম্পাদক হারুনুর রশীদ এবারো জয়ের ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী। জেলার সর্বাধিক প্রবাসী অধ্যুষিত ফরিদগঞ্জ উপজেলা সৃষ্টির শুরু থেকেই বিএনপি’র অপ্রতিদ্বন্দ্বী দুর্গ হিসাবে পরিচিত।
ফরিদগঞ্জে উপজেলা বিএনপির (সদ্য বহিষ্কৃত) সভাপতি এম এ হান্নান মনোনয়ন না পেয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ায় বেকায়দায় পড়েছেন নেতাকর্মীরা। এম এ হান্নান এর অনুগতদের বিশ্বাস নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগকে সাথে নিয়ে তারা ধানের শীষের মোকাবেলা করবেন। সেই ক্ষেত্রে এ আসনে লড়াইয়ের সম্ভাবনা থেকে যাচ্ছে। সাধারণ ভোটারদের ধারণা এ আসনে লড়াই হবে বিএনপি বনাম বিএনপি বিদ্রোহী প্রার্থীর মধ্যে। শেষ পর্যন্ত জয়ী হবে ধানের শীষ।
এ আসনে ১১দলীয় জোট তথা জামায়াত মনোনীত প্রার্থী মাওলানা বিল্লাল হোসেন মিয়াজী এলাকায় সমধিক পরিচিত ব্যক্তি। তিনি চাঁদপুর জেলা জামায়াতের আমির। নির্বাচনে যেকোনো প্রার্থীর জন্য প্রতিদ্বন্দ্বী বলে দাবি করছেন তার সমর্থকরা।
চাঁদপুর-৫ : জেলার হাজীগঞ্জ উপজেলা এবং শাহরাস্তি উপজেলা নিয়ে গঠিত চাঁদপুর-৫ আসন। এই আসনের মোট ভোটার সংখ্যা পাঁচ লাখ ২৬ হাজার ৬৭৯ জন। এর মধ্যে দুই লাখ ৬৯ হাজার ২৪৩ জন পুরুষ, দুই লাখ ৫৭ হাজার ৪৩৩ জন নারী ও তিনজন তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন।
আসন্ন নির্বাচনে এ আসনে প্রার্থী সাত জন। এর মধ্যে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকে ইঞ্জি. মমিনুল হক, ইসলামী ফ্রন্ট বাংলাদেশ থেকে চেয়ার প্রতীকে মুহাম্মদ বাহাদুর শাহ মোজাদ্দেদী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ থেকে হাতপাখা প্রতীকে মোহাম্মদ আলী পাটওয়ারী, জাতীয় পার্টির লাঙ্গল প্রতীকে মির্জা গিয়াস উদ্দিন, এলডিপির ছাতা প্রতীকে ড. নিয়ামুল বশির, ইনসানিয়াত বিল্পব থেকে আপেল প্রতীকে মাহমুদ হাসান নয়ন ও স্বতন্ত্র থেকে ফুটবল প্রতীকে মো. জাকির হোসেন।
বিএনপির এই উর্বর ভূমিতে আগে দলটির পাঁচবার এমপি ছিল মরহুম এম এ মতিন। একতরফা, রাতের ভোট এবং ডামি নির্বাচনের মাধ্যমে মাঝে রাজত্ব করেছে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আসনটি সহজেই পুনরুদ্ধারে একাট্টা মমিনুল হক ও বিএনপির নেতাকর্মীরা। জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি প্রকৌশলী মো. মমিনুল হক ২০১৮ সালেও মনোনয়ন পেয়েছিলেন।
এ আসনে ১১ দলীয় জোট তথা এলডিপির প্রার্থী ড. নিয়ামুল বশির (ছাতা) নির্বাচনী এলাকায় নতুন মেহমান। হঠাৎ করে উড়ে এসে জুড়ে বসায় বিব্রত ১১ দলীয় জোট কর্মী সমর্থকরা।