Image description
মাঠ প্রশাসনের ভারসাম্য ভেঙে পড়ার শঙ্কা

মাঠ প্রশাসনে ৬৪ জেলার মধ্যে ৩০ জেলায় নিয়োগপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসকরা (ডিসি) পুলিশ সুপারদের (এসপি) চেয়ে জুনিয়র ব্যাচের। অথচ দীর্ঘদিনের রেওয়াজ অনুযায়ী এবং জেলা প্রশাসনের নেতৃত্ব বজায় রাখার প্রশ্নে এসপিদের চেয়ে ডিসিরা ছিলেন সিনিয়র ব্যাচের। কিন্তু এই প্রথম ডিসি নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রে এ বিষয়টিকে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।

বিশ্লেষকরা বলছেন, জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভাপতিত্ব করা নিয়ে আশির দশক থেকে ডিসি এবং এসপির মধ্যে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব চলে আসছে। জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভাপতি ডিসি। কিন্তু মাসিক আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় বেশির ভাগ জেলার এসপি যোগ দেন না। গুরুত্বপূর্ণ এ সভায় ডিসির সভাপতিত্বে বসতে চান না এসপিরা-এমন মানসিকতা থেকে অনেকে তাদের এএসপিকে পাঠিয়ে থাকেন। এসব কারণে মাঠ প্রশাসনে প্রভাবশালী দু’টি ক্যাডারের এই দুই শীর্ষপদে কার্যত কিছু সমন্বিত কাজ নিয়ে সমন্বয় না থাকার অভিযোগ রয়েছে। আবার অনেক জেলায় ব্যক্তিগত সম্পর্কের কারণে ডিসি-এসপির মধ্যে সোহার্দপূর্ণ সম্পর্কও দেখা যায়। তবে এ সংখ্যাটা খুবই কম।

তারা বলেন, জাতীয় নির্বাচনের আগে যখন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্পন্ন করা বড় চ্যালেঞ্জ-তখন ডিসি পদে এসপির চেয়ে জুনিয়র ব্যাচের কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়ায় অদৃশ্য সংকট তৈরি হয়েছে। এর ফলে সমন্বয় করে কাজ করা খুবই কঠিন হবে।

জানতে চাইলে মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. শেখ আব্দুর রশীদ যুগান্তরকে বলেন, ‘কিছু ক্ষেত্রে সিনিয়র এসপির চেয়ে জুনিয়র কর্মকর্তারা মাঠে ডিসি হিসাবে কর্মরত। এখানে জুনিয়র সিনিয়রের কোনো বিষয় নয়। তারা সমন্বয় করে কাজ করবেন। সফল হলে যৌথভাবে হবেন এবং ব্যর্থ হলেও তাদের যৌথভাবে দায় নিতে হবে। এখানে তো কোনো ধরনের ব্যত্যয়, সংকট কিংবা সমস্যা দেখছি না। তাছাড়া মাঠপর্যায়ে ডিসি এবং এসপির দ্বন্দ্ব চলছে এ ধরনের কোনো খবর আমার জানা নেই।’

তবে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে সাবেক সচিব এ কে এম আব্দুল আউয়াল মজুমদার যুগান্তরকে বলেন, সিনিয়র ডিসিকে যেখানে এসপিরা মানতেই চান না, সেখানে সিনিয়র এসপিরা জুনিয়র ডিসির পরামর্শ নেবেন, কমান্ড ফলো করবেন এ ধরনের আশা করা অবান্তর। ফলে এ নিয়োগ মোটেই সমীচীন হয়নি। এতে করে ডিসি এবং এসপির মধ্যে মারাত্মকভাবে কাজের সমন্বয়হীনতা দেখা দেবে। তাদের রেশারেশি ও মনোবেদনার প্রভাব পড়বে কাজে। এর ফলে জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভেঙে পড়তে পারে। যার বিরূপ প্রভাব আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পড়বে, এটাই স্বাভাবিক।

