Image description

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের কাউন্টডাউন শুরু হয়ে গেছে। নির্বাচনের আর মাত্র এক সপ্তাহ বাকি। নির্বাচন কমিশন থেকে শুরু করে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী সব পক্ষই প্রস্তুত। দেশি-বিদেশি গণমাধ্যম থেকে শুরু করে দেশের গণমাধ্যমে স্টেকহোল্ডারদের নির্বাচনী প্রচারণা চলছে ব্যাপকভাবে। প্রধান উপদেষ্টা, সেনাপ্রধান ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে দৃঢ় অবস্থানে। নির্বাচনের আগে ওয়ান-ইলেভেনের মতো ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হওয়া প্রায় অসম্ভব।

তারপরও নির্বাচন নিয়ে জনমনে যেন সন্দেহের শেষ নেই। নির্বাচন কী হচ্ছে? নির্বাচন হলেও জনগণের ভোটাধিকার অনুযায়ী কী প্রত্যাশিত ফলাফল হবে? নাকি ভোটাররা ভোট দিলেও ২০০৮ সালের মতো পর্দার আড়ালে ফলাফলে ক্যারিশমা ঘটবে? বিদেশে পোস্টাল ব্যালটের বান্ডিল জামায়াত নেতার বাসায় আবিষ্কার, লক্ষ্মীপুরে জামায়াত নেতার নির্দেশে ভোটের সিল তৈরি ঘটনা প্রকাশ, ঢাকার বস্তি ও গ্রামের স্বল্প আয়ের মানুষের কাছ থেকে জামায়াত প্রার্থীদের আইডি নম্বর ও বিকাশ নম্বর সংগ্রহ এবং দেশপ্রেমী সেনাবাহিনীকে অবমাননা করে জামায়াত প্রার্থীর বক্তব্য ভাইরাল হওয়ার পর তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি উঠলেও নির্বাচন কমিশনের দায় এড়ানোর কৌশল এবং ভোট গ্রহণে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে জামায়াত অনুগত ব্যক্তিদের পুলিং অফিসার নিয়োগÑ ইত্যাদি কারণে ভোটের ফলাফল নিয়ে সন্দেহ ও সংশয়ের সৃষ্টি হচ্ছে।

জানতে চাইলে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশকে গণতান্ত্রিক উত্তরণে বাধা দেয়ার জন্য দেশের অভ্যন্তরে-বাইরে এবং বেশ কিছু শক্তি চায়, আমরা একটা মোটামুটি নৈরাজ্যকর অবস্থায় যাই। আই অ্যাম সরি, নির্বাচন এত ছোট বিষয় নয়। যথেষ্ট এম্পিরিকাল (প্রায়োগিক) প্রমাণ আছে যে, অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন যদি একটার পর একটা হতে থাকে, তাহলে দেশের পরিবর্তন হতে বাধ্য হয়। কিন্তু গভীর ষড়ষন্ত্র করে নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য যখন রাজনৈতিক দল কাজ করে তখন সে রাজনৈতিক দলের চরিত্র নষ্ট হয়। বাংলাদেশে জনগণের দ্বারে দ্বারে গিয়ে রাজনীতি করলে আপনাকে মানুষ চিনবে, তবে আপনার উল্টা পিঠটা ভালো না হলে মানুষ ছুড়ে ফেলতে দেরি করবে না। লক্ষ্মীপুরে নির্বাচনের আগ মুহূর্তে জামায়াত নেতার কাছে ভোটের সিল পাওয়ার এই ঘটনা দেশজুড়ে ভোটের ফলাফলকে নির্দিষ্ট দিকে প্রভাবিত কি-না তা নিয়ে শঙ্কা আছে। সিল কি শুধু স্থানীয়ভাবে একজন নেতা লক্ষ্মীপুরে বানিয়েছেন নাকি এটি কোনো রকমের প্ল্যানের অংশ। নানা রকমের প্ল্যানের কথা আমরা দেখতে পাচ্ছি।’

