ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আসল ফ্যাক্টর হয়ে উঠেছেন দেশের কোটি কোটি নারী ভোটার। ভোটের পুরো সমীকরণই বদলে যেতে পারে এই নারী ভোটারদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে। ফলে আগামী সরকার কারা গঠন করবেন তা নির্ভর করছে এই নারী ভোটারদের ওপরই।
প্রার্থী তালিকায় এবার নারীদের উপস্থিতি হতাশাজনক হলেও ভোটার হিসেবে নারীর গুরুত্ব অতীতের যেকোনো জাতীয় নির্বাচনের চেয়ে বেশি। আর বিশাল এই ভোটব্যাংকের আস্থা অর্জনে এরই মধ্যে মাঠে নেমেছে রাজনৈতিক দলগুলো। নারীদের জন্য দেওয়া হচ্ছে নানান প্রতিশ্রুতি। আবার কোনো কোনো রাজনৈতিক দলের দায়িত্বশীলদের নারীবিদ্বেষী মন্তব্যকে পুঁজি করে প্রতিপক্ষেরও আছে মাঠ দখলের চেষ্টা।
বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত চূড়ান্ত ভোটার তালিকা অনুযায়ী, ১২ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ১৮৩ জন ভোটারের মধ্যে পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৪৮ লাখ ১৪ হাজার ৯০৭ জন। বিপরীতে নারী ভোটারের সংখ্যা ৬ কোটি ২৮ লাখ ৭৯ হাজার ৪২ জন। মোট ভোটারের মধ্যে নারী ভোটার প্রায় ৫০ শতাংশ (৪৯ দশমিক ২৬ শতাংশ)। অর্থাৎ নারী ভোটারের সংখ্যা পুরুষ ভোটারের কাছাকাছি।
এরই মধ্যে নারী ভোটারদের টানতে বিএনপি ৫০ লাখ পরিবারে ফ্যামিলি কার্ড প্রদান ও নারী উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ঋণ দেওয়াসহ প্রতি জেলায় বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে চলেছে। জামায়াতে ইসলামীরও দেশজুড়ে থাকা ১৫ লাখ নারী কর্মী শহর ও গ্রামের ঘরে ঘরে গিয়ে নারী ভোটারদের কাছে ভোট চাইছেন। আবার এনসিপিও শিক্ষিত ও নতুন প্রজন্মের নারী ভোটারদের জন্য ডিজিটাল এবং আধুনিক বাংলাদেশ গড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে চলেছে।
নির্বাচনের এই ডামাডোলের মধ্যেই জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স হ্যান্ডেলে কর্মজীবী নারীদের নিয়ে করা একটি পোস্ট ঘিরে দেশজুড়ে সমালোচনার ঝড় উঠেছে। জামায়াত দাবি করেছে আমিরের অ্যাকাউন্টটি হ্যাকড করে পোস্টটি করা হয়েছিল। কিন্তু এই ইস্যুতে বিএনপিসহ বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল জামায়াতের আমিরসহ দলটির সমালোচনা করছে। বিশেষ করে ভোটের ঠিক আগে কর্মজীবী নারী ভোটারদের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলেও বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন। নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, নির্যাতন প্রতিরোধ, তার অধিকার নিশ্চিত, কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করাসহ নারী উন্নয়নে যে সরকার পদক্ষেপ নেবে- এবার নারীরা ভোট বিপ্লবের মধ্য দিয়ে তাদেরই ক্ষমতায় নিয়ে আসতে আগ্রহী।
মিরপুর-১৬ আসনের পল্লবীর গৃহিণী নাসরিন আক্তার বলেন, ‘নতুন সরকারের কাছে নাগরিক হিসেবে পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সেবাগুলো যাতে আরও ভালোভাবে পাওয়া যায়- তা প্রত্যাশা করছি। অনেকে সরকার গঠনের আগে নারীকে অগ্রাধিকার দেওয়াসহ বিভিন্ন ধরনের প্রতিশ্রুতি দেয়, কিন্তু ক্ষমতায় এসে সেগুলো আর পূরণ করে না। কোনো সরকারই নারীর যথাযথ মূল্যায়ন করে না। যে দলই ক্ষমতায় আসুক নারী যেন তার অধিকার বুঝে পায় সেই প্রত্যাশা করছি।’
গাইবান্ধার প্রত্যন্ত রসুলপুর চরের জান্নাতি বেগম (২৬) বলেন, ‘আমরা অন্যবারের মতো এবারও ভোট দিতে যাব। ভোটের সময় শহর থেকে নেতারা এসে চরের মানুষদের জন্য অনেক কিছু করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে যান, কিন্তু তারা ক্ষমতায় যাওয়ার পর আমাদের আর দেখতে আসেন না।’
