ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজন করতে সরকারের ব্যয়ের অঙ্ক ছুঁয়েছে ৩ হাজার ১৫০ কোটি টাকা। যার এক-তৃতীয়াংশ জোগান দেওয়া হবে চলতি বাজেটের ‘অপ্রত্যাশিত’ খাত থেকে। জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একই সঙ্গে হওয়ায় বাজেটে যে বরাদ্দ রাখা ছিল, সে তুলনায় আরও অর্থের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। ফলে অতিরিক্ত অর্থের চাহিদা মেটাতে অপ্রত্যাশিত খাতে রাখা চার হাজার কোটি টাকা থেকে ১ হাজার ৭০ কোটি টাকা জোগান দেওয়া হচ্ছে। সম্প্রতি এ সংক্রান্ত প্রস্তাবে অনুমোদন দিয়েছেন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।
চলতি অর্থবছরের (২০২৫-২৬) জাতীয় বাজেটে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরিচালনার জন্য ২ হাজার ৮০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়। এর সঙ্গে সম্প্রতি বরাদ্দ দেওয়া অপ্রত্যাশিত খাতের বরাদ্দ মিলে আসন্ন নির্বাচনে সরকারের কোষাগার থেকে খরচ হবে মোট ৩ হাজার ১৫০ কোটি টাকা।
সূত্রমতে, নির্বাচন পরিচালনা ব্যয় অনুমোদনের জন্য সম্প্রতি অর্থ বিভাগ থেকে অর্থ উপদেষ্টার কাছে একটি সারসংক্ষেপ উপস্থাপন করা হয়। এতে বলা হয়, ‘চলতি অর্থবছরের বাজেটে নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ে বিশেষ কার্যক্রমের জন্য বিভিন্ন খাতে ২ হাজার ৮০ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। এ অর্থ শুধু ত্রয়োদশ নির্বাচনের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে।’ সেখানে আরও বলা হয়, বরাদ্দকৃত অর্থের মধ্যে ৫০ শতাংশ অর্থাৎ ১ হাজার ৪০ কোটি টাকা ইতোমধ্যে ছাড় করা হয়েছে। বাকি ৫০ শতাংশ অর্থ ছাড় প্রক্রিয়াধীন। তবে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে গণভোট আয়োজন, নির্বাচনে প্রবাসী এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ ভোটারদের পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোটগ্রহণ কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। এজন্য কমিশন থেকে উল্লিখিত বরাদ্দের বাইরে আরও ১ হাজার ৭০ কোটি টাকা চেয়েছে, যা বরাদ্দের যৌক্তিকতা রয়েছে বলে প্রতীয়মান।
সারসংক্ষেপে আরও বলা হয়, চলতি অর্থবছরে নির্বাচন কমিশনের অনুকূলে জাতীয় বাজেটে ২ হাজার ৭২৬ কোটি টাকা বরাদ্দ আছে। এ বরাদ্দ থেকে নির্বাচন কমিশন যে অতিরিক্তি অর্থ চেয়েছে তা সংকুলান সম্ভব হবে না। সেটি বিবেচনায় নিয়ে চলতি বাজেটের অপ্রত্যাশিত খাত থেকে অতিরিক্ত বরাদ্দ করা যেতে পারে।
সূত্র জানায়, মূল বাজেট থেকে বরাদ্দের ৫০ শতাংশ হিসাবে ছাড় করেছে ১ হাজার ৪০ কোটি টাকা। এছাড়া বর্ধিত ব্যয়ের প্রস্তাবটি সামনে এলে অপ্রত্যাশিত খাত থেকে বরাদ্দ দেওয়া অর্থ থেকে প্রথম কিস্তি বাবদ গত সপ্তাহে ছাড় করেছে ২৬৭ কোটি টাকা। অপ্রত্যাশিত খাতের বাকি তিন কিস্তির ৮০২ কোটি টাকা পর্যায়ক্রমে ছাড় করা হবে।
