Image description
মুখোমুখি লাঙ্গল-ঈগল-ধানের শীষ

একদিকে লাঙ্গলের শক্তিশালী উপস্থিতি আর অন্যদিকে নৌকার পাশাপাশি হাতুড়ির ভোট ব্যাংক, সবমিলিয়ে বেশ খানিকটা জটিলতায় বরিশাল-৩ (বাবুগঞ্জ-মুলাদী) আসনের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা। অন্য নির্বাচনি এলাকার মতো কেবল আওয়ামী লীগ নয়, ওয়ার্কার্স পার্টির ভোটারদের পেছনেও ছুটতে হচ্ছে তাদের। ফলে জয়-পরাজয় প্রশ্নে এখানে কার পাল্লা ভারী তা বলা মুশকিল। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত যে, নৌকা আর হাতুড়ির ভোট যেদিকে যাবে তিনিই হাসবেন বিজয়ের হাসি।

একসময় উজিরপুর আর বাবুগঞ্জ উপজেলা মিলে ছিল এই নির্বাচনি এলাকা। তখন ভোটে জিতেছিলেন ওয়ার্কার্স পার্টির চেয়ারম্যান বর্তমানে কারাবন্দি রাশেদ খান মেনন। বিএনপির মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল ও জেপি (মঞ্জু)’র গোলাম ফারুক অভিও হয়েছিলেন এমপি। পরবর্তীতে এলাকা পালটে বাবুগঞ্জের সঙ্গে যোগ হয় মুলাদী। সেই সঙ্গে বদলে যায় ভোটের হিসাব। নানা দলে বিভক্ত হয়ে পড়ে ভোটাররা। পরের ইতিহাসটা কেবলই বদলের। একের পর এক এমপি হতে থাকেন ওয়ার্কার্স পার্টি ও জাতীয় পার্টির নেতারা। মাঝে একবার বিএনপির জয়ের সম্ভাবনা তৈরি হলেও বিদ্রোহী প্রার্থীতে ভোট ভাগ হওয়ায় হেরে যায় ধানের শীষ।

’৯০ পরবর্তি সময়ে এখানে সর্বাধিক ৩ বার জয়ের রেকর্ড জাতীয় পার্টির। দুবার জয় পেয়েছে ওয়াকার্স পার্টি। বিএনপির কেউ যেমন জেতেনি তেমনি আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সমর্থন দিয়েছে একেকবার একেক দলকে। তারাও এখানে কখনো দেয়নি দলীয় প্রার্থী। তবে যে বিষয়টি উল্লেখ না করলেই নয়, আওয়ামী শাসনামালে ভোট নিয়ে নানা কারচুপি দুর্নীতি হলেও এখানে প্রতিবারই হয়েছে ভোটের লড়াই। এমনকি ২০২৪-এর নির্বাচনেও লড়াই করেই জেতেন জাতীয় পার্টির গোলাম কিবরিয়া টিপু। আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী আতিকুর রহমানকে ভোটে হারান তিনি। জুলাই বিপ্লবের মামলায় বর্তমানে জেলে থাকা টিপু কারাগারে থেকেই ভোটে লড়ছেন। বলাবাহুল্য ভোটের মাঠে শক্ত পাল্লা তিনি। টিপুর নিজস্ব ভোট ব্যাংকের পাশাপাশি এখানে আরেক ফ্যাক্টর ওয়াকার্স পার্টির রাশেদ খান মেননের ভোট। স্থানীয় ভোটারদের মতে নৌকা আর হাতুড়ির ভোট যেদিকে যাবে সেদিকেই ভারী হবে জয়ের পাল্লা। তবে এই দুপক্ষ কোনদিকে যাবে তার আভাস মিলতে সময় লাগবে আরও কয়েকদিন।

এবার এখানে প্রার্থী হিসাবে জেলবন্দি টিপু ছাড়াও রয়েছেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাড. জয়নুল আবেদিন ও আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ। ইসলামি ও সমমনা ১১ দলের জোটে থাকা এবি পার্টিকে সমর্থন দিয়ে এই আসন থেকে প্রার্থী তুলে নিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। দলের কর্মী-সমর্থকরা বেশ জোরেশোরে নেমেছেন ফুয়াদের পক্ষে। জেলে থাকা টিপুর পক্ষে মাঠে আছেন তার কন্যা হাবিবা কিবরিয়া এবং জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য ইকবাল হোসেন তাপস। বিএনপির প্রার্থিতা নিয়ে শুরুতে কিছু জটিলতা থাকলেও পরে অবশ্য তা কাটিয়ে ওঠে দলটি। প্রচার-প্রচারণায়ও কেউ কাউকে ফেলতে পারছেন না পেছনে। ভোট নিয়ে খানিকটা উত্তেজনাও রয়েছে এলাকায়।