গতকালও জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট সমর্থিত এবি পার্টির ফেনী-২ আসনে প্রার্থী মোহাম্মদ মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, ‘লেবেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে প্রশাসনের অনেক ঘাটতি দেখতে পাচ্ছি। দুই-চারটি নির্বাচনী অফিস ভাঙচুর করে লোকদের ভয়ভীতি দেখালে নির্বাচনে অনুকূল পরিবেশ থাকবে না। তবে সুষ্ঠু নির্বাচন হলে জনগণ অবশ্যই জবাব দেবে।’

অন্তর্বর্তী সরকার এবং নির্বাচন কমিশনের ভাবখানাÑ যেকোনোভাবেই নির্বাচন সম্পন্ন করে দিতে পারলেই হলো। নির্বাচনে অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা থাকল কিনা, আচরণবিধি লঙ্ঘন হলো কি-না, পর্দার আড়ালে ভোটারদের টাকা দিয়ে ভোট ক্রয় করা হলো কি-না, সে সব নিয়ে ভ্রুক্ষেপ নেই। এবারই প্রথম পোস্টাল ব্যালটে প্রবাসীরা ভোট দেয়ার সুযোগ পেয়েছেন। নির্বাচন কমিশন নিয়ম মেনেই প্রবাসীদের কাছে বিদেশে পোস্টাল ব্যালট পাঠিয়েছে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক দেশে দেখা গেছে, সে পোস্টালের বান্ডিল জামায়াত নেতার হাতে। এমনকি কোনো কোনো দেশ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, পোস্টাল ব্যালটি আগে থেকেই দাঁড়িপাল্লায় সিল মারা অবস্থায় কয়েকজন ভোটারের হাতে দেয়া হয়েছে। জামায়াত নেতার বাসায় পোস্টাল ব্যালটের বান্ডিল সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়ায় তোলপাড় শুরু হয়। ১৫ জানুয়ারি বিএনপির পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ দায়ের করা হয়। ওই দিন প্রধান নির্বাচন কমিশনারের (সিইসি) সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ জানান, পোস্টাল ব্যালটে প্রতীক বিন্যাসের ভুলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বিএনপি। দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, পোস্টাল ব্যালটে জামায়াতের প্রতীক প্রথম সারিতে এবং বিএনপির প্রতীক সপ্তম সারিতে দেয়া হয়েছে। এছাড়া বিদেশে জামায়াত নেতার বাসায় পোস্টাল ব্যালটের বান্ডিল পাওয়া গেছে। পোস্টাল ব্যালট নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। পোস্টাল ব্যালটে ধানের শীষ প্রতীক বিন্যাসের ব্যাখ্যা দিতে হবে। পোস্টাল ব্যালট পেপারের ভুল-ভ্রান্তিতে বিএনপি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্যদিকে, পোস্টাল ব্যালট নিয়ে জামায়াতের বিরুদ্ধে অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা দাবি করেন দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ। তিনি বলেন, ‘বাহরাইনে জামায়াত নেতার কাছে পোস্টাল ব্যালটের ভিডিও নিয়ে যে অভিযোগ তা সম্পূর্ণ মিথ্যা।’

গত ৪ ফেব্রুয়ারি লক্ষ্মীপুরে মো. সোহেল নামের একজনের দোকান থেকে ১৬ ঘর-বিশিষ্ট ছয়টি ভোটের সিল জব্দ করা হয়। লক্ষ্মীপুর সদর মডেল থানার এসআই হুমায়ুন কবীর বাদী হয়ে দুজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। গ্রেফতারকৃতরা জানান, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে জাল ভোট প্রদানের জন্য জামায়াত নেতা শরীফের নির্দেশে সিলগুলো তৈরি করা হয়েছে। অবশ্য লক্ষ্মীপুর জেলা জামায়াতের আমির ও লক্ষ্মীপুর-২ আসনের প্রার্থী এসইউএম রুহুল আমিন ভূঁইয়া সিল তৈরির কথা স্বীকার করেছেন। তিনি অবশ্য বলেছেন, সিলগুলো জব্দের পরপরই শরীফকে দল থেকে বহিষ্কার করেছি। দ্রুত সময়ের মধ্যে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দেয়া হবে। নির্বাচনের আগে এত ভয়াবহ ঘটনার পরও নির্বাচন কমিশন কার্যত দৃশ্যমান কোনো শাস্তিমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। বাহরাইনে জামায়াত নেতার বাসায় পোস্টাল ব্যালট পাওয়া নিয়ে ইসি সচিব আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, ‘পোস্টাল ব্যালট নিয়ে কোথাও কোনো অসঙ্গতি ঘটলে কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। কেউ চিহ্নিত হলে তাদের বিরুদ্ধে ক্রিমিনাল চার্জ আনা হবে। তিনি বলেন, ‘সামাজিক মাধ্যমে পোস্টাল ব্যালটের ভিডিও প্রকাশ পেয়েছে। এসব ব্যাপারে বিভিন্ন দেশের অ্যাম্বাসির সঙ্গে যোগাযোগ করে খোঁজ নেয়া হয়েছে। সউদী আরব, দুবাই, আবুধাবি, কাতারে পোস্টাল ব্যালট নিয়ে কোনো সমস্যা হয়নি। পোস্টাল ব্যালটের সঙ্গে দেশের ভাবমর্যাদা ও শ্রম-বাজারের ভবিষ্যৎ জরুরি। অসঙ্গতি বেশি হলে লাইভ ভেরিফিকেশন বাধ্যতামূলক করা হবে।’