নির্বাচন কমিশন ব্যয়ের যে ফর্দ করেছে, তাতে ভোটের খরচ আগের নির্বাচনগুলোর তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এর আগে ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনে ব্যয় হয়েছিল ২ হাজার ২৭৬ কোটি টাকা।
এদিকে দেশের অর্থনীতি চাপের মুখে থাকলেও ত্রয়োদশ নির্বাচনের ব্যয় নিয়ে কোনো সমস্যা হবে না বলে সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন অর্থ উপদেষ্টা। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন থেকে যে অর্থ চাওয়া হবে তা বরাদ্দ দেওয়া হবে। টাকা নিয়ে সমস্যা হবে না।
জানতে চাইলে অর্থনীতিবিদ ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মাননীয় ফেলো প্রফেসর ড. মোস্তাফিজুর রহমান রোববার যুগান্তরকে বলেন, একটি ভালো নির্বাচন করতে হলে অর্থের প্রয়োজন হবে। তবে অপ্রত্যাশিত খাত থেকে বরাদ্দ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে সরকার অপ্রত্যাশিত খাতে অতিরিক্ত বরাদ্দ রাখে। এ খাত থেকে ব্যয় করা হলে কোনো ধরনের সমস্যা হবে না। এমন যদি হতো অন্য কোনো খাত থেকে যেমন শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও যোগাযোগের বরাদ্দ কমিয়ে নির্বাচনে খরচ বাড়ানো হচ্ছে, সে ক্ষেত্রে সমস্যা হওয়ার শঙ্কা ছিল। তবে নজর রাখতে হবে, খুব স্বল্প সময়ে নির্র্বাচনসংক্রান্ত বিপুল অঙ্কের অর্থ ব্যয় হবে। এ ব্যয়ের গুনগত মান, ব্যয়ের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
এদিকে অর্থ মন্ত্রণালয় এরই মধ্যে নির্বাচনসংক্রান্ত এ বিপুল অঙ্কের অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে কয়েকটি শর্ত জুড়ে দিয়েছে নির্বাচন কমিশনকে (ইসি)। এতে বলা হয়, ব্যয়ের ক্ষেত্রে ‘দ্য পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অ্যাক্ট-২০২৬ এবং দ্য পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস-২০২৫সহ যাবতীয় আর্থিক বিধিবিধান ও নিয়ম যথাযথ অনুসরণ করতে হবে। ইতোমধ্যে বরাদ্দকৃত ২ হাজার ৮০ কোটি টাকা এবং অতিরিক্ত বরাদ্দের ১ হাজার ৭০ কোটি টাকার প্রথম কিস্তি ২৬৮ কোটি টাকার প্রকৃত ব্যয়ের ভিত্তিতে অবশিষ্ট দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ কিস্তি ছাড় করা হবে। এছাড়া নির্বাচনসংক্রান্ত অন্যান্য যাবতীয় ব্যয় ইসি সচিবালয়ের জাতীয় বাজেট থেকে নির্বাহ করতে হবে। নির্দেশনায় আরও বলা হয়, যে খাতে ব্যয়ের জন্য অর্থ বরাদ্দ করা হলো, সেই খাত ছাড়া কোনো খাতে এ অর্থ খরচ করা যাবে না। এ ব্যয়ের ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে কোনো অনিয়ম উদ্ঘাটিত হলে ব্যয়কারী কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে। আর বরাদ্দকৃত অর্থ সাশ্রয় হলে ৩০ জুনের মধ্যে সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হবে।
এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত অর্থ বিভাগের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানান, এ বছর জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একই দিন অনুষ্ঠিত হবে। এ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য নির্বাচন কমিশন ১৮টি খাতে অর্থ ব্যয় করছে বলে অর্থ বিভাগকে অবহিত করেছে।