সাবেক সচিব আনোয়ার ফারুক যুগান্তরকে বলেন, সিনিয়র ব্যাচের এসপি এবং জুনিয়র ব্যাচের কর্মকর্তাকে ডিসি হিসাবে নিয়োগ দেওয়া সরকারের ভেতরে সমন্বয়হীনতার বাস্তব চিত্র। এ ধরনের নিয়োগ বিবেচনাপ্রসূত কাজ নয়। এতে প্রশাসনিক ভারসাম্য বিনষ্ট হয়েছে।

জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়া যুগান্তরকে বলেন, এটা অবিবেচনাপ্রসূত পদায়ন। এতে মাঠ প্রশাসনে অস্থিরতা সৃষ্টি হবে। তিনি মনে করেন, এখনো সময় আছে-সরকার চাইলে এসব ভারসাম্যহীন নিয়োগ বাতিল করা সম্ভব।

বাংলাদেশ অ্যাডমিনিসট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের (বিএএসএ) মহাসচিব ও ঢাকা বিভাগের কমিশনার শরফ উদ্দিন আহমদ চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, ডিসি এবং এসপি সমন্বয় করে দায়িত্ব পালন করবেন। এখানে সিনিয়র ও জুনিয়র নিয়ে প্রশ্ন তোলা ঠিক হবে না। সরকার যা ভালো মনে করেছে তাই করেছেন।

অপর দিকে, বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ড. নাজমুল করিম খান বলেন, ‘সিনিয়রকে জুনিয়রের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে দিলে বড় ধরনের সমস্যার সৃষ্টি হয়। এটাই স্বাভাবিক। কারণ সার্ভিসে যে জুনিয়র, তার বয়স ও অভিজ্ঞতা দুটিই কম থাকে। অথচ তিনি যদি সিনিয়রকে নির্দেশনা দেন, আর তা ভুল নির্দেশনা হলেও সিনিয়র অফিসারকে তা মাথা পেতে নিতে হয়। এখানে কার্যত তার মতামতের গুরুত্ব থাকে না। এতে মনোবেদনা থাকা খুবই স্বাভাবিক।’

যেসব জেলায় এসপিরা সিনিয়র : খুলনার ডিসি আ স ম জামসেদ খোন্দকার বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) ২৯ ব্যাচের কর্মকর্তা। পক্ষান্তরে খুলার এসপি মো. মাহবুবুর রহমান ২৫তম ব্যাচের। বরগুনার ডিসি তাছলিমা আক্তার ২৯তম ব্যাচের, আর এসপি কুদরাত-ই- খুদা ২৭তম ব্যাচের। নরসিংদী জেলার ডিসি মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন ২৭তম ব্যাচের, অপরদিকে এসপি আব্দুল্লাহ আল ফারুক ২৫ ব্যাচের। গাজীপুরের ডিসি মোহাম্মদ আলম হোসেন ২৭তম ব্যাচের, পক্ষান্তরে এসপি শরীফ উদ্দিন ২৫তম ব্যাচের। মানিকগঞ্জের ডিসি নাজমুন আরা সুলতানা ২৮তম ব্যাচের, আর এসপি মোহাম্মদ সারওয়ার আলম ২৫তম ব্যাচের। জামালপুর জেলার ডিসি মোহাম্মদ ইউসুপ আলী ২৭তম ব্যাচের এবং এসপি ড. চৌধুরী মো. যাবের সাদেক ২৫তম ব্যাচের।