এদিকে গত বুধবার রাজধানীর পুরান ঢাকার সূত্রাপুরে জামায়াতে ইসলামীর এক সদস্যের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ক্রিকেট খেলার ১৫২টি স্ট্যাম্প উদ্ধার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। অভিযান শেষে উপস্থিত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট জানান, মোট ১৫২টি ক্রিকেট স্ট্যাম্প উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় বাড়ির মালিককে সতর্ক করা হয়েছে। তবে অভিযান চলাকালে কাউকে গ্রেফতার করা হয়নি। নির্বাচনের প্রাক্কালে এমন একটি স্থানে অভিযান ও বিপুল সামগ্রী উদ্ধারের ঘটনা নতুন করে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছেÑ ওই সব দিয়ে জামায়াত কি করবে ভোটের দিন?

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম খান বলেছেন, আগামী জাতীয় নির্বাচন যদি সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ না হয়, তাহলে দেশের মানুষের হতাশার শেষ থাকবে না। গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার সুযোগ নষ্ট না করার জন্য সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। গণতন্ত্রের মূল বাহন হচ্ছে নির্বাচন এবং যেখানে নির্বাচন নেই, সেখানে গণতন্ত্রও নেই। জনগণের মতপ্রকাশের সুযোগ নিশ্চিত করতে নিরপেক্ষ নির্বাচন অত্যন্ত জরুরি। এবারের নির্বাচনের চ্যালেঞ্জ অনেক বেশি।

নির্বাচনে জামায়াত ধর্মের ব্যবহার বা কটু শব্দ প্রয়োগে খুব বেশি অ্যাগ্রেসিভ মোডে প্রার্থীদের প্রচারণা চালাচ্ছে অভিযোগ করে রাজনৈতিক বিশ্লেষক মোস্তফা ফিরোজ বলেন, প্রচারণায় প্রার্থীরা যেসব শব্দ ব্যবহার করে অথবা যে সেন্টিমেন্ট নিয়ে পাবলিকের কাছে যায়, এসব নিয়ে দুপক্ষেই কথা হচ্ছে। তবে নির্বাচনের নিরপেক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে ভাবতে হবে নির্বাচন কমিশনকে। কারণ এবারের নির্বাচনটা নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ। কোনোভাবেই যদি নির্বাচন বিতর্কিত হয় সে ক্ষেত্রে এই সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং যারা গত ১৫ বছরে রাজপথে আন্দোলন করেছে তারা সবাই ভোগান্তিতে পড়বে। নির্বাচন কমিশনের আচরণবিধি প্রতিপালনে যারা মনিটরিং করবে তারা কারা? তারা হচ্ছে পুলিশ, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। আপনি দেখেন গত ১৫ বছরের পুলিশ কি সেটি করতে পারছে? তারা তো নিজেরাই একটি আত্মনিরাপত্তাহীনতায় আছে। তবে একটি নির্বাচন আয়োজনের জন্য দেশের এমন মুহূর্তে নির্বাচন কমিশনের মনিটরিং সেল বা তদন্ত কমিটি ব্যাপক কাজ করার কথা; কিন্তু আসলে তা হচ্ছে না।