এদিকে ত্রয়োদশ নির্বাচন পরিচালনার আর্থিক ব্যয়ের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি অর্থ গুনতে হচ্ছে সংশ্লিষ্টদের দৈনিক খোরাকি ভাতায়। এতে বরাদ্দ থাকছে ৭৩০ কোটি টাকা। এছাড়া সরকারি গাড়ি ব্যবহারের জ্বালানি তেল পোড়াতেই ব্যয় হবে ২৯৮ কোটি টাকা এবং চুক্তিভিত্তিক যানবাহন ব্যবহারে ব্যয় আরও ২০১ কোটি টাকা। এছাড়া মনিহারি পণ্য কেনাকাটায় ৫৮১ কোটি টাকা, নির্বাচন পরিচালনায় অংশগ্রহণকারীদের সম্মানি ব্যয় ৫১৫ কোটি টাকা, যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম ক্রয় ১৬২ কোটি টাকা, মুদ্রণ, বাঁধাইতে ১০৮ কোটি টাকা, যাতায়াত ভাতায় ১০৯ কোটি টাকা এবং বিজ্ঞাপন ও প্রচারে ১০৩ কোটি টাকা ব্যয়ের হিসাব করা হয়েছে।
ব্যয়ের তালিকায় সংশ্লিষ্টদের অ্যাপায়ন খরচ বাবদ ১৮৪ কোটি টাকা, পরিবহণ ব্যয় ৮০ কোটি টাকা, অনিয়মিত শ্রমিকদের মজুরি ৩১ কোটি টাকা, স্ট্যাম্প ও সিল ১৭ কোটি টাকা, মেশিন ও সরঞ্জাম ভাড়া ১৫ কোটি টাকা, প্রশিক্ষণ পরিচালনা ব্যয় ৭ কোটি টাকা, ব্যালট বাক্স ৫ কোটি টাকা এবং অন্যান্য খাতে ৩ কোটি টাকা।
ইসি সূত্র জানায়, সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দিতে বিশ্বের ১২৩টি দেশ থেকে প্রবাসীরা ১৫ লাখ ৩৩ হাজার ৬৮২ জন ভোটার নিবন্ধন করেছেন। প্রতিটি ভোটের জন্য সরকারকে গড়ে ৭০০ টাকা খরচ করতে হচ্ছে।
এছাড়া সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীরা নিজ নিজ প্রতীক নিয়ে প্রচারণা চালান। কিন্তু গণভোটে কোনো প্রার্থী বা প্রতীক না থাকায় গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত ভোটারের মধ্যে বিষয়টি স্পষ্টভাবে বোঝাতে পৃথকভাব সচেতনতামূলক প্রচারণা চালাতে হচ্ছে, যা নির্বাচন কমিশনকেই করতে হচ্ছে। এ কারণেই নির্বাচনি কার্যক্রমের পরিধি সম্প্রসারিত হচ্ছে, খরচও বাড়ছে।
এছাড়া নির্বাচনসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু করেছে ইসি। ১০ লাখের বেশি প্রিসাইডিং ও পোলিং অফিসারকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন গ্রুপে শুরু হওয়া এই প্রশিক্ষণ কার্যক্রম ভোটগ্রহণের ৪-৫ দিন আগে শেষ হবে। এ প্রশিক্ষণ খাতে প্রায় ৭ কোটি টাকা খরচ হচ্ছে। তবে নির্বাচন কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করার পর সম্মানি দেওয়া হবে।
আগে খরচ যেমন ছিল : নির্বাচন কমিশন থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী-২০১৮ সালে একাদশ সংসদ নির্বাচনের জন্য মোট বরাদ্দ ছিল সাতশ কোটি টাকার মতো। যদিও পরে তা কিছুটা বাড়ানো হয়। ওই নির্বাচনে বিএনপিসহ সমমনা দলগুলো অংশ নেয়। এর আগে দশম সংসদ নির্বাচন বর্জন করে বিএনপিসহ কিছু রাজনৈতিক দল। ওই নির্বাচনের জন্য মোট খরচ হয় প্রায় ২৬৫ কোটি টাকা। এছাড়া ২০০৮ সালে নবম সংসদ নির্বাচনের জন্য ব্যয় করা হয় প্রায় ১৬৫ কোটি টাকা। কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, ব্যবস্থাপনা ও নির্বাচনি নানা উপকরণের খরচ অনেক বেড়ে যাওয়ার কারণেই ক্রমশ নির্বাচনের খরচ বাড়ছে।