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) কেন্দ্রীয় সম্পাদক ও প্রধান নির্বাহী ড. বদিউল আলম মজুমদার বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, নির্বাচনে নারী ভোটাররা গুরুত্বপূর্ণ বলেই রাজনৈতিক দলগুলো নারীদের ভোট পেতে আপ্রাণ চেষ্টা করছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অপপ্রচার চালিয়ে নারী ভোটারদের প্রভাবিত করার চেষ্টাও করছে। নারী ভোটারের সংখ্যা পুরুষের তুলনায় প্রায় ২০ লাখ কম হলেও জনসংখ্যায় নারীর সংখ্যা বেশি। এজন্য নারীরা যাদের ভোট দেবেন সে দলই জিতবে। কারণ নারীরা দেশের জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ। যদিও রাজনৈতিক দলগুলো নারী প্রার্থীদের মনোনয়নের ব্যাপারে তাদের অঙ্গীকার রক্ষা করেনি।
অ্যাকশনএইড বাংলাদেশ-এর কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ্ কবির বলেন, দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারী হওয়া সত্ত্বেও ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে যে অসামঞ্জস্য দেখছি, তাতে আমরা চিন্তিত। এটি জাতীয় সম্পদের একটি বিশাল অংশকে মূলধারার নীতিনির্ধারণ থেকে দূরে রাখার শামিল। রাজনৈতিক দলগুলোর নারীকে কেবল ক্ষমতায় ওঠার সিঁড়ি হিসেবে দেখলে চলবে না। তাদের ‘অংশীদার’ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। গণতন্ত্রের অর্থ কেবল ব্যালট বাক্সে ভোট দেওয়া নয়; গণতন্ত্রের সার্থকতা তখনই যখন নারীসহ সবার সুষ্ঠু অংশগ্রহণ, সরকারব্যবস্থা ও শাসনব্যবস্থা নিশ্চিত হয়। নির্বাচনের এই ডামাডোলের মাঝে আমরা লক্ষ করছি জনপরিসরে ও অনলাইনে নারীর প্রতি এক ধরনের পদ্ধতিগত বিদ্বেষ ও পিতৃতান্ত্রিক আস্ফালন। এটি নারীর গণতান্ত্রিক অধিকার খর্ব করার একটি রাজনৈতিক কৌশল। নির্বাচিতদের কাছে আমার প্রত্যাশা থাকবে স্লোগান ও ইশতেহারের চটকদার ভাষার বাইরে এসে নারীর জন্য একটি নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করা। আমরা চাই এমন এক রাষ্ট্রব্যবস্থা- যেখানে প্রতিটি নারীর কণ্ঠস্বর নীতিনির্ধারণের প্রতিটি স্তরে গুরুত্বের সঙ্গে প্রতিফলিত হবে।
মানবাধিকারকর্মী অ্যাডভোকেট এলিনা খান বলেন, নারী ভোটাররা সব সময়ই নির্বাচনে বড় ফ্যাক্টর হয়ে থাকেন। নারীরা কেউ বুঝে, কেউ না বুঝে ভোট দেন। আর না বোঝার সংখ্যাই বেশি। অনেক সময় যে প্রার্থীর নির্বাচনে জয়ী হওয়ার কথা না, সেই প্রার্থীও নারীদের ভোটে নির্বাচিত হয়ে যান। কিন্তু যে প্রার্থী নির্বাচিত হলেন তিনি সংসদ বা দেশের জন্য কতটুকু কল্যাণকর- সে বিষয়ে প্রশ্ন রয়েই যায়। নারীদের মূল্যায়ন কখনোই হয় না। ভোটার সংখ্যায় পুরুষের সমান হওয়ার পরও নারীর যে সমস্যাগুলো সেদিকে দৃষ্টি দেওয়া হয় না। নারীর নিরাপত্তা, জীবন-জীবিকা, মর্যাদা এগুলো নিশ্চিত করা হয় না। নারীরা পরিচিতমুখ, পরিচিত আত্মীয়স্বজনদের কথায় বেশির ভাগ সময় প্রার্থী নির্বাচন করেন।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন বলেন, নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণে সংখ্যাগত ও গুণগত উভয় দিক দিয়ে নারী ভোটাররা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন। আমি চাইব নারীরা সবাই ভোট কেন্দ্রে যাক। ভোটের পরে জয়ী ও পরাজিত উভয় দলের ওপরই তাদের পলিসিগুলো মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের চাপ থাকবে। নির্বাচনি মাঠে অনেক ধরনের প্রতিশ্রুতি দেখতে পেয়েছি, কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতায় এই প্রতিশ্রুতিগুলো ফাঁকা বুলি মনে হয়েছে। দলগুলোতে যে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংস্কৃৃতি তা সুস্থ রাখার কোনো ইচ্ছাও দলগুলোর নেই। স্বাভাবিকভাবেই নারীদের ওপর চাপ আছে। এজন্য রাজনৈতিক দলগুলোর নারী ইস্যুতে বড় বড় প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। কিন্তু সামাজিকভাবে সব ধরনের নারীকে গ্রহণ করার মানসিকতা দলগুলোর নেই। এবার বড় অঙ্কের নারীরা ভোট দিতে যাবেন। কিন্তু এর প্রভাব দলগুলো কতটা অনুভব করতে পারবে- তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।