এছাড়া জয়পুরহাট জেলার ডিসি আল মামুন মিয়া ২৮তম ব্যাচের। আর ওই জেলার এসপি মিনা মাহমুদা ২৫তম ব্যাচের। রাঙামাটি জেলার ডিসি নাজমা আশরাফী ২৯তম ব্যাচের, অপরদিকে জেলার এসপি মুহাম্মদ আবদুর রকিব ২৫তম ব্যাচের। ভোলার ডিসি ডা. শামীম রহমান ২৯তম ব্যাচের এবং জেলার এসপি শহীদুল্লাহ কাওছার ২৫তম ব্যাচের। নারায়ণগঞ্জের ডিসি রায়হান কবির ২৯তম ব্যাচের এবং জেলার এসপি মিজানুর রহমান মুন্সি ২৫তম ব্যাচের। বরিশালের ডিসি মো. খায়রুল আলম সুমন ২৯তম ব্যাচের এবং জেলা এসপি ফারজানা ইসলাম ২৫তম ব্যাচের। মাদারীপুর জেলার ডিসি জাহাঙ্গীর আলম ২৮তম ব্যাচের এবং জেলার এসপি এতেশামুল হক ২৭তম ব্যাচের। খাগড়াছড়ির ডিসি মো. আনোয়ার সাদাত ২৯তম ব্যাচের, অপরদিকে জেলার এসপি মির্জা সায়েম মাহমুদ ২৭তম ব্যাচের। নওগাঁর ডিসি মো. সাইফুল ইসলাম ২৯তম ব্যাচের পক্ষান্তরে জেলার এসপি মো. তারিকুল ইসলাম ২৫তম ব্যাচের। দিনাজপুরের ডিসি মো. রফিকুল ইসলাম ২৭তম ব্যাচের অপরদিকে জেলার এসপি মো. জেদান আল মুসা ২৫তম ব্যাচের। শেরপুরের ডিসি তরফদার মাহবুবুর রহমান ২৭তম ব্যাচের এবং জেলার এসপি মো. কামরুল ইসলাম ২৫তম ব্যাচের। সাতক্ষীরার ডিসি আফরোজা আখতার ২৮তম ব্যাচের পক্ষান্তরে জেলার এসপি মো. আরেফিন জুয়েল ২৫তম ব্যাচের।

তাছাড়া, মুন্সীগঞ্জের ডিসি সৈয়দা নুরমহাল আশরাফী ২৭তম ব্যাচের এবং জেলার এসপি মো. মেনহাজুল আলম ২৫তম ব্যাচের। নড়াইলের ডিসি ড. মোহাম্মদ আবদুল ছালাম ২৭তম ব্যাচের পক্ষান্তরে এসপি মোহাম্মদ আল মামুন শিকদার ২৫তম ব্যাচের। কুড়িগ্রামের ডিসি অন্নপূর্ণা দেবনাথ ২৮তম ব্যাচের এবং এসপি খন্দকার ফজলে রাব্বি ২৭তম ব্যাচের। গাইবান্ধার ডিসি মোহাম্মদ মাকসুদুর রহমান মোল্লা ২৭তম ব্যাচের অপরদিকে জেলার এসপি মো. জসীম উদ্দীন ২৫তম ব্যাচের। মৌলবীবাজার জেলার ডিসি তৌহিদুজ্জামান পাভেল ২৮তম ব্যাচের পক্ষান্তরে জেলার এসপি মোহাম্মদ বিল্লাল হোসেন ২৭তম ব্যাচের। নাটোরের ডিসি আসমা শাহীন ২৭তম ব্যাচের এবং জেলার এসপি মুহাম্মদ আবদুল ওয়াহাব ২৫তম ব্যাচের। চাঁপাইনবাবগঞ্জের ডিসি মো. শাহদাত হোসেন মাসুদ ২৮তম ব্যাচের অপরদিকে জেলার এসপি গৌতম কুমার বিশ্বাস ২৫তম ব্যাচের। বগুড়ার ডিসি মো. তৌফিকুর রহমান ২৭তম ব্যাচের পক্ষান্তরে জেলার এসপি মো. শাহদাত হোসেন ২৫তম ব্যাচের। রাজবাড়ীর ডিসি সুলতানা আক্তার ২৭তম এবং এসপি মোহাম্মদ মনজুর মোর্শেদ ২৫ ব্যাচের। এছাড়া বাগেরহাটের ডিসি গোলাম মো. বাতেন ২৮তম এবং এসপি মোহাম্মদ হাছান চৌধুরী ২৫তম ব্যাচের কর্মকর্তা।