Image description
বন্ধ হয়নি পলিথিন কমেনি কোনো দূষণ সবুজায়নও থমকে

‘নদীর স্বচ্ছ পানিতে খেলবে ডলফিন, পাখির কিচিরমিচিরে ঘুম ভাঙবে নগরবাসীর, প্লাস্টিকে দূষিত হবে না মাটি-পানি, চারদিকে থাকবে সবুজের সমারোহ, নির্মল বাতাসে নেওয়া যাবে শ্বাস, থাকবে না গাড়ির হর্নের ঝাঝালো শব্দ।’ এমন এক দূষণমুক্ত, শান্ত ও সবুজ দেশের স্বপ্ন দেখেছিল মানুষ অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর। পরিবেশ রক্ষাকে নীতিগত অগ্রাধিকার দিয়ে একের পর এক ঘোষণা, আইন ও নির্দেশনা মানুষকে এমন স্বপ্ন দেখিয়েছিল। তবে দেড় বছর পর অন্তর্বর্তী সরকারের বিদায়ের মুহূর্তে সেই স্বপ্নের বেশির ভাগই রয়ে গেছে কাগজে-কলমে। বাস্তবতায় দূষণ কমেনি, পলিথিন বন্ধ হয়নি, নদী দখল ও দূষণমুক্ত হয়নি- বরং অনেক ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও অবনতি হয়েছে। মোট কথা তর্জনগর্জনেই শেষ পরিবেশ রক্ষার উদ্যোগ।

পরিবেশবিদরা বলছেন, অরাজনৈতিক সরকার হওয়ায় গত দেড় বছরে পরিবেশ রক্ষায় কঠোর ও জনবান্ধব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের প্রত্যাশা ছিল বেশি। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন পরিবেশকর্মীকে উপদেষ্টা হিসেবে পাওয়ায় আশাবাদ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু, পরিবেশ রক্ষায় ঘোষণার ঢেউ থাকলেও বাস্তবায়ন দৃশ্যমান হয়নি। ২০০২ সালে দেশে পলিথিন নিষিদ্ধ হলেও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় তা আবার ফিরে আসে। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়ে ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে সুপারশপে ও নভেম্বর থেকে কাঁচাবাজারে পলিথিন শপিং ব্যাগ বন্ধের নির্দেশ দেয়। পলিথিন কারখানার বিরুদ্ধেও অভিযানের ঘোষণা আসে। কিন্তু বাজারে এর কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি। উল্টো পলিথিনের ব্যবহার বেড়েছে।

নদীদূষণ ঠেকাতে গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা ও আশপাশের চার জেলার ২ হাজারের বেশি শিল্পকারখানাকে সার্বক্ষণিক ইটিপি চালুর চূড়ান্ত নোটিশ দেওয়া হয়। অথচ শীত মৌসুম আসতেই সেই নদীগুলোর পানি আবার কুচকুচে কালো হয়ে উঠেছে। নদী দখলমুক্ত করতেও এখন আর নিয়মিত অভিযান নেই বললে চলে। কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন।

শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকাকে ‘নীরব এলাকা’ ঘোষণা এবং জরিমানা বাড়ানো হলেও হর্নের তাণ্ডব থামেনি। ১৬ মাসেও কার্যকর হয়নি নির্দেশনা। একইভাবে বায়ুদূষণ কমাতে ঢাকার খোলা জায়গায় ঘাস লাগানো, পুরোনো বাস স্ক্র্যাপ করা এবং রাস্তার ধুলা নিয়ন্ত্রণে টাস্কফোর্স মাঠে নামানোর ঘোষণা থাকলেও বাস্তবায়ন হয়নি কিছুই। এখনো বিশ্বের দূষিত শহরের তালিকায় শীর্ষে প্রায়ই থাকছে ঢাকার নাম। উল্টো গত নভেম্বরে এক সেমিনারে পরিবেশ উপদেষ্টা নিজেই অসহায়ত্ব প্রকাশ করে বলেন, ঢাকার একেকটা বাস যেন চলন্ত দূষণ-কারখানা। বছরের পর বছর আমরা সমস্যা নিয়ে কথা বলি, কিন্তু সমাধানের জন্য সাহসী সিদ্ধান্ত নেই না। পরিবেশবান্ধব উন্নয়নের কথা বলে শত শত ইটভাটা ভেঙে ফেলা হলেও বিকল্প হিসেবে কংক্রিট ব্লক সম্প্রসারণে কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি। পলিথিনের বিকল্প হিসেবে পচনশীল পলিব্যাগ বাজারে আনতেও ব্যর্থ হয়েছে সরকার।

পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন আন্দোলনের (পারিজা) সভাপতি এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. আবদুস সোবহান বলেন, বর্তমান পরিবেশ উপদেষ্টার কাছে প্রত্যাশা ছিল সবচেয়ে বেশি। কারণ, তিনি পরিবেশকর্মী হিসেবে দেশে-বিদেশে বহু অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন। এ নিয়ে তার অনেক লেখালেখিও আছে। কিন্তু বাস্তবে তিনি শুধু আইন সংশোধন ও বিধিমালা তৈরিতেই সময় কাটিয়েছেন।