সমানতালে তিন প্রতিদ্বন্দ্বীর প্রচার চললেও নৌকা আর হাতুড়ির ভোট কোনদিকে যাবে সেই বিশ্লেষণই এখন চলছে নির্বাচনি এলাকায়। ৩ প্রার্থীর মধ্যে ফুয়াদ আর টিপু, দুজনেরই বাড়ি বাবুগঞ্জ এলাকায়। সেই হিসাবে আঞ্চলিকতার টানে খানিকটা হলেও এগিয়ে আছেন জয়নুল। যদিও সেই এগিয়ে থাকার ফল মিলবে তখনই যদি নৌকা আর হাতুড়ির ভোটাররা আস্থা আনে ধানের শীষে। যদিও সেই সম্ভাবনা হ্রাস করেছে লাঙ্গলের উপস্থিতি। মহাজোটের অংশীদার দল হিসাবে এখানে ৩ বার জিতেছে লাঙ্গল। স্থানীয় নেতাকর্মীসহ আওয়ামী লীগের ভোটারদের সঙ্গে রয়েছে তাদের পুরোনো সখ্যতা। একই কথা প্রযোজ্য ওয়াকার্স পার্টির ক্ষেত্রেও। সেক্ষেত্রে তারা যে পুরোনো বন্ধুর পক্ষে থাকবেন না তা বলা মুশকিল। তবে আশার কথা হলো, নৌকা আর হাতুড়ির ভোট পেতে নানা কৌশল নিচ্ছেন অন্য দুই প্রার্থী। জুলাই বিপ্লবের গায়েবী আর মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার বন্ধে যেমন সোচ্চার ফুয়াদ তেমনি আ.লীগ ও ওয়াকার্স পার্টির ভোটারদের পক্ষে টানা চেষ্টা চলছে বিএনপির মধ্যে। এই চেষ্টায় সফলতা কিংবা ব্যর্থতার ওপর নির্ভর করছে নির্বাচনের জয়-পরাজয়।

ভোটযুদ্ধে জয়-পরাজয় প্রশ্নে জানতে চাইলে এবি পার্টির প্রার্থী ব্যারিস্টার ফুয়াদ বলেন, ‘আমরা ইনসাফের বাংলাদেশ গড়ার জন্যে লড়ছি। এটা কেবল ভোটের লড়াই নয়, একটি আদর্শের লড়াই। নির্বাচনি এলাকার সাধারণ মানুষের মধ্যে যে ব্যাপক সাড়া দেখছি তাতে একটা বিষয় পরিষ্কার যে মানুষ পরিবর্তন চায়। ঘুস, দুর্নীতি আর চাঁদাবাজ মুক্ত একটা সমাজ চায় তারা। গত ১৭ বছর ভোটের নামে ডাকাতি হয়েছে। আওয়ামী লীগেরই এমন অনেক ভোটার আছেন যারা নিজেরাও ভোট দিতে পারেননি। গতানুগতিক রাজনৈতিক ধারার বাইরে ভিন্ন একটা কিছু করার লড়াই আমাদের। সাধারণ মানুষ এই লড়াইয়ের পক্ষে আছেন।’ কারান্তরীন প্রার্থী গোলাম কিবরিয়া টিপুর প্রধান নির্বাচনি এজেন্ট ইকবাল হোসেন তাপস বলেন, ‘ভোটযুদ্ধের চরম আর কঠিন লড়াইয়েও এখানে হারেনি লাঙ্গল। আজকে মিথ্যা মামলায় জেলে আটকে রাখা হয়েছে এই আসনের গণমানুষের নেতা গোলাম কিবরিয়া টিপুকে। মানুষ এই অন্যায়ের পক্ষে নয়। ৫ আগস্টের পর যে গুণগত পরিবর্তন হওয়ার আশা ছিল তা হয়নি। মানুষ ভালোবাসে বলেই তো টিপুকে বারবার ভোট দিয়ে এমপি বানিয়েছে। সেই ভালোবাসার শক্তিতেই ভোটে জিতে আবার মানুষের মাঝে ফিরবেন আমাদের প্রার্থী।’ বাবুগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব ওয়াহিদুল ইসলাম প্রিন্স বলেন, ‘১৭ বছর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে মাঠে ছিল বিএনপি। জনগণের ভোটাধিকার কেড়ে ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগের কারণে ভোট দিতে পারেনি সাধারণ মানুষ। এবার তাই মুক্ত পরিবেশে ধানের শীষের পক্ষে গণজোয়ারের সৃষ্টি হয়েছে। মধ্যপন্থার দল হিসাবে আমাদের পক্ষে আছে সাধারণ জনগণ। ইনশাল্লাহ জয় নিয়েই ঘরে ফিরবে ধানের শীষ।’